সে বলছে, ফোন করুন দমদমে। কতবার বলব?
করা হয়েছে, নরম গলায় জবাব দিল এয়ারপোর্ট ম্যানেজার। আপনার প্যাসেজের কোনও রেকর্ড সেখানে নেই।
বললাম তো, লাস্ট মিনিটে জোর করে উঠেছিলাম প্লেনে আমি আর আমার স্ত্রী। রেকর্ড থাকবে কী করে? কিন্তু ফিল্ডের লোকজন–
তারাও বলছে একই কথা। প্লেনে উঠেছেন একা। সঙ্গে স্ত্রী ছিল না।
দৃষ্টি বিনিময় ঘটে চার পুলিশের চোখে–তাৎপর্যপূর্ণ চাহনি।
তবে গেল কোথায় আমার ওয়াইফ? কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারছি না কেন?
সাতজোড়া অবিশ্বাসভরা চোখ চেয়ে রইল বিদ্রোহীর দিকে। সাতজোড়া হাতও এগিয়ে এল বেগতিক দেখলেই আঁকড়ে ধরার জন্য। বিদ্রোহীর চোখে জ্বলছে মশাল। মনের ভেতর প্রোজ্জ্বল হয়ে রয়েছে শুকতারার দুটি চোখ। টলটলে একজোড়া দীঘি–নিস্তরঙ্গ শান্ত চাহনি–নিমেষহীন নয়নে শুধু দেখছে বিদ্রোহীকে–যেভাবে জ্যোৎস্না রাতে অরণ্য অঞ্চলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকেছে– ঠিক সেইভাবে বিদ্রোহী বলেছিল–কী মুশকিল। পূর্ণিমার রাতে এত কষ্ট করে জঙ্গলে নিয়ে এলাম–আর তুমি দেখছ উঁদ? আমি কি জিরো হয়ে গেলাম? নরম চাহনি বিদ্রোহীর পানে ফিরিয়ে শুভ্র দাঁতে চাঁদের আলোর ঝিলিক তুলে শুকতারা বলেছিল, হে আর্যপুত্র, তুমিই যে আমার চাঁদ। অবাক হয়ে তখন ভাবছিলাম, আমার চাঁদ আকাশে গেল কী করে?
বুকের ভেতর কনকন করে ওঠে বিদ্রোহীর। ও যেন শুনতে পায় মনের আয়নায় শুকতারার চোখ বলছে, আমার চাঁদ আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে না কেন?
ইচ্ছে হয়েছিল সেই মুহূর্তে চিৎকার করে বলে, শুকতারা তুমি কোথায়? বন্দিনী কার কাছে? কীভাবে?
নিশ্চয় দুই চক্ষু তখন অগ্নিময় হয়ে উঠেছিল, স্ফুলিঙ্গ বর্ষণও করেছিল। আর সেই উন্মাদ চাহনি দেখেই সাত জোয়ান সাতরকম ভাবে ওকে চেপে ধরেছিল–নড়বার উপায় ছিল না বিদ্রোহীর।
আর ঠিক তখনি যেন ঝঙ করে একটা আওয়াজ হল ব্রেনের মধ্যে। যেন পিয়ানোর তার ছিঁড়ে গেল।
এল অ্যাম্বুলেন্স। নিয়ে গেল মামুলি হাসপাতালে নয় স্যানিটারিয়ামে।
নার্স—
.
ভাঙা কর্কশ কণ্ঠস্বর। কাহিল। নিজের কণ্ঠস্বর? চিনতে অসুবিধে হয় বিদ্রোহীর। সাদা জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিল শুভ্রবেশ পরা একটি মেয়ে। এ ঘরের দেওয়ালও সাদা। কিন্তু জানলার লোহার মোটা গরাদ। এত মজবুত গরাদ তো গেরস্থ বাড়িতে থাকে না। পায়ের কাছে দরজাটাও স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি। এখন রয়েছে বন্ধ।
সাদা পোশাক পরা মেয়েটি এল বিদ্রোহীর শয্যার পাশে–কী বলছেন?
কটা বাজে এখন?
বিকেল সাড়ে চারটে। নার্সের চোখে পেশাদারি হাসি–সেই হাসি ভেদ করে বিদ্রোহী দেখল–মনে মনে মেয়েটা কিন্তু হাসছে না–যেন সুদূরের পানে চেয়ে আছে।
বিদ্রোহীর সুদূর অতীতের দিকে কি?
সাড়ে চারটে? তার মানে অজ্ঞান ছিলাম আঠারো থেকে কুড়ি ঘণ্টা।
অজ্ঞান ছিলেন তিন সপ্তাহ। ব্রেন ফিভার হয়েছিল আপনার।
তিন সপ্তাহ!
ঝটিতে খাটে উঠে বসে বিদ্রোহী, আর দেরি নয়। যেতে হবে এখুনি।
আস্তে ঠেলে বিদ্রোহীকে শুইয়ে দেয় নার্স। বাধা দেওয়ার শক্তি নেই বিদ্রোহীর। বড় দুর্বল। শুয়ে পড়ে অসহায়ভাবে। মুখে কথা নেই। নীরবে চেয়ে আছে নার্সের দিকে।
বলে অবশেষে, ওভাবে চেয়ে আছেন কেন? কী দেখছেন? মাথার ভেতরটা অসাড় হয়ে থাকায় এর বেশি কথা বলতেও পারে না। এই অসাড়তার মধ্যে রয়েছে নিবিড় শান্তি-অস্থির উদ্দামতার লেশমাত্র নেই। এখানে আসবার আগে কী ঘটেছিল, তা মনে পড়ছে না। বাতাসে মিলিয়ে গেল নাকি শুকতারা? প্লেনের দরজা কি খুলেছিল?
নার্স বললে নরম গলায়, কেন তাকাচ্ছি? আপনি যে অনেক পালটে গেছেন, এখানে আসবার পর।
বলে, একটা আয়না ধরল বিদ্রোহীর মুখের সামনে।
ও দেখল নিজেকে। নিজের মুখকে। কিন্তু এ মুখ তো তার মুখ নয়।
তার চুল ছিল কয়লা কুচকুচে। আয়নায় যার মুখ দেখা যাচ্ছে তার চুল যে ধবধবে সাদা– তুষার শুভ্র। এ মুখের চামড়া সাদা কাপড়ের মতন–অথচ ওর ফরসা মুখ ছিল রোদ ঝলসানো। প্রাণশক্তিতে রাঙানো। এ মুখে কোনও ভাব-বিকাশ নেই–যেন একটা মোমের মুখোশ।
আর এই ভাবহীনতার মধ্যেই প্রচ্ছন্ন রয়েছে ভয়ানক কিছু। যাকে স্বাভাবিক বলা যায় না। মড়ার মুখ–জীবিত মানুষের মুখ এমন হয় না। এক্কেবারে অনড় মুখাবয়ব। দেখলে ভয় হয়। স্বাভাবিক মোটেই নয়। প্রাণময় প্রাণীর মুখ কি এমন হয়? না। স্পন্দনহীন সেই মুখ দেখলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
দম আটকে আসে বিদ্রোহীর। দলা পাকিয়ে ওঠে গলার কাছে। হাসবার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
ঠোঁট, ভুরু, মুখের সমস্ত মাংস একেবারে স্থির।
চেষ্টা করে কপাল কুঁচকানোর–ব্যর্থ হয়। পারে না ভেংচি কাটতেও।
কোমল কণ্ঠে বললে নার্স, মুখের পেশি প্যারালাইজড হয়ে গেছে। না, না, পারমানেন্ট প্যারালিসিস নাও হতে পারে। কণ্ঠস্বরেই প্রকাশ পায় সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা–চিরকাল এমন থাকবে না।
হল কী করে? বিদ্রোহীর কণ্ঠস্বর বিলক্ষণ আড়ষ্ট।
সঠিক বলা যাচ্ছে না। দুটো কারণ অনুমান করা হয়েছে।
কী কী?
প্লেনে আপনার মাথায় মেরেছিল কোপাইলট। ব্রেনে চোট লাগার দরুন হতে পারে।
আর?
নার্ভ শক–ডিলিউশনের জন্যে।
ডিলিউশন? আমার?
হ্যাঁ।
নিজের অনড় মুখের দিকে চেয়ে থাকে বিদ্রোহী। সাদা কাপড়ের মতন মুখ। কয়লা কালো চোখ দুটো শুধু ধকধক করছে তার মাঝে।
