জানলার দিকে এগিয়ে যায় নার্স। বন্ধ করে পাল্লা।
আঙুল দিয়ে মুখে চাপ দেয় বিদ্রোহী। আঙুল ঠেকেছে গালে, অথচ তা টের পায় না। চামড়ায় নেই অনুভূতিবোধ।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে নার্স। আর্ত চিৎকার করে ওঠে পরক্ষণেই।
চোখ তুলেছিল বিদ্রোহী। নার্সের আতঙ্ক আঁকা মুখচ্ছবি দেখেই ফের চোখ নামিয়েছিল দর্পণের ওপর।
শিউরে উঠেছিল নিজেই।
আঙুলের ডগা দিয়ে মুখের চামড়ায় চাপ দিয়েছিল বিদ্রোহী। যেখানে চাপ দিয়েছে, সেখানকার মাংস ঠেলে উঠে গেছে হনুর ওপর।
তরঙ্গায়িত মাংস বিকটাকার করে তুলেছে মুখণ্ডলকে। অবর্ণনীয় সেই আকৃতি কাপড়ের মতন ফ্যাকাশে চামড়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় প্রকৃতই লোমহর্ষক।
আঙুল দিয়ে টিপে টিপে মাংসর দলা নীচে নামিয়ে আনে বিদ্রোহী। তারপর হাতের চেটো দিয়ে তোলে আর নামায় দুই হনুর ওপরকার মাংস। তারপর আঙুল দিয়ে।
কাজ হচ্ছে আঙুলেই। চেটোর দরকার হচ্ছে না। যখন খুশি মুখের মাংস নড়িয়ে সরিয়ে দিয়ে মুখের চেহারা পালটে দিতে পারে বিদ্রোহী। মাংস যেখানে ঠেলে দিচ্ছে থেকে যাচ্ছে সেখানেই। ফিরে আসছে না আগের জায়গায়।
ঠিক এই সময়ে ঘরে ঢুকলেন স্টাফ ডক্টর।
বাঃ। জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন? কী রকম লাগছে?
বিদ্রোহীর মন এখন ওর শরীরের মতনই ছুটছে তুরঙ্গ গতিতে। মাত্র মিনিট কয়েক আগে জ্ঞান ফিরে পেয়েই জেনেছে ব্রেনের চোট কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে মুখের ওপর।
একই সঙ্গে বুঝে নিয়েছে দুটো সার সত্য।
শক্তি সঞ্চয় করতে হবে খুব দ্রুত–এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে।
বেরনোর পথ প্রশস্ত করার জন্যে প্রকাশ করা চলবে না শুকতারা বিহনের অন্তর যন্ত্রণা ভান করে যেতে হবে যেন শুকতারা নেই–কোনওকালেই ছিল না তার অস্তিত্ব।
বললে সুস্পষ্ট গলায়, খুব ভালো লাগছে।
ফাইন। এবার বলুন আপনার স্ত্রীর কথা।
স্ত্রী? আমার? আমি তো ব্যাচেলর।
উজ্জ্বল হয় ডাক্তারের মুখ, ভেরি ফাইন। জানতাম আপনার বিভ্রম একদিন কাটবেই। এবার আপনাকে ডিসচার্জ করা যায়।
থ্যাংকিউ, ডক্টর। চোখে চোখ রেখে বলে গেল বিদ্রোহী–চোখের মধ্যে দিয়ে মনের কথাও পড়ে নিল। ডাক্তারের অভিপ্রায় ছিল মতিভ্রমের ভিত্তিতে মারদাঙ্গা রোগীদের ওয়ার্ডে তাকে চালান করা, যেখানে আছে, দেওয়ালে প্যাড লাগানো খুপরি ঘর–ঘরে ঘরে উন্মত্ত নৃত্য আর গজরানি।
অল্পের জন্য ভয়ানক এই পরিণতি এড়িয়ে গেল বিদ্রোহী।
শক্তি সঞ্চয় করে গেল পরের কয়েকটা দিন। ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্য আর বিশ্রাম। দিনে দিনে বৃদ্ধি পেল শক্তির ভাণ্ডার। অবসর সময়ে শুধু ভাবল একজনের কথা। শুকতারার কথা।
গেল কোথায় মেয়েটা? প্লেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ তো ছিল না। তা সত্ত্বেও অন্তর্ধান ঘটিয়েছে কতিপয় দুবৃত্ত।
কেন?
বারংবার এই একটি প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে মনের মধ্যে। মাঝে-মাঝে ভয় হয়েছে, ভাবতে ভাবতেই না পাগল হয়ে যায়।
কীভাবে?
অজান্তে এ কোন চক্রান্তজালে জড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহী তার সুন্দরী শুকতারাকে নিয়ে? নারকীয় কর্মকাণ্ডের মূলে নিশ্চয় আছে অতীব নিষ্ঠুর আর অতিশয় শক্তিশালী একটা গোষ্ঠী। বিদ্রোহী একাই নয়–হয়তো আরও অনেকে শিকার হয়েছে হৃদয়হীন এই দলটির।
স্যানিটারিয়াম থেকে ডিসচার্জ সার্টিফিকেট পেয়ে গেল বিদ্রোহী। ঢুকেছিল একটা মানুষ বেরিয়ে গেল একটা মেশিন।
বরফ আর ধীরগতি আগুন দিয়ে গড়া একটা মেশিন।
এ মেশিনের পাওয়ারফুল ইঞ্জিন শুধু একটা গিয়ারেই বেঁধে রেখেছে নিজেকে…
যে গিয়ারের লক্ষ শুধু দুটি কাজ—
স্ত্রী উদ্ধার। এবং… ।
যে ফোর্স এইরকম ফ্যানট্যাসটিক পন্থায় তার জীবনে বিপর্যয় আবাহন করতে পারে সেই ফোর্সকে সমূলে ধ্বংস করা।
বিদ্রোহীকে দেখলেও এখন আর মানুষ বলে মনে হবে না। যেন স্টিল দিয়ে গড়া।
চুল তার তুষার শুভ্র, ক্রোমিয়ামের মতন। ভাবলেশহীন অতীব ভয়ঙ্কর মুখ ইস্পাতের মতন সাদা। এই মুখে গাঁথা কালো চোখ দুটো এমনই নিতল যে ক্ষণেক দৃষ্টিপাতেই মনে হবে যেন কুয়াশা আর বরফ দিয়ে ঠাসা এক তুহিনশীতল জগতের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। এমনকী পরনের স্যুটটাও বহন করছে এই অভিব্যক্তি–এ স্যুটের রং ইস্পাত-ধূসর।
পোর্টব্লেয়ার এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে বুকটা ধক করে উঠেছিল রানওয়ের ওপর অলস ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মস্ত প্লেন দেখে। একই সঙ্গে সাদা মুখের পটভূমিকায় চোখের মশাল জ্বলে ওঠে ধিকিধিকি। বিদ্রোহী জানে, এ প্লেনের দিকে ফিরে তাকানো মানেই বুকের খাঁচায় মহা ভয়ঙ্কর সেই আঘাতটাকে ফিরিয়ে আনা। এটাও জানে, প্রতিহিংসার অনলে বৈরী শক্তিপুঞ্জকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে গেলে এই দুটোই তার দরকার।
ধকধকে চোখ দেখেই কিন্তু এক পা পেছিয়ে গেছে এজেন্ট। বলে আমতা-আমতা করে, ইয়েস স্যার, দমদমের প্লেনে খালি রয়েছে একটা সিট।
থ্যাংকিউ, ঠোঁট নড়ে না বিদ্রোহীর–শব্দটা বেরিয়ে এল অতল কূপ থেকে–যেখানে অনির্বাণ রয়েছে প্রতিহিংসার আগুন।
প্লেনে উঠে বসে বিদ্রোহী। তাকিয়ে থাকে অ্যাটেনড্যান্টরা। সেদিকে চোখ নেই ওর। ও এখন একা, একেবারে একা।
প্লেন ছুটে যায় রানওয়ের ওপর দিয়ে।
.
প্রথম সূত্র
জীবনে অনেক পেয়েছে বিদ্রোহী বর্মন। সব পাওয়াকে ছাড়িয়ে গেছে একা শুকতারা।
শেষ অভিযান চলেছিল অস্ট্রেলিয়ায়। তিরিশ লাখ উপার্জনের পর বউকে নিয়ে ঘুরেছিল অর্ধেক পৃথিবী। বামুড়া, হাওয়াই, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, আলাস্কা–এখানকার অনেক মানুষ আজও মনে রেখেছে এই দুজনকে। বিদ্রোহীর মতন শুকতারাও ছিল ভাইটাল এনার্জির সজীব বোমা। যেখানে গেছে, সেখানেই প্রাণশক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শুকতারার সরু কোমর আর বড় চোখ, পাতলা ঠোঁট আর ঠেলে বেরিয়ে আসা চিবুক নারী পুরুষ সবার মনেই দাগ কেটে গেছে। ওর উছল হাসির মধ্যে ঝরনার সঙ্গীত কেউ ভুলবে না। যেন একটা চৌম্বক শক্তি দিয়ে আকর্ষণ করত সবাইকে এবং জয় করত মনের শক্তি দিয়ে।
