হ্যাঁ। বললে রাজীবলোচন।
পীতাম্বর শেষমেশ আস্ফালনই করে গেছে, অগ্নিশর্মা মনিবের পেছন-পেছন আর যায়নি– গেলে খুনটা আটকানো যেত। গুহামানবদের অধম যারা–
তাদের বুদ্ধিও থাকে কম। পাদপূরণ করল অলিম্পিয়া। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে খুন করেছে সলিল মুখার্জি?
গোড়াতেই একটা বেস কথা বলে ফেলেছিল বলে। রাজীবলোচনবাবু এসে খবর দিলেন, জলে ডুবে মারা গেছেন স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিক। আমরা কিন্তু তখন জানি, উনি বাড়ি ফিরে আসছেন জলপথ যাত্রা স্থগিত রেখে। জলে ডুবে গেছেন–এই কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে যে মৃত্যু-দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হল সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু। সেই দৃশ্য মনের মধ্যে নিয়েই আমি জিগ্যেস করেছিলাম কখন? কিন্তু সলিল মুখার্জির মনের মধ্যে ভাসছিল অন্য মৃত্যু-দৃশ্য। উনি ফস করে জিগ্যেস করলেন, কোথায়? অবান্তর প্রশ্নটা শুনেই বোঁ করে মাথাটা ঘুরে গেল আমার। সমুদ্র থেকে ফেরার পথে যে মারা যায়–সে তো সমুদ্রেই ডুবেছে ধরে নিতে হবে। তা সত্ত্বেও উনি প্রশ্ন করলেন, মৃত্যুটা ঘটেছে কোথায়। তার মানে, উনি জানেন মৃত্যুর জায়গাটা–মানে, মৃতদেহটাকে যেখানে রেখে এসেছেন–সেই পুকুরটা–যার দূরত্ব সমুদ্র থেকে বেশি দূরে নয়। একটা জঘন্য খুনির পাশে বসে আছি জেনেই তৎক্ষণাৎ বমি-বমি পাচ্ছিল বলেই অমন ফ্যাকাশে মেরে গিয়েছিলাম। মৃতদেহটাকে সবুজ মানুষ বলে বসেছিলাম। সবুজ শ্যাওলায় সবুজ মৃতদেহটা সমুদ্রের সবুজ শ্যাওলায় সবুজ হয়ে গেলেই বরং ভালো ছিল–এই রকম একটা ইঙ্গিত করেছিলাম। সেই মুহূর্তে জেনে ফেলেছিলাম, স্যার প্রদ্যুম্নর ডেডবডি সবুজ পাঁকের মধ্যেই ঢুকিয়ে দিয়ে এসে ন্যাকা সাজছেন সলিল মুখার্জি। খুন করেছেন যে অস্ত্রটা দিয়ে, জ্ঞানপাপী বলে হাতও দিচ্ছেন না তাতে—
.
কোন অস্ত্রটা বলুন তো? সবিস্ময়ে জিগ্যেস করে রাজীবলোচন।
যাচ্চলে। তাও দেখেননি? টেবিলে পাশাপাশি ছিল কালি-মাখা ধুলো-মাখা কলম আর চকচকে পরিষ্কার কাগজ কাটা ছুরি–যা সরু ছোরার মতোই বুকের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে চেপে বসিয়ে দিলেই। সলিল মুখার্জি কলমবাজ মানুষ কথা বেচে আর কলম চালিয়ে রোজগার করেন–ছুরি চালনা নিশ্চয় তাকে মানায় না। কিন্তু কাজের ফাঁকে-ফাঁকে অন্যমনস্ক থাকলে, চকচকে কাগজকাটা ছুরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে না, এমন কাউকে দেখাতে পারেন? সলিল মুখার্জি কিন্তু সদ্য পরিষ্কার করা ছুরিটাতে আঙুল না ছুঁইয়ে ধুলো আর কালি-মাখা কলম দিয়েই নাড়াচাড়া করে যাচ্ছিলেন সমানে। ছুরি থেকে রক্তের দাগ ধুয়ে ফেললেও মন থেকে তো ধুতে পারেননি, কাজেই–
সলিল মুখার্জি সেই দিনই নিজের ব্রেন উড়িয়ে দিয়েছিল রিভলভারের গুলিতে রাজীবলোচন হাতকড়া হাজির করার আগেই।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরোনো দিনের মতোই সমুদ্রসৈকতে ছেলেখেলা করতে দেখা গিয়েছিল দুটি মূর্তিকে।
পীতাম্বর আর অলিম্পিয়া।
বিদেশি ছায়ায় * রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত।
সবুজফল ও শ্বেতসুন্দরী
নোগোনে ক্ৰীয়ের হলদে জলে বিদ্যুৎবেগে দাঁড় টানতে টানতে বললে জো–মিঃ গড, যমের মুখে যাচ্ছেন কিন্তু।
ক্যানোর মুখে দাঁড়িয়ে ধর্মের বই পড়ছিল সুদর্শন এক তরুণ। চোখ তুলে হেসে বললে– বলছি না, আমাকে মিঃ গড বলবি না?
উকো দিয়ে ঘষা দাঁত বার করে হাসল পাপুয়ান।
–কেন বলব না? আপনি তো ভগবানের দূত। মিঃ গড। কিন্তু বড় বোকা। শিগগিরই মরে ভূত হবেন।
–তা হলে এলি কেন আমার সঙ্গে?
–ভয় পাই না বলে।
বইটার পাতায় চিহ্ন দিয়ে মুড়ে রাখল তরুণ পাদ্রী। বললে হল্যানডিয়ার বর্বরদের মতই কি এরা বিপজ্জনক?
–তার চাইতেও খারাপ। এরা মানুষ খায়।
–বলিস কিরে?
–আজ্ঞে। আমার বাবা ওদের নজনকে খেয়েছিল লড়াই জেতার পর। সে কী পেট কামড়ানি। সাধুদের পেটে মানুষ সয় না।
–বাবার মত তুইও মানুষ খাস নাকি?
–দরকার কী? আমার কি খাবারের অভাব?
ঠিক এই সময়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত একজন দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে ঝলক রক্ত উঠে এসে ছলকে পড়ল পাদ্রীর সাদা গাউনে। মুখ থুবড়ে পড়ল সে ক্যানোর মধ্যে। পিঠে একটা তির। সবুজ টিয়ার পালকগুলো কেবল বেরিয়ে রয়েছে বাইরে।
জলের ধারে ম্যাড়মেড়ে লাল অর্কিডের মধ্যে কী যেন নড়ে উঠল।
হতভম্বের মতো সবুজ পালকের দিকে তাকিয়ে বললে তরুণ পাদ্রী–জো, এ তো দেখছি—
হ্যাঁচকা টানে পাদ্রীকে ক্যানোর মধ্যে শুইয়ে দিয়ে জো বললে–উপুড় হয়ে শুয়ে থাকুন। দেখলেন তো, জো মিথ্যে বলে না।
খেপে গেল পাদ্রী–জো, ওল্ড টেস্টামেন্ট যা বলেছে, এখন ঠিক তাই করব। রাইফেলটা দে।
–শুয়ে থাকুন।
কক্ষনো না। খুনেদের ঢিট করতে ওল্ড টেস্টামেন্টই দরকার। দে রাইফেল আমার। ঠিক আছে। দাঁড় করা ক্যানো।
অর্কিডের দিকে ৩০৩ উদ্যত হতেই সবেগে নিক্ষিপ্ত হল অর্কিডের একটা লতা–সে জায়গায় আবির্ভূত হল একটা মুখ।
বিকট মুখ। কপাল আর চিবুকে কমলা কাদা। থ্যাবড়া নাকের দুদিক দিয়ে বেরিয়ে একটা লম্বা রূপোলি হাড়। ক্রুর দু-চোখে জ্বলন্ত চাহনি। পরমুহূর্তেই মুখ ঢেকে উঠে এল একটা ধনুক।
সঙ্গে-সঙ্গে গর্জে উঠল পয়েন্ট তিন-শুন্য-তিন। শূন্য পথে ধেয়ে এল একটা তির। বিধল গাছের ডালে। পাকসাট খেয়ে জল থেকে লাফিয়ে উঠেই মুখ থুবড়ে পড়ল একটা উলঙ্গ পুরুষ।
