কাউকে না দেয়। আমাকে তা বলেও ছেন মিঃ মালহোত্র। তবে সিডনিতে আমি ওর একটা উপকার করেছিলাম। খুব ছোট্ট উপকার। ওঁর প্রাণটাকে একটিমাত্র বুলেটের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলাম। তারই প্রতিদানে–।
মনে হচ্ছে আপনি অত্যন্ত ডেয়ারডেভিল?
এবং রাগলে চণ্ডাল।
এই মুহূর্তে রেগেছেন?
হ্যাঁ।
কার ওপর?
যারা আমার বউকে ফ্লাইং প্লেন থেকে হাওয়া করে দিয়েছে।
কৌতূহল জাগিয়েছেন কিন্তু।
নিরসন করা টেলিফোনে সম্ভব নয়। আমার পক্ষেও আপনার কাছে যাওয়া সঙ্গত নয়।
অতএব আমিও আসছি। প্রেমচাঁদ কখনও ছ্যাচড়া কেস আমাকে দেয় না।
আসুন। কিন্তু হোটেলে কেউ যেন জানতে না পারে আপনি এসেছেন আমার কাছে।
আই সি। আর ইউ আন্ডার অবজারভেশন?
আই থিঙ্ক সো।
ডোন্ট ওরি। আই নো মেনি টেকনিকস্।
দুজনে এখন মুখোমুখি বসে। ইন্দ্রনাথ রুদ্র আর বিদ্রোহী বর্মন।
ইন্দ্রনাথ বললে, আপনার প্রাণ যে-কোনও মুহূর্তে যেতে পারে, সেইসঙ্গে আমার।
বিদ্রোহী–ভয় দেখিয়েছে মনে হচ্ছে?
ইন্দ্রনাথ–আপনার টেলিফোন রাখবার সঙ্গে-সঙ্গে। ছোট্ট উপদেশ–আমি যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমোই। নইলে খতম কহানি শুরু হয়ে যাবে।
বিদ্রোহীর মড়ার মতন মুখে কোনও ভাববিকৃতি দেখা গেল না–শুধু প্রদীপ্ত হল চোখের অঙ্গার। বলে গেল ইন্দ্রনাথ, ঘরে আলো জ্বলছে, স্টার টিভি চলছে, চলবে। আমারও সিক্রেট প্যাসেজ আছে, আপনাকে বলা যাবে না।
গুড, এখানে ঢুকলেন কীভাবে?
খোলাখুলি।
মানে?
সবার নাকের ডগা দিয়ে, বলে আর কথা না বলে এক টুকরো কাগজ বিদ্রোহীর চোখের সামনে মেলে ধরল। তাতে লেখা আছে?
এদেরকে ধরতে হলে অথবা এই রহস্যের মীমাংসা সূত্র বের করতে হলে সম্মুখযুদ্ধ অনিবার্য। কোনও কথা না। এ ঘরে লুকোনো মাইক্রোফোন আর চোরা টিভি ক্যামেরা থাকতে পারে। এখুনি উঠুন। আমার সঙ্গে বেরোন। ট্যাক্সি ধরব। তারপর দেখি কী হয়।
পড়া সাঙ্গ করে ইন্দ্রনাথের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিল বিদ্রোহী। অপূর্ব সুন্দর মানুষ। যেন টুসকি দিলে রক্ত ফেটে পড়বে গালে। মর্মর মূর্তি সহসা সজীব হয়ে গেলে বুঝি চোখমুখ চিবুকের গড়ন এমন নিখুঁত হয়। সবচেয়ে সুন্দর দুটি চোখ। ভাবালু। স্বপ্নিল। কবি অথবা দার্শনিক বলা সঙ্গ ত। মানুষটার পরনেও মুগার পাঞ্জাবি আর চুনোট করা ধুতি। গা ঘিরে ভুরভুর করছে দক্ষিণ ফ্রান্সের ল্যাভেন্ডারের খোশবাই।
এমন মানুষটা মানুষ-খুনেদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চায়? দ্বিধা জাগে বিদ্রোহী বর্মনের চোখেমুখে।
নীচে নেমে আসে দুই মূর্তি। সটান ঢুকে পড়ে ম্যানেজারের চেম্বারে। সে ভদ্রলোক আকার আয়তনে ক্ষুদ্র জলহস্তী বিশেষ। পরনে ব্লু সাফারি স্যুট। কেশবিরল মাথাটা প্রকাণ্ড। মুণ্ডটাও বিরাট। নিষ্প্রভ চক্ষুযুগল জানিয়ে দিচ্ছে, বিপুল কলেবরের এই জীবনটির যকৃৎ সুস্থ নয়। অতিরিক্ত মদিরা
সেবন নিশ্চয় হেতু, তাই দু-চোখের নীচে দুটো থলি ঝুলছে। চিবুকের নীচেও তিনথাক মাংস গরুর গলকম্বলের মতন ঝুলছে। দুই চিবুকের দুই কোণে যেন দুটি গলগণ্ড ফুলে রয়েছে। মিশকালো মানুষটা পান খাওয়া দাঁত দেখিয়ে কাষ্ঠ হেসে বললে, বলুন স্যার?
বিদ্রোহী বললে, আমার স্ত্রী কোথায়?
মড়া গাছের মতন চোখ বড় করে ম্যানেজার বললে, আপনি তো একা এলেন স্যার।
গতবার আমার সঙ্গে ছিল। মনে পড়ছে?
অফকোর্স..রিয়াল বিউটি।
তিনি কোথায়?
আপনি তো সঙ্গে নিয়ে দমদম এয়ারপোর্টে চলে গেলেন।
তারপর?
চলে গেলেন পোর্টব্লেয়ার–না, না, উনি যাননি।
আমার স্ত্রী যায়নি? মুখোশ মুখে অঙ্গার চক্ষু জ্বালিয়ে বললে বিদ্রোহী।
চিঠি পড়ে তাই তো জেনেছি।
চিঠি। কার চিঠি?
বেল টিপল ক্ষুদ্র জলহস্তী। ক্লার্ক ঢুকল ঘরে, এঁকে চেনো? মিস্টার বর্মন। গতবার এখান থেকে এয়ারপোর্ট গেছিলেন উইথ ওয়াইফ। তারপর একটা চিঠি আসেমিসেস বর্মনের। মনে আছে? কী লেখা ছিল চিঠিতে? উনি পোর্টব্লেয়ার যাচ্ছেন না। দিল্লির এডিকং হোটেলে যাচ্ছেন, এখানে চিঠিপত্র এলে যেন রিডাইরেক্ট করে দেওয়া হয়। ঠিক বলেছি? যাও।
বিদ্রোহীর দিকে তাকিয়ে শেষ করল ম্যানেজার, গেস্টদের খবরাখবর রাখতে হয় স্যার।
আই সি। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ইন্দ্রনাথের দিকে তাকায় বিদ্রোহী। ভেতরে পাওয়ারফুল ইঞ্জিনটা চালু হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র জলহস্তীর মুণ্ডুটা মুচড়ে ছিঁড়ে আনতে ইচ্ছে করছে।
স্মিত মুখে বললে ইন্দ্রনাথ, ট্যাক্সি বুথ থেকে ট্যাক্সি ডাকিয়ে এনেছিলেন আপনি?
খুবই সংযত স্বর ইন্দ্রনাথের। অথচ যেন পেতলের ঘণ্টা বাজছে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে। হুঁশিয়ার হয়ে যায় জলহস্তী। ম্যানেজার–ও ইয়েস।
কত নম্বর ট্যাক্সি, সে রেকর্ডও নিশ্চয় আছে। ভি আই পি গেস্টদের সিকিউরিটির ভার তো আপনার হাতে। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ডাকান।
.
তোমার ট্যাক্সিতেই ইনি গেছিলেন এয়ারপোর্টঃ সঙ্গে ছিলেন ম্যাডাম?
আগে গেছিলেন এয়ারলাইন্সের সিটি অফিসে। নিরক্ত মুখে বলে গেল শুটকে ট্যাক্সি ড্রাইভার। বিদ্রোহীর মুখ আর চোখ দেখে তার হৃৎপিণ্ড চঞ্চল হয়েছে। তাই জোর করে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইন্দ্রনাথের দিকে।
ইন্দ্রনাথের চোখে জ্বলছে নরম আলো–বিখ্যাত সেই প্রদীপ শিখা–যা শ্রোতার মনের কন্দরে আস্থা জাগিয়ে তোলে মনকে নির্ভয় করে তোলে।
বললে, সিটি অফিস থেকে?
