বিদ্রোহী বললে, পোর্টব্লেয়ারে যাব–এখুনি।
ধেয়ে চলেছে সে এয়ারলাইনারের দিকে।
বিদ্রোহী যখন নিশ্চল, তখন সে সম্ভ্রম ছিনিয়ে নেয়। যখন সে চলমান, তখন তাকে স্বচ্ছন্দ গতিতে শিকারি চিতার মতন ধাবমান বলেই মনে হয়। বহু যুগে এমন শরীরী বিদ্যুৎ দেখবার সৌভাগ্য হয় মানুষের। প্রাণশক্তির তীব্রতা স্ফুরিত হয় হাতে-পায়ে সর্ব অঙ্গে। অথচ সে আয়তনে বিপুলকায় নয়। হাইটে মাত্র পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। ওজন মোট একশ ষাট পাউন্ড।
স্বামী স্ত্রী একই গতিবেগে চলে এসেছে প্লেনের কাছে। ডবল মেটাল ডোর এখনও খোলা রয়েছে। ধাতুর সোপান এখনও যথাস্থানে রয়েছে। প্লেন ঘুরে একজন অ্যাটেনড্যান্ট এসে দাঁড়াল বিদ্রোহীর সামনে।
বললে, এ প্লেনের দুটো খালি সিট কি আপনাদের জন্যে?
লোকটা বেজায় লম্বা। হাড়সবর্ষ। আঙুলের গাঁট বেশ মোটা। চামড়া লালচে আর কর্কশ। বিদ্রোহীর কালো চোখের ওপর কালো ভুরু জোড়া নারকেল দড়ির মতন শক্ত হয়ে ওঠে লোকটার দিকে তাকিয়েই।
দুই চোখে জয়োল্লাস ভাসল তৎক্ষণাৎ।
সিট তাহলে আছে। অথচ বলল নেই। ঘোর চক্রান্ত।
আপনাদের টিকিট যদি না থাকে–
পোর্টব্লেয়ারে নেমে মিটিয়ে দেব। ফরম্যালিটি যদি কিছু থাকে সেরে নিন–এসো সুন্দরী।
শুকতারাকে শুধু সুন্দরী বলেই ডাকে বিদ্রোহী। চিরকাল। বিয়ের আগে থেকে। শুনে যারা চোখ কপায়, তাদের দিকে কালো চোখের হিরে জ্বালিয়ে রাখে–থেমে যায় চোখের কাঁপন।
টুকটুক করে সিঁড়ি বেয়ে প্লেনের ভেতরে গিয়ে ঢোকে দুই মূর্তি। একজন পুরোদস্তুর হি ম্যান, আর একজন অণু পরমাণুতেও শী-ম্যান। প্রপেলারের গর্জন চলছে, ধাম করে বন্ধ হচ্ছে মেটাল ডোর, লক করেও দেওয়া হল সে দরজা। চলতে শুরু করেছে প্লেন। চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। বিদ্রোহী। ঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছে। কিন্তু অন্যান্য আরোহীদের চিনতে পারছে না।
ওরা স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও আটজন প্যাসেঞ্জার রয়েছে প্লেনে। সাতজন পুরুষ। একজন নারী। মহিলাটির শ্রী অঙ্গে আকর্ষণ আছে বিলক্ষণ। কিন্তু মুখ শক্ত, চোয়াল শক্ত, নাক শক্ত। এগুলি না থাকলে তাকে পারফেক্ট বিউটি বলা যেত। ছয় পুরুষের একজন বিশালকায় এবং স্থূলকায় বাড়তি চর্বি জমেছে শরীরের সব জায়গায়। দ্বিতীয়জনও বিশাল, তবে চর্বির পাহাড় নয়–এর হাতে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ কালো চুল। তৃতীয়জন খর্বকায়, সলিড বপু–দাঁতের ফাঁকে মোটা চুরুট। বাকি চারজন ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতন মামুলি চেহারার অধিকারী। পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত করে সুন্দরীর পানে তাকায় বিদ্রোহী–খুশি তো?
নিজের সিটে বসে ঈষৎ ঝুঁকেও পড়ে। ইস্পাত-পাঞ্জা রাখে সুন্দরীর কাঁধে। যেন হরগৌরী। নিবিড় সম্পর্কটা বিজ্ঞাপিত ওই একটি আচরণেই।
ফাইন। মিষ্টি হেসে বললে সুন্দরী।
রিল্যাক্সড হয়ে যায় বিদ্রোহী। প্লেনের মৃদু আন্দোলনে আন্দোলিত হয় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি বডি। সূর্য ডুবছে দিগন্তে–গোধূলি অবগুণ্ঠন মেলে ধরছে ধীরে ধীরে।
সুন্দরীর মা মৃত্যুশয্যায়। যদি কিছু হয়ে যায়, বিশাল সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে চলেছে সুন্দরী। নির্বিকার থাকার চেষ্টা করে বিদ্রোহী।
প্লেনের গর্জন এখন কানে সয়ে গেছে। কালো ইস্পাতের পাতের মতন বঙ্গোপসাগর পড়ে রয়েছে নীচে। আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে না সাগরের জলও তাই কালো। বেঁটে সলিড লোকটা জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে–তার দৃষ্টি নেই আর কোনও দিকে।
বছর বিশেক বয়সের স্টুয়ার্ডেস এগিয়ে এল সুন্দরী শুকতারার দিকে। সুন্দরীরা সুন্দরীদের দিকে বেশি তাকায়–পুরুষদের দিকে ততটা তাকায় না। শুকতারা দেখে নিল স্টুয়ার্ডেসকে। স্লিম
অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ।
হাসল স্টুয়ার্ডেস। কিছু প্রয়োজন কি শুকতারার?
না, শুকতারা ভালোই আছে। তবে উঠে দাঁড়াল বিদ্রোহী। হাত দুটো তার চটচট করছে। ধোয়া দরকার। এগোল ল্যাভেটরির দিকে।
চলন ভঙ্গিমায় আবার ঠিকরে গেল সেই মসৃণ পিচ্ছিলতা–শক্তি ঠাসা পেশিপুঞ্জ থেকে যার আবির্ভাব ঘটে। প্রতিটি পদক্ষেপে চিতাবাঘের রাজকীয়তা–অঙ্গ ঘিরে বিদ্যুৎ-বহ্নির অদৃশ্য বিচ্ছুরণ। শুধু চলন ভঙ্গিমাই নয়। মাঝারি মাপের ফ্রেমে বিরল শক্তির কাহিনি যেন কথা কয়ে উঠবে ওর শরীরটার দিকে তাকালে। দক্ষ লড়াকুর পূর্ণ বয়েসের সমস্ত অভিজ্ঞতাই সঞ্চিত হয়েছে। বিদ্রোহীর শক্তিঠাসা শরীরটার সব জায়গায়। একই সঙ্গে যৌবনের আগুন আর সহনশীলতাও বিধৃত রয়েছে প্রতিটি অণুপরমাণুতে। বিদ্রোহী এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে এমনই তড়িৎ, শক্তি অর্জন করেছে যা চোখে পড়ে কদাচিৎ।
শুকতারা এহেন বিরল পুরুষের দিকে তাকিয়ে হাসল ছোট্ট আর মিষ্টি হাসি। হাসি ফিরিয়ে দিল বিদ্রোহী কালো চোখের তারা নাচিয়ে। তারপর দরজা খুলে ঢুকল টয়লেট রুমে।
হাতে ময়লা না থাকলেও হাত ধোওয়ার বাতিক আছে বিদ্রোহীর। জঙ্গলে অথবা মেরু প্রান্তরে, শহরে অথবা পর্বতে লক্ষ কোটি টাকার অ্যাডভেঞ্চারে গেছে বিদ্রোহী হাত ধোওয়ার বাতিক ছাড়েনি। এক বিন্দু জলের দাম যেখানে সোনা দিয়ে ধার্য করা যায়–সেই মরু অঞ্চলেও দু-হাতের কল্পিত ক্লেদ সাফ করতে জল অপচয় করেছে নির্বিকার ভাবে।
ধীরে সুস্থে নিতান্তই অলস ভঙ্গিমায় দুহাত পরিষ্কার করে নিল বিদ্রোহী–ফিরে এল প্লেনের মধ্যে।
