মৃগাঙ্ক, গল্প লিখতে বসে তুমি অনুপুঙ্খ বর্ণনা দাও সারস্বত উদ্দেশ্যে। আমি দেব কেবল প্রতিবেদন। সি-আই-টি বিল্ডিংয়ের শেষপ্রান্তে যেখানে খাল বুজিয়ে ওপর দিয়ে সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেই জায়গাটা ছাড়িয়ে ধাপা লক পাম্পিং স্টেশনের পাশ দিয়ে দক্ষিণে একটু গেছিলে মনে আছে? দুর্গন্ধে প্রাণ আইঢাই করে উঠেছিল, নাকে রুমাল চাপা দিয়েছিলে? এখান থেকেই সড়কটা সোজা গিয়ে একটু বাঁয়ে বেঁকে চলে গেছে ধাপা-বানতলার আবর্জনা স্থূপের দিকে। সি-এম-ডি-এর স্বপ্ন একদিন এই রাস্তা আড়াইশো ফুট চওড়া হবে, মাঝখানে সবুজ মধ্যপটি থাকবে, ছটি ছরকমের পথ থাকবে এই আড়াইশো ফুটের ওপর, সুভাষ সরোবরের ধারে কাদাপাড়া টিলার মতো টিলা উদ্যানও গড়ে উঠবে, পুরো সড়কটাই আলো ঝলমলে থাকবে।
আপাতত, এ রাস্তায় হাঁটলে অথবা গাড়ি চালালে পদে পদে গরু মোষের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, পায়ের তলায় সাপ কিলবিল করে উঠে নেমে যায় দু-পাশের ভেড়ির জলে, রাত্রে গাড়ি চালাতে গিয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করে অন্ধকারে। হেঁটে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। উঁহু-হুঁহু দীর্ঘশ্বাস। সুখ দুঃখ, জরা-যৌবন, হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু, ধনী-দরিদ্র সমস্তই ওই নিশ্বাস ধুলোর স্রোতের মতো উড়ে যায় সুদীর্ঘ নিস্তব্ধ এই সড়কের ওপর দিয়ে।
কলকাতা পুলিশের সজাগ দৃষ্টি থাকে এই দিকে। এই সেদিন পর্যন্ত পুলিশ-চৌকি ছিল বিল্ডিংয়ের মোড়ে। তখন পার্টিতে পার্টিতে বোমাবাজি হত, দিবালোকে মানুষ খুন হত–পুলিশ প্রহরীর তর্জনি শাসনে তা কমে আসে। পুলিশ চৌকিও উঠে যায়। কিন্তু রাতের আঁধারে কালো জিপ টহল দিয়ে যায় জোরালো হেডলাইট জ্বালিয়ে। কেননা, পুরোনো বিল্ডিংয়ের এককোণে গড়ে ওঠা নতুন বিল্ডিংয়ে গভীর রাতে নাকি ট্যাক্সি ঢোকে কলকাতার দিক থেকে কিছুক্ষণ পরে সড়ক বেয়ে চলে যায় সল্ট লেক বা গড়িয়ার দিকে। পুরো সড়কটাই এখন বেআইনি কারবারের সড়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নোংরা জলের খালের পাশে কালো জিপটার হেডলাইটে হঠাৎ দেখা গেছিল দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকা একটা দেহ। কালো পিচের রাস্তা থেকে একটু দুরে–ঘাস জমির ওপর। ঘাড়টা অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে রয়েছে পেছনে।
দাঁড়িয়েছিল কালো জিপ। রাতের প্রহরীরা নেমে গিয়ে পেয়েছিল বলবন্ত সিংকে। পকেট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করতেই পাওয়া গিয়েছিল তার পরিচয়। ট্যাক্সিটা কিন্তু দেখা যায়নি। ঘাস-জমির ওপর চাকার দাগ ছিল।
হেডলাইট আর অনেকগুলো টর্চবাতির আলোয় দেখা গেছিল চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে বলবন্ত সিংয়ের। লড়েছে প্রাণপণে–টেরিন শার্ট ছিঁড়ে ঝুলছে দুপাশে। রঙিন সুতির মাফলারটা মুখ আর নাকের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে টেনে তিনটে গিঁট দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে পেছনে। গলার ওপর আঙুলের ছাপ। নিষ্ঠুরভাবে শ্বাসরোধ করা হয়েছে সব দিক দিয়েই।
বেলেঘাটা থানার বড়বাবুর সঙ্গে আমার হৃদয়ের সম্পর্ক আছে। কি জানি কেন ভদ্রলোক আমাকে ভালোবাসেন। কারণে অকারণে বাড়ি আসেন, পকেটভর্তি চুরুট বের করে আমাকে খেতে দেন, নস্যির ডিবেও বাড়িয়ে দেন। শীর্ণকায় এবং দীর্ঘকায় এই ভদ্রলোকই বলতে গেলে আমাকে চুরুট আর নস্যিতে রপ্ত করে ছেড়েছেন। অট্টহেসে বলেন, দিনে অন্তত একবার…চার্চিল… চার্চিল…ক্যালকাটার চার্চিল মশায়…চুরুট আর নস্যি দুটোতেই মজা পেতেন–দুটো দিয়েই ব্রেন সাফ রাখতেন।
এঁর নাম ধরণী ঘোষাল। কৃষ্ণকায় হাস্যমুখ সদাশয় আড্ডাবাজ পুরুষ। উনিই আমাকে দেখালেন বলবন্ত সিংয়ের লাশটা। শুনলাম, পকেটে গোটা পঞ্চাশ টাকা ছিল–দিনের শেষে ওই রকম রোজগারই হত রোজ। টাকা নেই। ট্যাক্সিও নেই। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রির মতো ট্যাক্সি ছিনতাই আরম্ভ হয়েছে দিল্লির পর কলকাতাতেও। কিন্তু ট্যাক্সি ড্রাইভারকে খুন করতে গেল কেন? ফেলে পালালেই তো হত।
অটোপ্সি রিপোর্ট দেখলাম। ডেথ বাই স্ট্রাংগুলেশন। শ্বাসতন্ত্র এক্কেবারেই জখম। নাক আর মুখের পেছনে সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা দলসদৃশ ফ্যারিংক্স বা ভয়েস বক্সের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে। কঠিন কার্টিলেজ দিয়ে গড়া ফ্যারিংক্স গাত্র সব সময়ে ভোলা থাকে–কিন্তু প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে।
বলবন্ত সিংয়ের অনামিকায় আংটি পরার কোনও দাগ দেখলাম না। কিন্তু ঘড়ি পরার দাগ আছে বাম মণিবন্ধে। ঘড়ি পাওয়া যায়নি।
ধরণীবাবু জানালেন, ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অ্যাসোসিয়েশন ওয়ান ডে স্ট্রাইক করতে চলেছে। হত্যাকারীকে ধরতে না পারলে আরো জল গড়াবে। অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবান ব্যক্তি–মেম্বার অফ পার্লামেন্ট। চাকরি নিয়ে না টানাটানি করে। কলকাতা নামক মনুষ্য অরণ্যে গাড়ি চাপা পড়ে আর অনাহারেই রোজ কতজন অক্কা পাচ্ছে–কেউ মাথা ঘামায় না। একটা ট্যাক্সি ড্রাইভার
হয় জীবনসংগ্রাম থেকে ছাড়ান পেল–তা নিয়ে এত হই-চই করার কি আছে?
শুনতে-শুনতে শ্রাবণীর মুখটা মনে পড়ে গেছিল। সত্যিই তো, চার-পাঁচদিন না খেয়ে হাসিমুখে আমার খিদমৎ খেটে গেছে বাচ্চা মেয়েটা–কেউ তো খবর রাখেনি।
নিন, নিন, খান, হাতে একটা চুরুট গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন ধরণী ঘোষাল, ব্রেনটাকে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে দেখুন না হোমিওসাইড স্কোয়াডকে হেলপ করতে পারেন কিনা। লাখ লাখ লোকের মধ্যে থেকে কিলার খুঁজে বার করতে গিয়ে শালা নিজেই না কিলড হয়ে যাই।
