হ্যাঁ। মানে, পীতাম্বরের সঙ্গে তোমার আর বিশেষ তফাত নেই। রাজ-ঐশ্বর্য আর তোমার নেই। ফুকে উড়িয়ে দিয়েছে সলিসিটর সলিল মুখার্জি হাজাররকম বিজনেস অ্যাডভেঞ্চারে। পয়লা নম্বর জোচ্চোর, এক নম্বরের প্রতারক সলিল মুখার্জি। টাকার পাহাড় থেকে তোমাকে যে নামিয়ে আনা হয়েছে মাটির ওপর–এই তথ্যটাই কিন্তু এতগুলো রহস্যকে বুঝে ওঠার একমাত্র সূত্র। এই যে ভ্যাবা গঙ্গারামের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে পীতাম্বর, ওকে গিয়ে আমি শুধু সেই খবরটাই দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, রুপোর চামচ মুখে দিয়ে জন্মেও এখন তুমি প্রায় পথের ভিখিরি। শুনেই বাঁই-বাই করে দৌড়ে এসেছিল তোমার পাশে দাঁড়াতে, বুক দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে, প্রাণ দিয়ে তোমার প্রাণে আশার আলো জ্বালাতে। অসাধারণ মানুষ এই পীতাম্বর।
দূর মশায়! কী ফালতু বকছেন! রেগেমেগে বললে পীতাম্বর।
প্রশান্ত স্বরে বললে ফাদার ঘনশ্যাম, অথবা বলা যায় পীতাম্বর লোকটা প্রাগৈতিহাসিক দৈত্য–প্লেসিওসরাস অথবা ওই জাতীয় দানব। গুহামানবদের হৃদয়ও বোধ হয় এত নির্লিপ্ত, এত নির্দয় এবং এত উদাসীন ছিল না। টাকার পাহাড়ে অসীন স্ত্রীর সঙ্গে ঘর করতে সে চায়নি। বউয়ের টাকায় দুবেলা খেয়ে-পরে থাকতে চায়নি। দু-বেলা বউয়ের মুখনাড়া খেয়ে শ্বশুরের ভিটেয় বসে ঘরজামাই হয়ে থাকতে চায়নি। গুহামানবেরও অধম। জঘন্য। বিচিত্র। তাই একেবারেই নির্লিপ্ত, উদাসীন হয়ে গেছিল তোমার ব্যাপারে। তাই অমন কিম্ভুতকিমাকার হয়ে থেকেছিল এতগুলো বছর। তাই তোমার ছায়া দেখলেও দূর থেকে সটকান দিত, পাছে টাকার ছায়ায় গায়ে ফোস্কা পড়ে যায়। কিন্তু যেই আমার মুখে শুনল পথে বসেছ তুমি, তোমার গা থেকে সরে গেছে টাকার ছায়া–অমনি প্রাণবন্ত হল চক্ষের নিমেষে–এতদিন ছিল জ্যান্ত মড়া–হঠাৎ হল জ্যান্ত প্রেমিক–পাই-পাই করে দৌড়ে এল গতর খাঁটিয়ে ভাবীবউকে সাহায্য করার আশ্বাসবাণী শোনাতে–সে যে চায় বউ খাবে তারই টাকায় বউয়ের টাকায় সে খাবে না কোনওদিনই। এমন অদ্ভুত লোককে প্রাগৈতিহাসিক জীব ছাড়া আর কিছু বলা চলে কি? গুহামানবরাও এমন আহাম্মক ছিল কি? জঘন্য! অতি জঘন্য লোক এই পীতাম্বর।
ফুক…ফুক…ফুক! তাল-তাল ধোঁয়া উড়ে গেল ফাদারের পাইপের গর্ত থেকে। নির্নিমেষে তার নির্বোধ আকৃতির দিকে চেয়ে রয়েছে তিন-তিনটে মূর্তি। নাক সিঁটকে রয়েছে কেবল পীতাম্বর। প্রাগৈতিহাসিক জীব অথবা গুহামানবের চাইতেও অধম বিশেষণ দুটো বোধহয় মনঃপূত হয়নি।
ফিসফিস করে বললে অলিম্পিয়া, ফাদার, পীতাম্বরের চাইতেও জঘন্য তোক আপনি।
কেন? কেন? কেন? যেন বিষম আহত হয়ে পাইপ নামিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে চেয়ে রইল ঘনশ্যাম পাদরি।
বিপুল ব্যানার্জি পালিয়ে গেল কেন, তা তো বললেন না।
পালিয়ে গেল তুমি পথে বসেছ শোনামাত্র। মুখ থেকে কথাটা খসতে-না-খসতেই বেশ কিছুক্ষণ ডাঙায় ওঠা মাছের মতো খাবি খেয়েছিল অবশ্য। বড্ড বেশি স্বপ্ন দেখে ফেলেছিল কিনা– রাজা হবে রাজকন্যেকে বিয়ে করে, টাকার আণ্ডিল নিয়ে পৃথিবীটাকে চক্কর দিয়ে বেড়াবে কত কী প্ল্যানই ঘুরঘুর করছিল মাথার মধ্যে। আকাশ থেকে মাটিতে পড়ায় ঘিলুঢিলু দারুণ আঁকুনি খাওয়ায় কিছুক্ষণ কিং…কিং–কী যেন কথাটা?
কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বললে অলিম্পিয়া।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপরেই চটপটে ব্রেন চালিয়ে চকিতে কর্তব্য স্থির করে নিলে। এমতাবস্থায় কপর্দকহীন ভাবী বউকে ফেলেই চম্পট দেওয়া বিধেয়। যার টাকা নেই, সেরকম মেয়েকে বিয়ে করার মতো গোমূর্খ অন্তত নয় বিপুল ব্যানার্জি। ভয়ানক স্পিডে তাই ছুটে গেল বাড়ির মধ্যে–তারপর–
ভয়ানক স্পিডে পাঁচিল টপকে পালাল এমন জায়গায়, আমার নামও যেখানে পৌঁছবে না। ভারি মিষ্টি গলায় বললে এবার অলিম্পিয়া, কিন্তু বাবাকে খবরটা কে দিয়েছিল শুনি? আপনি?
পাগল নাকি! কিন্তু এসব কথা হাওয়ার আগে ছোটে। কপর্দকহীন হয়েছেন, এ খবরটা পেয়েই ফিরে এসেছিলেন স্যার প্রদ্যুম্ন। ভারি রাগী মানুষ তো। রাগে ফুঁসতে-ফুঁসতে যাত্রার পোশাক পরেই চলেছিলেন সলিল মুখার্জির দফারফা করবেন বলে–পোশাক পালটানোর মতো মেজাজও ছিল না। হাবভাব দেখেই পীতাম্বর আঁচ করেছিল, নিশ্চয় বিরাট একটা গন্ডগোল হয়েছে। রাশভারী মনিবকে জিগ্যেস করার সাহসও নেই–অথচ গন্ডগোলটা জান দিয়েও মিটিয়ে ফেলার জন্যে আকুলিবিকুলি করছে বুকের ভেতরটা। কী করা উচিত ভেবে না পেয়ে দোনামোনা মনে ছুটছিল স্যার প্রদ্যুম্নর পেছন-পেছন। দেখে খটকা লেগেছিল বিপুল ব্যানার্জির। দ্বিধাটা কেন, তা আঁচ করতে পারেনি। মনে-মনে হিরো হওয়ার বাসনা থাকে সব মানুষেরই পীতাম্বরও হিরো হতে চেয়েছিল। সমুদ্রের ধারে ভেবেছিল একলাই রয়েছে –কেউ দেখতে পাবে না। তলোয়ার বার করে বাচ্চাছেলের মতো আস্ফালন জুড়েছিল তোমার বাবার পেছনে দূর থেকে দেখে বিপুল ব্যানার্জি ভেবেছে, মনিবকেই কচুকাটা করতে চলেছে পীতাম্বর পাগলা–
খবরদার! পাগলা বলবেন না! খ্যাক করে ওঠে পীতাম্বর।
মুচকি হাসে অলিম্পিয়া, চোপরাও! গুহামানবেরও অধম কোথাকার!–ফাদার, তারপর কী হল?
তোমার বাবা থানায় খবর পাঠিয়েছিলেন আগেই। তাই হনহন করে সবুজ মানুষ চায়ের দোকানের দিকে আসছিলেন ইনসপেক্টর রাজীবলোচন–তাই তো?
