–খানাপিনা নাচগান তোক না, আমিও থাকব। নিরীহ সুরে বললে পিটার।
–হেড-হান্টারদের খানাপিনা নাচগানে কী হয় জানেন? অধীর কণ্ঠে বললে জো–কেন মুণ্ডুটা খোয়াবেন?
–জো, আরও নিরীহ সুরে পিটার বললে–ওদের বলে দাও, সোনালি মানুষ যদি ভগবানের পথ জুড়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাকেও যেতে হবে শয়তানের কেল্লায়–সেইসঙ্গে নিয়ে যাবে সব্বাইকে– যারা যারা খাবে শয়তানের জল।
শুনে আর একটি কথাও বলল না জংলি যোদ্ধার দল। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল কুঁড়ে ছেড়ে।
পনের মিনিটও গেল না।
দোলনা-বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে পিটার, এমন সময়ে খুকখুক কাশি শুনে চোখ তুলে দেখল দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দানবপুরুষ ওয়েপস্। মুখে মিষ্টি হাসি। গালে বেরি ফল।
চিবোতে চিবোতে বললে মধুক্ষরা কণ্ঠে হ্যালো পাদ্রী, বাইবেল পালিশ করছেন নাকি?
–না। আপনার পথ চেয়ে আছি।
–আমার পথ চেয়ে? সত্যি?
–রাইফেলটা এনেছেন?
–রাইফেল!
–রাইফেলটা ফিরিয়ে দেবেন, এই আশায় পথ চেয়ে আছি।
–সে গুড়ে বালি, পাদ্রী, তা ছাড়া ভগবানকে নিয়ে যে ব্যাবসা করে, তার রাইফেল দরকার হয় না।
–আমার দরকার হয়।
–সেকথা যাক। শুনুন। কালকেই আপনি এ গা ছেড়ে যাবেন।
–আবার সেই হেঁদো কথা?
–যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট পুরুতগিরি করে যাবেন।
–যথা?
–জ্যাসোনার সঙ্গে আমার বিয়েটা দিয়ে যাবেন।
–কক্ষনো না।
–তাহলে তাকে রক্ষিতা করেই রাখব।
হ্যামক থেকে ছিটকে গেল পিটার। কিন্তু দানবপুরুষ তৈরি ছিল। মোক্ষম এক ঘুষিতে পিটার ছিটকে গেল মাটিতে।
আঙুলের গাঁটে ফুঁ দিয়ে বললে ওয়েপস্–ঠিক এইভাবেই শেষ হয়ে যাবেন আপনি। ছোরা ছুঁড়তে শিখিয়ে দেব বিশ ফুট দূর থেকে চোখের পাতা কীভাবে কাটতে হয়–শিখিয়ে দেব। ইডিয়ট! রাইফেল পর্যন্ত নেই–এত সাহস কীসের?
মুখ থুবড়ে পড়ে রইল পিটার। জবাব দিল না।
পকেট থেকে আর এক মুঠো লাল বেরি বার করে মুখে পুরে বললে ওয়েপস্ কালকে বিয়ে দেবেন। আর আজ রাত্রে ঠিক আটটার সময়ে পাকা দেখার খানা খেয়ে নেবেন। এই ঘরেই। বেচাল দেখলে শেষ করে দেব। রাত ঠিক আটটার।
শূন্য হল দোরগোড়া। একভাবে মেঝেতে মুখ দিয়ে পড়ে রইল পিটার। পাক্কা আধ ঘণ্টা।
তারপর উঠে বসল। ঝোলা টেনে নামাল। ছবি আঁকা তার হবি। রঙের তুলি আর লাল রঙের শিশিটা নিয়ে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের অন্ধকারে।
ফিরে এল আধ ঘণ্টা পরে। ঘর খালি। জংলি রাঁধুনী উধাও। কিন্তু টেবিল সাজিয়ে রেখে গেছে। পাঁচটা মোমবাতি জ্বলছে। অর্কিড ফুল ছড়ানো রয়েছে। বেগুনি পায়রার রোস্ট, মিষ্টি আলু আর এক বাটি লাল বেরি। যেমনটি ভেবে রেখেছিল পিটার–ঠিক তাই।
পকেট খালি করে ফেলল তরুণ পাদ্রী। মুখ ধুয়ে এসে বসল হ্যামকে। কিন্তু হনুর কালসিটে মিলেল না।
ঠিক আটটার সময়ে ঘরে ঢুকল ওয়েপস্। পেছনে মোমসুন্দরীর মতোই তার ভাবী বউ। কাঠের পুতুল যেন। বসল টেবিলের সামনে।
হাসিমুখে দোলনা-বিছানা ছেড়ে নেমে এল পিটার। বসল ওয়েপসের ঠিক সামনের চেয়ারে।
হাসছিল ওয়েপস্। উল্লাসের হাসি। কিন্তু আস্তে-আস্তে তা মিলিয়ে গেল পিটারের হাসি দেখে।
ভ্রূকুটি করে বললে–এত হাসি কীসের পাদ্রী?
–পাকা দেখার সময় মুখ গোমড়া করতে নেই। অমঙ্গল হয়।
নির্নিমেষে চেয়ে রইল ওয়েপস্ম তলবটা কী?
–কিসসু না। আজ পাকা দেখা–
–পাদ্রী, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় না থাকলে এত বিপদ মাথায় নিয়ে এ জঙ্গলে কেউ থাকতে পারে । আমার তা আছে। মেয়েদের মতোই আসন্ন বিপদ টের পাই আমি। রাত ফুরোলেই যার প্রিয়তমা আমার শয্যাসঙ্গিনী হয়ে যাচ্ছে বাইবেল সাক্ষী রেখে–আজ তার মুখে এত হাসির ফোয়ারা কেন?
হাসতে হাসতেই বললে পিটার পাদ্রী–সেইটাই যে আমাদের কাজ।
নির্নিমেষে তবুও চেয়ে রইল ওয়েপস্। অন্যমনস্কভাবে হাত বাড়িয়ে বাটি থেকে পাকা বেরি তুলে নিয়ে গালে ফেলে চিবুতে চিবুতে কী যেন ভাবতে লাগল। চোখ ঘুরে এল ঘরময়। কোথাও কোনও অস্ত্র নেই। চোখ ফিরে এল পিটারের ওপর। মুখে হাসি লেগে তখনও।
আর এক মুঠো বেরি মুখে পুরল ওয়েপস্। মুখটা বিকৃত হয়ে এসেছে।
না, রাগে নয়। যন্ত্রণায়। চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঠোঁটের কোণ দিয়ে গাজলা বেরুচ্ছে।
টলছে তার দৈত্যদেহ। পরক্ষণেই থুথু করে মুখ ভরতি আধ চেবানো বেরি ফল পিটারের দিকে ছিটিয়ে দিয়ে বললে অবরুদ্ধ স্বরে–তু–তুই–
উঠে দাঁড়াল পিটার। এখন আর হাসছেন।
বললে–হ্যাঁ, ওয়েপস্। শয়তানের জল খেয়েছ এতদিন–এবার খেলে শয়তানের ফল। সবুজ বেরি। পাকা। কিন্তু লাল রং করা। আমিই করে এনে মিশিয়ে রেখেছিলাম লাল বেরির বাটিতে। মিষ্টি খেতে না?
জবাব দিতে পারল না ওয়েপ। হুমড়ি খেয়ে পড়ল টেবিলে। সেখান থেকে মেঝেতে।
জ্যাসোনা উঠে দাঁড়াল আস্তে-আস্তে। মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেও সে প্রশান্ত। চাউনি অতলান্ত।
ধীরকণ্ঠে বললে পিটার–আজ আমাদের পাকা দেখা। এসো।
.
পরের দিন সকালে জো ক্যানো নিয়ে রওনা হল শহরের দিকে। গাঁয়ের লোককে বলে গেল– ডাক্তার আর ওষুধ আনতে যাচ্ছে ওয়েপসের জন্যে। বড় অসুস্থ সে। প্রাথমিক চিকিৎসার ভার রইল পাদ্রীর ওপর। জংলিরা যেন তাকে সাহায্য করে।
তীরে দাঁড়িয়ে অপলকে পিটার আর জ্যাসোনা চেয়ে রইল অপসৃয়মান ক্যানোর দিকে।
ওরা জানেকাকে নিয়ে আসবে জো।
*নবকল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত। জানুয়ারি, ১৯৮১।
অ্যাড্রিয়ান কন্যান ডয়ালের গল্প অবলম্বনে।
