সুন্দরী তুমি শুকতারা
গৌরচন্দ্রিকা
ফুটন্ত লোহা গজায়, কিন্তু বানিয়ে দেয় ইস্পাত। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির লেলিহান অগ্নিশিখায় মানুষও কখনও কখনও পালটে যায়–অসহ্য কষ্ট তাকে প্রায় অমানুষ করে দেয়। বিদ্রোহী
বর্মন-এর ক্ষেত্রে হয়েছিল ঠিক তাই। সুন্দরী স্ত্রীকে হারানোর পর সে হয়ে গেল নিছক একটা মেশিন, প্রতিহিংসা নেওয়ার মেশিন।
আমরা জানি সে এখন কী হয়েছে ও বরফ আর ইস্পাতে গড়া মূর্তি, এই দুইয়ের চাইতেও বেশি নিষ্করুণ; অতি ভয়ানক প্রায় নৈব্যক্তিক এক শক্তি, যার মড়ার মতন সাদা মুখ মুখোশের মতন ঢেকে রেখে দেয় হিমশীতল প্রায় অলৌকিক নির্মম প্রতিভাকে সমাজশত্রু হননের পূর্বমুহূর্তেই কেবল নারকীয় আগুন দেখা যায় কালো চোখের মণিকায়–
এ কাহিনি সেই বিদ্রোহী বর্মনের–
সঙ্গে আছে গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ রুদ্র।
.
অর্ধাঙ্গিনীর অন্তর্ধান
ফাগুনের আগুন লেগেছে বনে-বনে।
দমদম এয়ারপোর্টের দুরে-দূরে দেখা যাচ্ছে এহেন আগুনের সমারোহ।
এয়ারপোর্ট কিন্তু নিস্তরঙ্গ পুষ্করিণীর মতনই স্থির। পুকুরের শোভা যেমন পদ্ম ফুল, এয়ারপোর্টেও তেমনি ঝকঝক করছে খানকয়েক এরোপ্লেন।
শান্ত এয়ারপোর্টে ঝিকমিকিয়ে চলেছে ফাগুনের আনন্দময় রোদ। এই দৃশ্যই নয়নভরে দেখছে বিদ্রোহী বর্মন। তখন কি কল্পনাও করতে পেরেছিল যে এমন সুন্দর জায়গাটাই তার জীবন সাহারার সূচনাকেন্দ্র হয়ে দাঁড়াবে? ভাবতেও কি পেরেছিল অপরিসীম আতঙ্কঘন ফ্যানট্যাসটিক ঘটনার পর ঘটনা তার গোটা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে?
না, পারেনি।
আতঙ্কের জীবাণু প্রশান্ত পরিবেশে লীলা দেখাতে পারে না–এ হেন জায়গায় তার সৃষ্টির সম্ভাবনাও থাকে না।
অথচ রৌদ্রবিধৌত অপরূপ এই দমদম বিমান বন্দরেই আতঙ্ক হল অঙ্কুরিত। বিদ্রোহী বর্মন সর্বজনের কাছে পরিচিত ছিল হাসিখুশির অফুরন্ত আধার হিসাবে–কৌতুকবোধ অপসৃত হল তার চরিত্র থেকে।
ট্র্যাজেডির বীজ বপন হয়ে গেল শান্তিময় এই ক্ষেত্রেই–পালটে গেল বিদ্রোহী বর্মনের জীবনের ছন্দ।
.
ডগলাস বিমানে দশজন প্যাসেঞ্জার বসতে পারে। প্রাইভেট এয়ারলাইন্স-এর বিমান। দুটো আছে। এখুনি একটা আকাশে উড়বে। তাই যেন দম নিচ্ছে। রানওয়ের ওপর খাড়া। শেষ লাগেজটা এইমাত্র প্রবেশ করেছে তার উদরে। জানলায় বসে সেই দৃশ্য দেখল বিদ্রোহী।
বলল এজেন্টকে, আমাকে যে যেতেই হবে পোর্টব্লেয়ার–এখুনি।
সসম্ভ্রমে বিদ্রোহীর দিকে চেয়ে রইল এজেন্ট। সম্ভ্রম সে ছিনিয়ে নেয় সবার কাছ থেকেই। তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে। তার চাবুক চেহারা দিয়ে। কণ্ঠস্বরের মাদল বাজনা দিয়ে। তার কুচকুচে চুলের ঝিকিমিকি, তার কৃষ্ণতর চোখের কালো দীপ্তি পুরুষ অথবা নারী–সবাইকেই মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে প্রথম দর্শনেই।
এত সমীহবোধ সত্ত্বেও ঘাড় নাড়ল এজেন্ট। নিতান্তই নারাজ।
বললে মৃদু স্বরে, কলকাতায় হেড অফিসে খোঁজ নিয়ে আসেননি? একদম জায়গা নেই। সব সিট ফুল।
বিদ্রোহীর কালো মণিকা দুটোয় শুধু কালো স্ফুলিঙ্গ দেখা দিল–ক্ষণেকের জন্য। পিয়ানোর ইস্পাত তারে টঙ্কার দিলে যেরকম শিরশির আওয়াজ বেরয়, সেই আওয়াজ ধ্বনিত হল তার কণ্ঠস্বরে–খুব নীচু খাদে।
বললে, আমাকে যে যেতেই হবে। আমি আর আমার স্ত্রী। স্ত্রীর আত্মীয়া খুবই অসুস্থ। মুমূর্ষ।
হাত রাখল শুকতারার হাতে। বিদ্রোহীর হাতের পাঞ্জা দেখলে বোঝা কঠিন প্রতিটি আঙুল যেন হাড় আর ইস্পাত দিয়ে গড়া–চামড়া দিয়ে ঢাকা; সে তুলনায় শুকতারার বাহু পেলব কোমল, মসৃণ চামড়া মখমল কোমল, উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সঙ্গে দুধ আর আলতার সংমিশ্রমের আভাস আছে। শুকতারা তাই শুধু সুন্দরী নয়–অপরূপ রূপসি। তার নাক মুখ চিবুক ইউরোপীয় মর্মর মূর্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তার দীঘল আঁখি আর মখমল পেলবতা পলিমাটির স্নিগ্ধতা মনে এনে দেয়। তার দুই চোখের তারার সমাহিত চাহনি মন-সমুদ্রের অতলতাকে বাঙময় করে তোলে। পরনে তার ফিকে গোলাপি রঙের অর্গান্ডি শাড়ি ফরসা রঙকে আগুনের মতোই প্রোজ্জ্বল করে তুলেছে। বিদ্রোহীর করস্পর্শে সাদা দাঁতের সারির আভাস, সে সামান্য হাসল। বরকে যেন সংযত হতে বলছে।
এজেন্ট কিন্তু নিরুপায়। ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়েই চলেছে। সমবেদনা জানাচ্ছে, একই সঙ্গে অক্ষমতাও প্রকাশ করে চলেছে।
কিছুই করা যাবে না। মাঝরাতে একটা প্লেন ছাড়বে–
অতক্ষণ ওয়েট করা যাবে না, ঝটিতি বললে বিদ্রোহী। ওর মুখের পরতে-পরতে সঙ্কল্প প্রস্তরকঠিন রূপ নিয়েছে। অতীতেও এরকম মুখাবয়ব দেখা দিয়েছে বিশেষ ক্ষেত্রে–যখনি সাধারণ মানুষ সমস্যা সমাধানে অপারগ হয়েছে বিদ্রোহী বর্মনের অ্যাডভেঞ্চারাস সত্তা সেই সমস্যা লুফে নিয়েছে। সমাধান হাতে তুলে দিয়েছে।
বললে, চাটার প্লেন নেব। যত বড়ই হোক না কেন–
চার্টার করার মতন প্লেন এখন ফিল্ডে নেই। সরি, কান্ট হেল্প।
ঠিক এই সময়ে এয়ারপোর্ট অফিসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল বিদ্রোহী বর্মন। দেখেছিল চাকা গড়গড়িয়ে রানওয়ের দিকে চলেছে ডগলাস।
এজেন্টের সঙ্গে আর কথা বলেনি বিদ্রোহী। দ্রুতপদে ধাবিত হয়েছিল দরজার দিকে। পেছনে এসেছে সুন্দরী শুকতারা।
শুধিয়েছিল, কী করতে চাও?
সুন্দরী শুকতারার কণ্ঠস্বরে বীণার ঝঙ্কার–স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সময় মূর্ত হয়ে ওঠে গভীর আস্থা–সে জানে, ধূসর অগ্নিশিখা সম স্বামী প্রবরের ডিক্সনারিতে অসম্ভব শব্দটা ঠাঁই পায় না।
