কিন্তু যার উদ্দেশে এ কথা বলা, সেই ফাদার ঘনশ্যাম ততক্ষণে বাঁই-বাই করে দৌড়ে পৌঁছে গেছে গাড়িবারান্দায় হাত-মুখ নেড়ে কথা আরম্ভ করে দিয়েছে বিপুল ব্যানার্জির সঙ্গে। জায়গাটা অন্ধকার বলেই দেখা গেল না নাটকের বাকি অংশটুকু। মিনিট বারো পরে একলাই বেরিয়ে এল ফাদার ঘনশ্যাম।
এবং আর-এক দফা তাজ্জব করে দিল প্রত্যেককেই।
কারণ, বাড়ির মধ্যে ঢোকবার কোনও সদিচ্ছাই দেখাল না ফাদার। ঝুপ করে বসে পড়ল নড়বড়ে বেঞ্চিতে, পকেট থেকে বার করল পাইপ আর তামাক, দেশলাই জ্বেলে অগ্নিসংযোগ করে ফুকফুক করে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল তন্ময় চোখে গাছের পাতার দিকে চেয়ে–দুকান ভরে যেন শুনছে পাখিদের কাকলি। জগতে এর চাইতে মধুর, এর চাইতে প্রিয় যেন আর কিছুই নেই।
বিমূঢ় দলটা অগত্যা ফাদারকে ওই অবস্থায় রেখেই প্রবেশ করল বাড়ির মধ্যে।
.
কিছুক্ষণ পর।
দড়াম করে খুলে গেল সদরদরজা। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসতে দেখা গেল তিনটি মূর্তিকে। সবার আগে অলিম্পিয়া আর পীতাম্বর। ভারী দেহ নিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়েছে রাজীবলোচন।
ফাদার কিন্তু তখন ধূম্রজালে আচ্ছন্ন। দুই চোখে স্বপ্নিল চাহনি।
মত্তহস্তীর মতোই বাগান কাঁপয়ে অবশেষে সামনে এসে দাঁড়াল রাজীবলোচন। ক্রোধে আরক্ত মুখ।
রেগেছে অলিম্পিয়াও, ফাদার! ব্যাপার কী বলুন তো? বিপুল ব্যানার্জি কোথায়?
বোমার মতো ফেটে পড়ল পীতাম্বর, পালিয়েছে! সুটকেশ গুছিয়ে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পাঁচিল টপকে পালিয়েছে! ফাদার, কী বলেছিলেন ওকে?
কী আবার বলবেন? বললে অলিম্পিয়া, শয়তানিটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন–মিথ্যের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন।
হুঙ্কার ছাড়ল রাজীবলোচন, একী করলেন ফাদার? এভাবে কেন ল্যাং মারলেন আমাকে?
কী করলাম তাই তো বুঝতে পারছি না। নিরীহ স্বরে বললে ঘনশ্যাম পাদরি।
পারছেন না? আর কত ন্যাকা সেজে থাকবেন? খুনিকে পালিয়ে যেতে দিয়েছেন আপনি…হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি! নিরেট গাধা আমি–তাই খুনিকে হুঁশিয়ার করার সুযোগটা আমিই দিয়েছি আপনাকে, সারা বাগান থরথর করে কাঁপতে লাগল রাজীবলোচনের বজ্ৰনাদে, হেল্প করেছেন–মার্ডারারকে হেল্প করেছেন পালিয়ে যেতে–সেইসঙ্গে বসিয়ে গেছেন আমাকে! আর কি ওকে ধরা যাবে? এতক্ষণে রাস্কেলটা–
বেশ কয়েক মাইল দূরে–আপনার নাগালের বাইরে। রুষ্ঠ কণ্ঠে বললে পীতাম্বর।
হৃষ্টকণ্ঠে বললে ফাদার ঘনশ্যাম, খামোকা চেঁচাচ্ছেন। অতীতে অনেক খুনিকে আমি সাহায্য করেছি ঠিকই কিন্তু খুন করতে সাহায্য করিনি কোনও খুনিকেই।
যাই বলুন আর তাই বলুন, গোড়া থেকেই আপনি জানতেন খুনি বিপুল ব্যানার্জি। অলিম্পিয়াকে এ মূর্তিতে কখনও দেখা যায়নি। রাগে মুখ থমথম করছে। আতীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত যেন শিউরে উঠছে, ডেডবডি কোথায় পাওয়া গেছে, এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই তাই আপনি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। ডাক্তার ঠিকই বলেছেন। পুকুরপাড়ে অত রাত পর্যন্ত ঘুরঘুর করছিল ওই কারণেই।
খটকা আমারও লেগেছিল। তখনি যদি রাস্কেলটাকে পাকড়াও করতাম– রাজীবলোচন
প্রায় নৃত্য করতে থাকে প্রচণ্ড আফশোসে।
রাস্কেল বলে রাস্কেল! রণচণ্ডিনী মূর্তি অলিম্পিয়ার, এখন তো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল বাবাকে খুন করেছে–
সলিসিটর সলিল মুখার্জি। ভারি শান্ত গলায় বললে ফাদার ঘনশ্যাম।
কে? যেন হেঁচকি তুলল রাজীবলোচন। থ হয়ে গেল অলিম্পিয়া। চক্ষু ছানাবড়া করে চেয়ে রইল পীতাম্বর। অকস্মাৎ যেন শ্মশান নৈঃশব্দ্য নেমে এল ঠিক ওইটুকু জায়গায় আশপাশে অব্যাহত রইল বিহঙ্গ কুজন।
সলিসিটর সলিল মুখার্জি! থেমে-থেমে আবার বললে ফাদার ঘনশ্যাম। এমন সুস্পষ্ট উচ্চারণে বললে যেন বাচ্চাদের ক্লাশ নিচ্ছেনতুন শব্দ শেখাচ্ছে–বোঝার সুবিধের জন্যে ধীরে সুস্থে পরিষ্কার উচ্চারণ করতে হচ্ছে। ওই যে ভদ্রলোক, চুল যার কঁচাপাকা, উইল বগলে এসেছেন পড়ে শোনানোর জন্যে।
বলে, পাইপের ছাই ফেলে দিয়ে ফের তামাক ঠাসতে লাগল ফাদার ঘনশ্যাম নিশ্চিন্ত মনে, তিন-তিনটে মূর্তি অবিকল কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল সামনে। তিনজনেরই চোখ গোল গোল, বিষম বিস্ময়ে তিনজনেরই চোয়াল ঝুলে পড়েছে, কথা গেছে আটকে।
বেশ বারকয়েক ঢোক গিলে অবশেষে স্বরযন্ত্রকে সরব করল রাজীবলোচন, কিন্তু কেন?
ঠিক কথা। কেন? কেন সলিল মুখার্জি খুন করতে গেল স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিককে। পাইপে তামাক ঠাসা হয়ে গেছিল ফাদার ঘনশ্যামের। এখন তা ধরিয়ে নিয়ে ফুকফুক করে বার কয়েক টেনে নিয়ে বললে, কারণটা বলার সময় এখন হয়েছে। খুবই অন্যায়, বিরাট অপরাধ করেছেন সলিল মুখার্জিজঘন্য এই ব্যাপারটার মূলে রয়েছে জঘন্যতম সেই অপরাধ এবং একটু থেমে, বারকয়েক পাইপ টেনে, স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিককে খুন করার চাইতেও কদর্য সেই অপরাধের কোনও ক্ষমা নেই।
মুখ থেকে পাইপ নামাল পাদরি। সটান চাইল অলিম্পিয়ার মুখের দিকে। মুখভাব সিরিয়াস– কণ্ঠস্বরও তাই।
অলিম্পিয়া, কথাটা এখনই শোনা দরকার তোমার। আমি জানি, ধাক্কা তুমি সইতে পারবে। সে মনের জোর তোমার আছে বলেই বলছিনইলে বলতাম না। তুমি প্রায় পথে বসেছ বললেই চলে।
পথে? ছুঁচের ডগার মতো সুর হল অলিম্পিয়ার নয়নতারকা।
