–দাঁতখোটাটা ফেলে গেলেন যে?
কাঠের গায়ে ইস্পাত গেঁথে যাওয়ার তীব্র শব্দ হল। আর্চিবন্ডের কানের এক ইঞ্চি পাশে দরজার ফ্রেমে গেঁথে গেছে ছোরাটা। ফলার দিকে চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল দানবপুরুষ।
বললে টেনে-টেনেহাতটা ভালোই দেখছি। বলেই অদ্ভুত হেসে হলদে চিতাবাঘের মতো একলাফে অদৃশ্য হয়ে গেল বাইরের অন্ধকারে।
পেছন থেকে হেঁকে বলল পাদ্রী–গুড নাইট।
নিরুদ্ধ নিশ্বাসে এতক্ষণ বাদে কথা বলল শ্বেতসুন্দরী–এবার যাবেন তো?
–যাব? কক্ষনো না।
–থাকলে মারা পড়বেন। জংলিদের লেলিয়ে দেবে।
–দিক।
–ঠিক আপনার মতো একজনেরই পথ চেয়েছিলাম এতদিন।
অন্ধকারে হারিয়ে গেল শ্বেতসুন্দরীও।
.
পরের দিন থেকেই পরিবর্তন দেখা গেল নোগোনে গ্রামে। নরমুণ্ড শিকারিদের গ্রামে সেই প্রথম প্রতিষ্ঠিত হল সত্যিকারের গিঞ্জে। বড় করে নেওয়া হল পিটারের কুঁড়ে ঘর। প্রতিদিন জংলিদের নিয়ে ধর্মালোচনা আরম্ভ হল সেই ঘরে।
দিন কয়েক বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যেই কাটল কিন্তু পিটার থারথের। দানবপুরুষ ওয়েপস্ হুমকি দিয়ে গিয়েছিল তার মাংস দিয়ে পেট ভরাবে কুমিরের। কিন্তু তার টিকি দেখা যাচ্ছে না।
দেখা গেল তার নাম লেখা কার্ডটাকে তার বদলে।
একদিন বিকেলে ঘরে ফিরে পিটার দেখল বন্দুক ঝোলানোর পেরেকে গাঁথা রয়েছে কার্ডটা : আর্চিবল্ড ওয়েপস, এফ. আর জি. এস.।
নেই কেবল রাইফেলটা।
কার্ডের তলায় লেখা–ভীমরুলের হুল না থাকাই ভালো।
তৎক্ষণাৎ আর্চিবল্ডের কুঁড়েঘরে ধাওয়া করেছিল পিটার। ন্যাংটা চাকরটা জঙ্গলের দিকে আঙুল তুলে বলেছিল–ওইখানে। এখানে নেই।
রাইফেল তো গেল। তা সত্ত্বেও পিটার থারথের চঞ্চল মন শান্ত হয়ে রইল শ্বেতসুন্দরীর সান্নিধ্যে। প্রতিদিন সে আসত। প্রথমে গির্জেতে বসে তরুণ পুরুতের মুখে বাইবেল অথবা স্তোত্রপাঠ শুনত। ভগবানের নামগানের ফাঁকে-ফাঁকে ভয়াবহ এই জঙ্গলের অনেক খবর শিখিয়ে দিত পুরুতঠাকুরকে। কোথায় গুঞ্জন-পক্ষী থাকে, কোন লাল বেরি ফল নিশ্চিন্তে খাওয়া যায়। কিন্তু তাদের জাতভাই সবুজ বেরি ফলকে জিভেও ঠেকাতে নেই। পাকা হলেও সবুজ সেই ফল বিষে ভরা– মৃত্যু আসে সঙ্গে-সঙ্গে। শিখিয়ে দিল পাইথনের গন্ধ চিনতে হয় কীভাবে এবং কোন গাছের রস দিয়ে গেছো মাকড়সার হুলের জ্বালা কমানো যায় চক্ষের নিমেষে।
পারস্পরিক শিক্ষার মাধ্যমে অনেক কাছে চলে এল দুটি মন।
একদিন গোধূলি লগ্নে নদীর ধারে পাশাপাশি বসে দুজনে শেখাচ্ছে দুজনকে, গাছের মাথায় চঁদ উঁকি দিয়ে দেখছে আদম আর ঈভের কাণ্ড। এমন সময়ে দুজনেরই মুখের কথা হারিয়ে গেল নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করে চলল কেবল গাইয়ে ব্যাঙের দল বিরামহীনভাবে।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পিটার বললে কথাটা পেটে গজগজ করছে। কিন্তু মুখে আনতে পারছি না।
–কী কথা?
–বলব?
–নিশ্চয়।
–আ-আমি তো-তোমাকে–
–ভালোবাসো। এই তো? শ্বেতসুন্দরীর হাতের পরশ পেল তরুণ পুরুষ। খসে গেল সংযমের বাঁধন। ঠিক সেই সময়ে নির্ভুল লক্ষে দুষ্ট চন্দ্র তার কিরণপাত করল শ্বেতসুন্দরীর মোমের মতো সাদা নরম মুখে।
বিহ্বল কণ্ঠে পিটার বললে–জ্যাসোনা।
–পিটার, আমিও –তুমিও?
–যেদিন থেকে তোমাকে দেখছি, সেইদিন থেকে। এই কদিন যে সুখ পেয়েছি তোমার সঙ্গে থেকে, তা হারাতে চাই না।
–জ্যাসোনা।
–আমাকে হরণ কর, পিটার।
–হরণ!
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। আজ রাতেই চল পালাই।
–সে ভাবা যাবেখন।
–নাগো, না। আজ রাতেই পালাতে হবে। আর সুযোগ আসবে না।
–কেন? আজ রাতেই কেন? কী বলতে চাও তুমি?
দ্বিধায় জিভ জড়িয়ে গেল জ্যাসোনার।
বললে আস্তে আস্তে–ওয়েপস্ আজ আমাকে চেয়েছে।
–চেয়েছে? মানে, ওয়েপস্ তোমাকে ভালোবাসে?
–দুর! আমাকে..আমাকে ওর দরকার।
–ওঃ! মাটির দিকে চেয়ে রইল পিটার। কথাটার মানে বুঝতে যেটুকু সময় লাগল, তার মধ্যেই দূরে জঙ্গলের মধ্যে শোনা গেল ব্যাঞ্জোর ঝংকার।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জ্যাসোনা বললে–এসে গেছে ওয়েপস। যেতে আমাকে হবেই, পিটার। জংলিরা ওর হাতের মুঠোয় জিনের লোভে। গুলিবারুদও কেবল ওর কাছেই। উপায় নেই, পিটার, উপায় নেই। যেতে আমাকে হবেই।
লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল পিটার। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে উন্মত্ত আবেগে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে তিরের মতো জঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে গেল শ্বেতসুন্দরী।
দন্তনির্ঘোষ শোনা গেল পেছনে। দাঁত কিড়মিড় করছে পিটার।
.
পরের দিন সন্ধ্যার দিকে গির্জের ঘরে নতুন দৃশ্য দেখা গেল।
জংলিরা যোদ্ধার বেশে এসেছে। মুখে লাল আর হলদে কাদার প্রলেপ, চুলে মধু-পক্ষী আর বুনো ময়ূরের পালক, গলায় মানুষের দাঁতের মালা। বাঁশের চেয়ারে আসীন তরুণ পুরুতের দিকে তাকিয়ে মশগুল নিজেদের মধ্যে।
উসখুস করে উঠল জো। কোমরের খাপে গোঁজা ছোরার বাঁটে হাত চলে গেল বারবার।
বাইরে তখন সবুজ গোধূলি।
অবাক হয়ে চেয়েছিল পিটার। নিরস্ত্র সে। কিন্তু নির্ভিক।
জোকে বলল–কী চায় এরা?
জো জিগ্যেস করলে জংলি ভাষায়। ওয়েপসের দৌলতে কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ জানে। জংলিরা। একজন লাফিয়ে উঠে বুক বাজিয়ে দাঁতের মালা কঁকিয়ে উগ্র নাচ নেচে যা বললে জগাখিচুড়ি ভাষায়, জো তার সাদা মানে করে দিলে পিটারকে।
গির্জার দফারফা করে দেওয়া হবে। সোনালি মানুষ বলেছে, শয়তানের জল বন্ধ হয়ে যাবে পিটার এ গাঁয়ে থাকলে। কাজেই খানাপিনা নাচগান হবে শিগগিরই। চাই শয়তানের জল। মিঃ গড যেন কেটে পড়েন তার আগেই।
