দেখল, ওর পাশের সিট শূন্য।
যেখানে বসেছিল সুন্দরী শুকতারা একটু আগেই।
নির্নিমেষে শুন্য সিটটার দিকে চেয়ে রইল বিদ্রোহী। শিরশির করে উঠল ব্রহ্মতালুর চামড়া।
কিন্তু শিউরে ওঠবার মতন কিছুই তো ঘটেনি। লেডিজ ল্যাভেটরি পেছনে–শুকতারা গেছে। সেখানে।
বেঁটে সলিড লোকটা এখনও চুরুট কামড়ে চলেছে–অগ্নিসংযোগ এখনও ঘটেনি। বিদ্রোহীর দিকে পূর্ণ চোখে ক্ষণেক তাকিয়ে চাহনি ফিরিয়ে নিল জানলার দিকে। বাকি ছয় পুরুষ আর এক নারী দৃকপাতই করল না ওর দিকে। পেছন থেকে এগিয়ে এল বিমানসুন্দরী। হাতছানি দিয়ে তাকে কাছে ডাকল বিদ্রোহী।
আমার স্ত্রীর শরীর সুস্থ তো? ল্যাভেটরিতে গেল নাকি?
আপনার স্ত্রী? ললাটে ঈষৎ কুঞ্চন জাগিয়ে বললে বিমান-অপ্সরা।
হ্যাঁ। সিক হয়ে গেল নাকি প্লেন মোশান-এর জন্য?
বুঝলাম না। রূপসীর চোখে এখন জাগ্রত হচ্ছে অদ্ভুত চাহনি।
নিমেষে প্রদীপ্ত হল বিদ্রোহীর কয়লা কালো চোখ, কালো স্ফুলিঙ্গ যেন বিমান রূপসীর সুন্দর তনুর মর্মস্থল ভেদ করে গেল চকিতে। একই সঙ্গে শিরশির করে উঠল শিরদাঁড়ার শীর্ষদেশ।
বললে স্পষ্টতর উচ্চারণে, আমি বলছি আমার স্ত্রীর কথা। একটু আগেই বসেছিল আমার পাশে–ওই সিটে।
ও সিট তো খালিই ছিল।
চকচক করে ওঠে বিদ্রোহীর কপাল। আবির্ভাব ঘটেছে স্বেদবিন্দুর। ইস্পাতের দীপ্তি দেখা যায় কালো চোখে।
বিমান তিলোত্তমার কথা কিন্তু থামেনি, কী বলেছেন বুঝতে পারছি না। প্লেনে উঠেছেন একা–কেউ তো সঙ্গে ছিল না।
মনে হচ্ছে আপনার মাথা খারাপ হয়েছে, ডম্বরু কণ্ঠে শব্দগুলো নিক্ষেপ করেই ঘুরে গেল বিদ্রোহী। চর্বির পাহাড় বসে আছে ওর সব চাইতে কাছে। বললে তাকেই, আপনি তো দেখেছেন আমার স্ত্রীকে। বলে দিন এই স্টুপিড স্টুয়ার্ডেসকে।
খুব আস্তে মাথা নাড়ে চর্বির পাহাড়।
ঠিকই বলেছেন স্টুয়ার্ডেস। দমদম এয়ারপোর্টে আপনি একাই উঠেছেন প্লেনে–কেউ ছিল সঙ্গে।
জীবনমৃত্যুর লড়াইয়ে বহুবার নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়র ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বিদ্রোহীকে। কখনই দুর্বলতা দেখায়নি শ্রবণশক্তি। সুতরাং এখনও ভুল শুনছে কানে–তা ভাবতে পারল না। ঘুরে দাঁড়াল অন্যান্যদের দিকে।
আপনারা তো দেখেছেন আমার স্ত্রীকে?
পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকের মুখ নিরীক্ষণ করে যায় বিদ্রোহী। সব মুখেই ভাসছে অবাক চাহনি। বিমূর্ত বিস্ময়–যেন একযোগে সবাই প্রত্যক্ষ করছে এক বদ্ধ উন্মাদকে। ভয়ের ভাবও মিশে রয়েছে। চাহনিগুলোর মধ্যে।
প্রায় লাফিয়ে প্লেনের পেছনে চলে যায় বিদ্রোহী। দড়াম করে খোলে লেডিজ ল্যাভেটরির দরজা। কেউ নেই ছোট্ট খুপরিতে। দৃষ্টি নিক্ষেপ করে টেল কম্পার্টমেন্টে৷ শুধু লাগেজই রয়েছে সেখানে–আর মেল ব্যাগ। দৌড়ে চলে আসে প্লেনের সামনের দিকে ঝটকান দিয়ে খোলে পাইলটের কম্পার্টমেন্টের দরজা। ক্রুদ্ধ চোখে ওর দিকে তাকায় পাইলট আর কোপাইলট। তারপরেই ঘাবড়ে যায় বিদ্রোহীর চোখে ঘনায়মান ক্ষিপ্ততা দেখে।
ওর মাথায় তখন চর্বিপাক দিচ্ছে একটাই অসম্ভব সত্য।
সুন্দরী শুকতারা নেই এই প্লেনে।
কঠিন ধাতুর রড বুঝি মট করে ভেঙে গেল বিদ্রোহীর কণ্ঠস্বরে, ড্যাম ইউ অল। হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান? হোয়্যার ইজ মাই ওয়াইফ? ছিটকে যায় দরজার সামনে। লক করা রয়েছে। এ দরজা এখন ভোলা প্রায় অসম্ভব–উড়ন্ত প্লেনে বাইরের এয়ার প্রেসার ঠেলে দরজা খোলা এত সহজ নয়। লাটুর মতন অবয়বটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে তাকায় আরোহীদের দিকে।
চর্বির পাহাড় আর বেঁটে সলিড লোকটা পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে।
অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে বিমান-রূপসী, মাথা বিগড়েছে। ধরুন।
তাহলেই মরবেন। বিদ্রোহীর কণ্ঠস্বর বিদ্রোহীই এখন চিনতে পারছে না।
আগুয়ান দুজনেই পিছিয়ে যায় এক পা। উঠে দাঁড়িয়েছে অন্য পাঁচ পুরুষ। এখন ওরা সাতজন।
বিদ্রোহীর হাত চলে যায় হিপ পকেটে। খুদে রিভলভার ওর নিত্য সঙ্গী।
কণ্ঠে মিনতি জাগায় বিমান-সুন্দরী–প্লিজ। কেন বুঝছেন না? আপনি তো একাই উঠেছেন। একাই বসেছিলেন। কেউ তো আপনার সঙ্গে ছিল না। ইউ আর হ্যাঁভিং ডিলিউশন।
যেন অবোধ বালকের মতিভ্রম ঘোচাতে চাইছে স্টুয়ার্ডেস।
স্ত্রী আমার সঙ্গেই ছিল না–এটাই তো বলতে চান? বলতে বলতে শুন্য সিটটার দিকে এগিয়ে যায় বিদ্রোহী–কুশন এখনও গরম বডির গরমে। দেখুন–
কুশন কিন্তু ঠান্ডা। কেউ সেখানে বসেছে বলে তো মনে হচ্ছে না। আস্তে আস্তে হাত তুলে নেয় বিদ্রোহী।
স্ত্রী নেই প্লেনে। একসময় যে ছিল, তারও কোনও প্রমাণ নেই। প্যাসেঞ্জার আর কর্মীরাও বলছে, শুকতারা ওঠেনি প্লেনে। প্লেন থেকে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ারও কোনও পথ নেই।
পেছন দিকে পাইলটের দরজা ফাঁক হচ্ছে একটু-একটু করে। তন্ময় হয়ে থাকায় ওদিকে খেয়াল ছিল না বিদ্রোহীর। নিঃশব্দে বেরিয়ে এল কোপাইলট। দু-হাতে উঁচু করে ধরল আগুন নেভানোর সিলিন্ডার। সবেগে নিক্ষিপ্ত হল মানুষটার মাথার ওপর। যে মানুষটার দিকে সভয়ে তাকিয়ে রয়েছে সকলেই।
লুটিয়ে পড়ে বিদ্রোহী।
.
ট্র্যাজেডির পরের ঘটনা
পোর্ট ব্লেয়ার এয়ারপোর্ট।
চারজন পুলিশ আর তিনজন ফিল্ড অ্যাটেনড্যান্ট–প্রত্যেকেই লোহায় পেটা ভীম বললেই চলেদাঁড়িয়ে রয়েছে বিদ্রোহী বর্মনের গা-ঘেঁষে। এত কাছে থাকার কারণ, দু-দুবার বিদ্রোহীর কালো চোখে উন্মাদ অগ্নির নৃত্য দেখা গেছে। মাসল গুটিয়ে ইস্পাতের বল হয়ে গেছে–প্রতিবারেই তাকে চেপে ধরেছে সাতজন একসঙ্গে। বিদ্রোহীর মুখাবয়ব খড়ির মতন সাদা।
