মন। শুকতারার এই আশ্চর্য মনের ক্ষমতার হদিশ পায়নি বিদ্রোহী নিজেও। চোখে চোখ রেখে যেমন বিদ্রোহীর মনের কথা হুবহু বলে দিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে চোখে চোখ রেখে শুকতারার মনের কথার প্রতিধ্বনিও বিদ্রোহীর মাথার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে। কীভাবে এটা হয়, তা বুঝতে পারেনি বিদ্রোহী। শুকতারাও বোঝাতে পারেনি। জিগ্যেস করলে শুধু হেসেছে। খুব চেপে ধরলে বলেছে, জানি না কেন এমন হয়। মাঝে-মাঝে মনে হয়, আমার ব্রেনের রেডিও তোমার ব্রেনের রেডিওর সঙ্গে এক টিউনিং-এ বাঁধা।
রেডিও? অবাক হয়েছে বিদ্রোহী।
তাছাড়া আর কী বলব বলো? তুমি আর আমি একই বৃন্তে দুটি ফুল। একই যন্ত্র দুটো খাঁচায় ঠাসা। আমি শুকতারা তুমি বিদ্রোহী;
শুনেছি মাথায় চোট পেলে অদ্ভুত ক্ষমতা অনেকের মধ্যে এসে যায়। পিটার হারকোস ছিলেন রঙের মিস্ত্রি। দোতলার ভাড়া থেকে পড়ে যান। মাথায় চোট লাগার পর অর্জন করেছিলেন ই এস পি।
সেটা কী?
এক্সট্রা সেনসরি পারসেপশন। অতীন্দ্রিয় অতি-অনুভূতি বোধ। শুকতারা, তোমার মাথায় কি কখনও চোট লেগেছিল?
সে তো তুমি দিয়েছিলে।
আমি!
সেই যে গো, কোলে তুলে নিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নিচ্ছিলে-খটাং করে মাথা লাগল সিলিং-এ।
ধ্যেৎ। তার আগে থেকেই তোমার মনের এই শক্তি দেখে আসছি। বিশেষ করে চাঁদনি রাতে তোমার এই ক্ষমতা যেন বেড়ে যায়। পূর্ণিমার চাঁদ যখন গোল রূপোর থালার মতন–
পূর্ণিমা সবাইকেই অল্পবিস্তর পাগল করে দেয়। আমি তো হবই।
না, শুকতারা, না–পূর্ণিমায় তুমি ভয়ানক পাওয়ারফুল।
হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে-দেখতে এইসব কথাই ভাবছিল বিদ্রোহী।
একা। আশপাশের ঝুলবারান্দায় জনপ্রাণী নেই। আর ঠিক এই সময়ে…
শুকতারা কথা কয়ে উঠল ওর মাথার মধ্যে।
শুনছ? বলি ও আর্যপুত্র, শুকতারা সুন্দরীর কথা কি শুনতে পাচ্ছ?
থ হয়ে যায় বিদ্রোহী।
পাগল হয়ে গেল নাকি?
পরক্ষণেই চোখ ঘুরে যায় চাঁদের দিকে।
আজ পূর্ণিমা।
আজই তো মনের শক্তির তুঙ্গে যেত তার চাঁদবদনি ধনি–সুন্দরী শুকতারা।
শুকতারা কি তবে বেঁচে আছে?
শুকতারা কি তার মনের কথা ধরতে পারছে?
আকুলভাবে মনের সব শক্তি জড়ো করে মনে-মনে আউড়ে যায় বিদ্রোহী, শুকতারা। শুকতারা। তুমি কোথায়?
জবাব তো এল না। একই কথা আবার ধ্বনিত হয়ে চলেছে মাথার মধ্যে, বলি ও আর্যপুত্র, তোমার শুকতারা যে বড় একা, বড় একা, কথা শুনতে পাচ্ছ?
দুহাতে মাথা চেপে বারান্দাতেই বসে পড়ে বিদ্রোহী। রগের শিরা ফুলে উঠেছে দড়ির মতন। পুঞ্জীভূত শক্তি দিয়ে বৃথাই মনে মনে বলে যাচ্ছে, শুকতারা। শুকতারা। কোথায় তুমি? তুমি কি জীবিত না মৃত? তুমি ইহলোকে না পরলোকে? এ কার কথা শুনছি? প্রেতিনী শুকতারার না দেহিনী শুকতারার?
জবাব নেই। একই কথা ঘুরে-ঘুরে আছড়ে পড়ছে বিদ্রোহীর মাথার কন্দরে, শুনছ? শুনতে পাচ্ছ? কথা বলছ না কেন?
ফ্ল্যাস খেলে যায় বিদ্রোহীর মগজে।
মাথায় চোট। কোপাইলট তার মাথায় মারার পর মুখের পেশির ওপর কন্ট্রোল হারিয়েছে বিদ্রোহী।
অঘটন ঘটেছে আর এক ক্ষেত্রেও।
শুকতারার কথাই যদি ঠিক হয় তাহলে বিদ্রোহীর ব্রেনের রেডিওটা বিকল হয়ে গেছে– অথবা, টিউনিং নষ্ট হয়ে গেছে।
নয়তো…
যা একেবারেই অবিশ্বাস্য তাই ঘটছে।
শুকতারা এখন বিদেহিনী।
না। আর সময় নষ্ট করা সমীচীন নয়।
এই মুহূর্তে পুলিশের কাছে যাওয়াও অসমীচীন। পুলিশ তার কথার একটা অক্ষরও বিশ্বাস করবে না।
এমন একজনের কাছে যেতে হবে যাকে পুলিশ মানে, জানে, চেনে।
কিন্তু সেরকম মানুষকে তো চেনে না বিদ্রোহী। ভবঘুরে জীবন যাপন করেছে বউকে নিয়ে মাসের পর মাস। বড়লোক ভ্যাগাবন্ড ছাড়া সে কিছুই নয় এই শহরের কলকাতায়। উঠেছে দামি হোটেলে শুধু পয়সার জোরে। তখন শুকতারা ছিল সঙ্গে।
এখনও উঠেছে সেই হোটেলে–এখন শুকতারা নেই সঙ্গে।
ম্যানেজারকে জিগ্যেস করবে?
ভুল হবে। ভয়ানক ভুল। যে শক্তিচক্রের সঙ্গে মোকাবিলা করতে নেমেছে তার চরচক্র কি হোটেলেও নেই? শুকতারাকে নিয়ে সে তো এই হোটেল থেকেই রওনা হয়েছিল দমদম এয়ারপোর্ট অভিমুখে। এই ম্যানেজারই ট্যাক্সি বুথ থেকে ডাকিয়ে এনেছিল ট্যাক্সি।
তাহলে উপায়?
বুদ্ধিটা মাথায় এসে যায় হঠাৎ।
ইয়োলো পেজ। সব বড় শহরেই চালু হয়ে গেছে এই সিসটেম। বিজনেস ডাইরেক্টরি। অনেক শহরে থাকে টেলিফোন গাইডের সঙ্গে।
ঘরে ফিরে আসে বিদ্রোহী। টেলিফোনের পাশেই রয়েছে পুরোনো টেলিফোন গাইড। তুলে নিয়ে পাতা ওলটাতেই চোখে পড়ে ইয়োলো পেজ সেকশান।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হেডিং-এর নীচে চোখ বুলিয়ে যায়। মড়ার মুখে এখন জ্বলছে কালো অঙ্গার। চোখ আটকে যায় সবচেয়ে বড় নামটায় যার শাখা অফিস ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরে।
প্রেমচাঁদ প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি। নামটা আগেও শুনেছে বিদ্রোহী। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার সময়ে।
.
অলস নয়নে মুখর টেলিফোনটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। তারপর তুলে নিল রিসিভার, ইন্দ্রনাথ রুদ্র বলছি।
আমি বিদ্রোহী বর্মন বলছি।
চিনতে পারলাম না।
স্বাভাবিক, আমি এই শহরের লোক নই। তবে প্রেমচাঁদ মালহোত্র আমাকে চেনে।
প্রেমচাঁদ প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি? বারণ করেছিলাম আমার ফোন নাম্বার যেন…
