–সাবাস! দারুণ হাত তো আপনার।
–যাচ্ছলে! মরে গেছে দেখছি।
জো একাই দাঁড় টানতে লাগল দুই হাতে। মৃত দাঁড়িকে ফেলে দেওয়া হল জলে ভার কমানোর জন্যে। ধর্মের বই খুলে আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা শেষ করে পাদ্রী বললে গ্রামে গিয়ে কি এইরকম অভ্যর্থনাই পেতে হবে, জো?
–গাঁয়ের লোক খারাপ। তার চাইতেও খারাপ সাদা মানুষ।
–কেন?
–শয়তানের জল খাওয়ায়। সোনালি পাখির চামড়া নিয়ে যায়।
চুপ করে রইল পাদ্রী। জিন মদের চালান দিয়ে বার্ড অফ প্যারাডাইজের চামড়া কিনে নিয়ে যায় একজন শ্বেতাঙ্গ। এই জঙ্গলে। ডাচ নর্থ নিউগিনির প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে মৃত্যু ওৎ পেতে আছে। কিন্তু সেখানেও পাপের ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে একজন। কে সে?
সূর্য ডুবে গেল। নোগোনে গ্রামের ছায়ায় এসে ক্যানো ভিড়ল।
এক হাতে বাইবেল, আর এক হাতে রাইফেল নিয়ে তিরে নামল পিটার থারপ্তরুণ পাদ্রী। গোধূলির ম্লান আলোয় দেখল, সারি-সারি কুঁড়েঘর দানবিক মাকড়সার মতো খাড়া লিকপিকে সরু সরু ঠ্যাঙের ওপর।
হাঁক দিল জো। গাঁয়ের লোক এল সেই হাঁক শুনে। উলঙ্গ জংলি। পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল গাঁয়ের নতুন পাদ্রীকে।
বিরাট অগ্নিকুণ্ডের সামনে এসে দাঁড়াল পিটার। আগুনের পাশে আটটা খুঁটির ডগায় লাগানো আটটা বিকট নরমুণ্ড। কয়েক শ জংলি দাঁড়িয়ে খুঁটিগুলোর ওপাশে।
পিটারের কুঁড়ে এই আগুনের পাশেই।
জোকে ডাকল পিটার ক্যাম্প-খাট পাত। বলে দরজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে যেন দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছে, এমন সময় উলঙ্গ বর্বরদের ঠেলে সামনে এগিয়ে এল একটা জীবন্ত বিস্ময়।
থ হয়ে গেল পিটার।
–জো! আগে বলিসনি কেন? দাড়িটা পর্যন্ত যে কামাইনি এখনও।
আগুনের ধারে দাঁড়িয়ে এক শ্বেতসুন্দরী।
জো নিজেও চমকে উঠেছে–জানলে তো বলব। এ আবার কে?
–গুড ইভনিং! গুড ইভনিং! আপনি কি স্বর্গ থেকে নেমে এলেন?
দরজার সামনেই এসে দাঁড়াল শ্বেতসুন্দরী। সস্তা পোশাক কুঁড়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া উদ্ধত যৌবনের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল, পিটার, তরুণ পাদ্রী। হাতির দাঁত আর গোলাপ মিলিয়ে ঈশ্বর যেন সৃষ্টি করেছেন অপরূপা এই মেয়েকে। কিন্তু এই জঙ্গলে এ হেন রূপসি কেন?
ঠোঁট কেঁপে উঠল শ্বেতসুন্দরীর–আপনি তো পাদ্রী?
–একশ বার। কিন্তু কী মিষ্টি গলা আপনার।
হাসল শ্বেতসুন্দরী–পাদ্রীর মত কথা বলছেন না কিন্তু।
–পাদ্রী হলেও আমি তো মানুষ। পিটার থারথ আমার নাম। আপনার?
জ্যাসোনা ল্যামারে। নোগানোতে থাকি। এই গ্রামেই আমার বাড়ি। আপনাকে ভালো লাগল। তাই বলছি, এখুনি সরে পড়ুন।
–এ আবার কী কথা। ভালো লাগল, অথচ বিদেয় হতে বলছেন?
–আপনার ভালোর জন্যেই বলছি। যান–এখুনি।
–আপনি এখানে কেন? গির্জের কেউ কি?
–আমার বাবা ডাক্তার ছিলেন। এখানেই মারা যান। আমরা ফরাসি। আমার মা নোগোনের রাজকুমারী।
–মানে?
–মানে আবার কী? মাকে বাবা বিয়ে করেছিলেন বাইবেলের মন্ত্র পড়ে।
–ভালোই হল। আপনার সাহায্যও পাওয়া যাবে গির্জের কাজে।
সাহায্য! আরে মশাই, সরে পড়ুন–এখনি, এই রাতেই।
–কেন?
–এখুনি আসছে সে।
–জিন মদের কারবার করে যে?
–হ্যাঁ।
–বদলোক বুঝি?
–কোরাল সাপ দেখেছেন? ঠিক সেই রকম। সুন্দর, কিন্তু মারাত্মক। আপনি থাকলে তার কাজের অসুবিধে হবে। খুন করে ফেলবে। যান–এখুনি যান।
–জ্যাসোনা, এমন একটা সুন্দর রাত নষ্ট করতে রাজি নই। আসুন, গল্প-সল্প করা যাক।
–প্রাণে বড় শখ হয়েছে দেখছি।
অন্ধকারের মধ্যে থেকে ভেসে এল একটা কণ্ঠস্বর। দরজা পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল ছফুট লম্বা এক শ্বেতকায়। চওড়া কাঁধ। গলায় ঝুলছে একটা আগাটা রুবি পাথর। দুই চোখে যেন চুম্বকের আকর্ষণ। সুপুরুষ। কিন্তু ভয়াল।
–পাদ্রী যে, খবর ভালো?
–গুড ইভনিং।
–কী নাম আপনার?
–থারথ। আপনার?
–আর্চিবল্ড ওয়েপস্।
কিছুক্ষণ আর কথা নেই। তারপর যেন আঁতকে উঠল তরুণ পাদ্রী।
আর্চিবল্ড অক্সফোর্ড ওয়েপস্?
–কিছু বাজে লোক ওই নামেই ডাকে আমাকে।
–ওয়েপস্! খুনি ওয়েপস্?
–ঠিকই ধরেছেন।
–ওয়েপসক্রীতদাসকারবারি ওয়েপস্?
–নিঃসন্দেহে।
–জংলি বউ নিয়ে যে ঘর করে, সেই ওয়েপস?
–মোট চারটে বউ আমার। চারটেই জংলি মেয়ে। কিন্তু খাসা।
–আপনার কথাবার্তা–
–বরদাস্ত করা যায় না, কেমন? বেশ তো, যাওয়ার আগে আসুন, একসঙ্গে খেয়ে যান।
–আমি থাকতে এসেছি, যেতে নয়।
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল দানবপুরুষ। প্যান্টের পকেট থেকে লাল বেরি বার করে মুখে পুরে বললে–জিন আর ধর্ম পাশাপাশি থাকতে পারে না। অশান্তি করবেন না। পথ দেখুন।
–যদি না যাই?
–তাহলে জোর করে যাওয়াব। বেরি খাবেন? খাসা খেতে।
–ধন্যবাদ। জোর করলেও যদি না যাই?
–অদৃশ্য করে দেব।
–ম্যানোকড়ির ওপরতলা কিন্তু ছেড়ে দেবে না।
–সে ভাবনা আমার। আপনি পথ দেখুন।
সিগারেট বার করে ধরাল পাদ্রী।
বললে—জ্যাসোনা—ইয়ে–মিস ল্যামারে। যা বলছিলাম আপনাকে–কথাটা মাঝপথে আটকে গেল খট করে একটা শব্দ হওয়ায়। পাদ্রীর বাঁ-হাতের তর্জনী আর অনামিকার মধ্যে দিয়ে একটা ছোরা বিঁধে রয়েছে প্যাকিং কেসে।
ঠান্ডা গলায় বললে ওয়েপস–ফের যদি মিস ল্যামারের নাম মুখে শুনি, ওই ছোরা বুকে বিধবে। পায়ের তলায় ঘাস গজাতে দেয় না আর্চিবল্ড ওয়েপস্। সরে পড়ুন। নইলে নোগোনে ক্রীকয়ের কুমিরদের পেট ভরাব আপনার মাংস দিয়ে। চলবে একটা বেরি? না? গুড নাইট!
