বলতে বলতেই এসেছিল টেলিফোন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই ধরণী ঘোষাল… তরণী এবার ডুবল বলে…পাওয়া গেছে ট্যাক্সিটা?…অ্যাবাচ্ছ?…আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সামনে?…ফুয়েল মিটারের ইন্ডিকেটর E-য়ের দাগে?…নো ক্লু?..গুড।
ঠকাস করে রিসিভার নামিয়ে রেখে ধরণী ঘোষাল জানালেন, বড় জবর পরিহাস করে গেছে হত্যাকারী। খালি ট্যাক্সি রেখে গেছে থানার সামনেই–বুকের পাটা তো কম নয়। পুলিশকে চ্যালেঞ্জ।
আমি বলেছিলাম, তা নয়। চ্যালেঞ্জের ব্যাপারই নয়। থানার সামনে ট্যাক্সি ফেলে যাওয়ার দরকার হলে কাছাকাছি থানাগুলো ছেড়ে গিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা পর্যন্ত যাওয়া কেন? আসলে তেল ফুরিয়ে গেছিল। জিগ্যেস করেছিলাম, গাড়ির মুখটা কোন দিকে ছিল বলেছে? ধরণীবাবু বললেন, উত্তর দিকে। রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ির দিকে। কিন্তু ইন্দ্রনাথবাবু, সন অভ সোয়াইনটাকে এখন কোথায় পাই বলুন তো?
সন নয়, বলুন সন্স। একজন হত্যাকারী নয়–একাধিক। দুজন তো বটেই, তিনজন হওয়াও বিচিত্র নয়। বলবন্ত সিং শক্তিশালী যুবক। লড়েওছে প্রাণপণে। কিন্তু পারেনি অতজনের সঙ্গে।
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ধরণীবাবু বলেন, অবভিয়াসলি।
আমি বললাম, বলবন্ত সিংয়ের ডেরায় হানা দিয়েছেন?
এই যাব বলেই তো আপনাকে পাকড়াও করে নিয়ে এলাম। চলুন।
ভবানীপুরে বলবন্ত সিংয়ের আস্তানায় উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায়নি। ব্যাচেলার। একা থাকত একটা ছোট্ট ঘরে। মদের খালি এবং ভর্তি বোতল আর ফিল্মস্টারদের ছবিতে বোঝাই ঘর। দেওয়ালে সাঁটা বিশেষ একটা নায়িকার বুকের ওপর কলম দিয়ে আঁকা হরতন-তিরবিদ্ধ।
স্যাডিস্ট, একদৃষ্টে সেদিকে চেয়ে আছি দেখে, নাক কুঁচকে বলেছিলেন ধরণী ঘোষাল, আপনি নন–বলন্ত সিং।
আমি ওঁকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পাশেই টায়ারের দোকানে ঢুকেছিলাম। টেলিফোন যন্ত্রটা দেখিয়ে জানতে বলেছিলাম, বলবন্ত সিংয়ের নামে টেলিফোন আসত কিনা। শিখ দোকানদার খালিস্তানি মেজাজ দেখিয়ে বলেছিল, আসত বইকি–এখনো আসে। দিল চৌচির করার মতো সব টেলিফোন।
দিল চৌচির করার মতো টেলিফোনই আশা করছিলাম। খুঁটিয়ে জিগ্যেস করতেই খবরটা পেয়ে গেলাম। একটি নারীকণ্ঠ প্রায় ডেকে দিতে বলত বলবন্ত সিংকে। বলবন্তও তাকে ফোন করত। তার ঠিকানা? আবার উগ্র হয়ে উঠেছিল খালিস্তানি টেম্পার। আমি ধীরে-সুস্থেই ঠিকানা উদ্ধারের পথ বাতলে দিয়েছিলাম। উল্টোপাল্টা টেলিফোনের বিল আসার জন্যে অনেকেই আজকাল খাতায় লিখে রাখে রোজ কোন নম্বরে টেলিফোন করা হল। সেরকম খাতা নেই কি দোকানে? সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল খাতাখানা। উগ্র শিখ আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, তিনদিন আগে বলবন্ত সিংয়ের ফোন করা নাম্বারটা। একই নাম্বার দেখলাম আগেও লেখা রয়েছে খাতায়।
ওইখান দাঁড়িয়েই ফোন করলাম ওয়ান নাইন সেভেনে। ডাইরেক্টরী এনকোয়ারি। পেয়ে গেলাম আলিপুরের একটা ঠিকানা।
গিয়েছিলাম সেখানে। বাড়িটা এক বিলেত ফেরত ব্যারিস্টারের। এখন অবশ্য ব্যারিস্টার সম্মান আর কাউকে দেওয়া হয় না–সবাই অ্যাডভোকেট। তাহির আমেদ কিন্তু মার্বেল প্রস্তর ফলকে এখনো সেই ঘোষণাই করে চলেছেন।
ভদ্রলোক মাঝবয়সি৷ পুলিশ দেখেই পাইপ নামিয়ে বললেন, খবরটা পেলেন কী করে?
আকাশ থেকে পড়লেন ধরণী ঘোষাল, কীসের খবর?
সাকিনা দুদিন হল পালিয়েছে–পুলিশকে জানাইনি কেলেঙ্কারির ভয়ে, বাট হাউ…
সাকিনা তার একমাত্র মেয়ে। পঞ্চদশী। স্কুলগার্ল। ঘর তার দোতলায়। পেছনের বারান্দা থেকে নেমে যাওয়া যায় একতলার বাগানে-সেখানে থেকে দরজা খুলে দুদিন আগে রাত্রে পালিয়েছে সাকিনা। মায়ের হিরে-জহরতও নিয়ে গেছে। প্রায় লাখ টাকার জুয়েল। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগই কালো টাকায় কেনা। তাই চেপে গেছিলেন তাহির আমেদ।
সাকিনার পড়ার টেবিলে নিজের একটা ছবি ছিল কাঁচের তলায়। এককোণে ছোট করে একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা–খালিস্তানী শিখের টায়ারের দোকানের টেলিফোন নাম্বার।
সাকিনা দেখতেও বিশেষ সেই নায়িকার মতো–যার ছবির বুকের হরতন আঁকা দেখে এসেছি বলবন্ত সিংয়ের ঘরে।
প্রেমের সম্পর্ক ছিল দুজনের মধ্যে। সাকিনা জহরত নিয়ে পালিয়ে গেছে তাহলে বলবন্ত সিংয়ের কাছেই।
তক্ষুনি গেলাম টায়ারের দোকানে। বলবন্ত সিং কি সাদি-টাদি করব বলেছিল ইদানীং? বলছিল বইকি। টাকার পাহাড়ে নাকি বসবে শিগগিরই–ট্যাক্সি চালাতে আর হবে না–টায়ারের দোকান দেবে। ক্যাপিটাল? কুছপরোয়া নেহি–ওভি হো জায়গা।
কিন্তু বলবন্ত সিংয়ের একখানা মাত্র ঘরে তালা ঝোলে না কেন? আমরা তো ভেজানো দরজা খুলেই ভেতরে ঢুকেছিলাম। তালা কোথায়?
আশপাশের ঘরের বাসিন্দাদের জিগ্যেস করে জানা গেল, ব্যাচেলার বলবন্ত ওই রকমই কাছাখোলা। এই তো দিন কয়েক আগেই ভোররাতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসেছিল। কেউ উঠে অবশ্য দেখেনি, বলবন্ত তাদের মধ্যে ছিল কিনা। ভোরবেলা দেখা গেল দরজা দু-হাট করে খোলা–বলবন্ত নেই, বন্ধু-টন্ধুও নেই। নিশ্চয় চাবি দিতে ভুলে গেছে।
তালাটা পাওয়া গেল ঘরের মধ্যে। যা খুঁজছিলাম, সেটা কিন্তু পাওয়া গেল না–জহরতের বাক্সটা। যে রাতে বন্ধুদের নিয়ে বলবন্ত এসেছিল বলে প্রতিবেশীদের বিশ্বাস, সে রাতেই খুন হয়েছিল বলবন্ত। পকেট থেকে চাবি নিয়ে বন্ধুরা এখানেই এসেছিল জহরতের বাক্স সরাতে।
