দলিল-দস্তাবেজের ফাইল বগলে দাঁড়িয়ে আছেন সলিসিটর সলিল মুখার্জি। পাশেই দাঁড়িয়ে ইনসপেক্টর রাজীবলোচন। আইনের হাতিয়ার চালিয়ে হত্যাকারীকে কুপোকাত করার জন্যেই উইলের বয়ান শুনতে বড়ই ব্যগ্র সে। পীতাম্বর মহাপ্রভু কিন্তু নির্লজ্জভাবে ব্যস্ত অলিম্পিয়াকে নিয়ে। ভ্রূক্ষেপ নেই কোনওদিকেই। দীর্ঘদেহী ডাক্তারকে দেখে বিস্মিত অনেকেই, তার চাইতেও বেশি অবাক হচ্ছে কুমড়োর মতো বপু যার–সেই ঘনশ্যাম পাদরিকে দেখে। ধর্ম নিয়ে যার কারবার, অধর্মের ব্যাপারে তার আগ্রহটা যেন কেমনতর।
ছোট্ট দলটাকে দেখেই বাড়ির দিক থেকে উল্কার মতো বেগে ধেয়ে এল বিপুল ব্যানার্জি। মানুষ-উল্কাই বটে। খাতির করে সবাইকেই নিয়ে গেল মল্লিকভবনের সামনের সবুজ ঘাসজমিতে। পরমুহূর্তেই পুনরায় উল্কাবেগে অন্তর্হিত হল বাড়ির মধ্যে–অভ্যর্থনার আয়োজন করতে। যাওয়ার সময়ে বলে গেল দ্রুত কণ্ঠে, আসছি এখুনি।
লোকটার সচল ইঞ্জিনের মতো এনার্জি দেখে তাজ্জব হয়েছে প্রত্যেকেই। সেক্রেটারি বটে একখানা। প্রাণশক্তিতে ভরপুর। কোনও কাজে ত্রুটি নেই।
প্রথম মন্তব্যটা শোনা গেল পীতাম্বরের কণ্ঠে, ক্রিকেটের রান তুলছে মনে হচ্ছে!
দ্বিতীয় মন্তব্যটা করলেন সলিল মুখার্জি, ছোকরা খাপ্পা হয়েছে আইনের মন্থরগতি দেখে। আইন কেন ওর মতো স্পিডে ছুটছে না–অতএব ছুটে মরছে নিজেই। মিস মল্লিক অবশ্য বোঝেন, এহেন পরিস্থিতিতে আইনবিদরা কখনওই ক্রিকেট রানারের মতো পাই-পাঁই করে দৌড়োতে পারে না। এসব ব্যাপারে আইনগত অসুবিধে আছে–তার জন্যে সময় যা লাগবার, তা লাগবেই। আমার ঢিমেতালে কাজ করায় মিস মল্লিক অন্তত অখুশি নন।
তৃতীয় মন্তব্যটা আচমকা নিক্ষেপ করলেন ডাক্তার, বিপুল ব্যানার্জির ছুটোছুটি এখন কিন্তু আমার ভালোই লাগছে। যা করতেই হবে, তা ঝটপট সেরে ফেলাই ভালো।
ভুরু কুঁচকে বললে পীতাম্বর, কথাটার অর্থ? বিপুল ব্যানার্জির তাড়াহুড়োটা এখন আপনার ভালো লাগছে কেন?
বিপুল ব্যানার্জির বৈশিষ্ট্য তো ওইখানেই। হেঁয়ালির সুরে বললেন ডাক্তার, কখনও তাড়াহুড়ো করে মরে, কখনও ঢিমেতালে চলে।
এটা আবার কীরকম কথা হল?
তাড়াহুড়ো করলে যখন আরও মানাতো, তখন কিন্তু ঢিমেতালেই চলেছিল সেক্রেটারি সাহেব।
কখন বলুন তো?
পুকুরপাড়ে আধখানা রাত ঘুরঘুর না করে কাটালেই পারত। সবুজ-মানুষকে পুকুর থেকে তোলার ব্যবস্থাটা তাড়াহুড়ো করে সারলেই পারত। ইনসপেক্টরের সঙ্গে হঠাৎ দেখা না হয়ে গেলে বাকি রাতটাও বোধ হয় কেটে যেত পুকুরের পাড়েই। তাই বলছিলাম, বিপুল ব্যানার্জি কখনও কাজ করে স্লো স্পিডে, কখনও হাই স্পিডে। ইন্টারেস্টিং।
পীতাম্বর বললে, তাহলে কী বলতে চান, বিপুল ব্যানার্জি যা বলেছে, তার মধ্যে মিথ্যের ভেজাল আছে?
ব্যস, আর কথাটি নেই ডাক্তারের মুখে। গুঢ় কৌতুকের হাসি হাসল কেবল সলিসিটর সলিল মুখার্জি। বলল তরল স্বরে, ছোকরার বিরুদ্ধে কিন্তু আমি কিছু বলব না। তবে
অধীর হল পীতাম্বর, তবে আবার কী?
আমার কাজ আমি ভালো বুঝি, সে ব্যাপারে আমাকে জ্ঞানদান করার চেষ্টাটা না করলেই ভালো করত।
তাই নাকি? আইন শেখাতে গেছিল আপনাকে?
খুব প্রশংসনীয় ভাবেই শেখাতে গেছিল এবং তিলমাত্র দেরি না করে। মানে বুঝেছেন? উইলটা পড়ে শোনানো হোক ঝটপট–দেরি করছি কেন?
এতক্ষণে মুখ খুলল ইনসপেক্টর রাজীবলোচন, সে চেষ্টা আমার ওপরেও হয়েছে। আমার চরকায় কীভাবে তেল দিতে হয়, সেটা আমার চাইতে বিপুল ব্যানার্জির বেশি জানা উচিত নয়। মরুকগে, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ডাক্তার সাহেব কি সন্দেহ করেন বিপুল ব্যানার্জিকে? সেক্ষেত্রে কিন্তু ছোকরাকে এখুনি জেরা করা দরকার।
ওই তো আসছে বিপুল ব্যানার্জি। বললে পীতাম্বর।
দোরগোড়ায় আবার বায়ুবেগে আবির্ভূত হতে দেখা গেল সেক্রেটারিকে।
ঠিক এই সময়ে প্রত্যেককেই অবাক করে ছাড়ল ফাদার ঘনশ্যাম। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল সবার পেছনে। নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেনি একেবারেই। আচমকা হনহনিয়ে এল সবার সামনে। বোঁ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাত শূন্যে তুলে দাঁড়িয়ে গেল এমন ভাবে, যেন আগুয়ান সৈন্যবাহিনীকে আর এক ইঞ্চিও না এগোনোর নির্দেশ দিচ্ছে সেনাপতি।
কুমড়োপটাশ মন্থরগতি ফাদার ঘনশ্যামের পক্ষে এবম্বিধ আচরণ অতীব বিস্ময়কর। বিশেষ করে যারা তাকে চেনে এবং জানে, তাদের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম হল স্থূলকায় পাদরির নাটকীয় কাণ্ড দেখে।
দাঁড়ান! আর এগোবেন না!
রীতিমত ধমক দিচ্ছে যে পাদরি! ব্যাপারটা কী?
ফাদার–পীতাম্বর মুখ খুলেছিল বটে–কিন্তু দাবড়ানি দিয়ে থামিয়ে দেয় ঘনশ্যাম পাদরি :
আগে আমাকে যেতে দিন। বিপুল ব্যানার্জির সঙ্গে আমাকে আগে কথা বলতে দিন। আমি যা জানি, আমার মুখেই আগে ওকে শুনতে দিন। প্লিজ, আপনারা কেউ যা জানেন না এখনও পর্যন্ত, আমি তা জানি। আপনাদের বলার আগে ওকে তা বলা দরকার। কেন জানেন? একটা মস্ত ভুল বোঝাবুঝির হাত থেকে বেঁচে যাবে অন্তত একজন।
কী বলতে চান বলুন তো? সলিল মুখার্জির ঝাঁঝালো প্রশ্ন।
অশুভ সংবাদটা শুনিয়ে দিতে চাই। বললে ফাদার ঘনশ্যাম।
তেড়ে উঠল রাজীবলোচন, দেখুন ফাদার–, পরমুহূর্তেই সামলে নিল নিজেকে ঘনশ্যাম পাদরির কুতকুতে চোখজোড়ার দিকে চেয়ে। এ দৃষ্টি সে আগেও দেখেছে অনেক অদ্ভুত ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তে। সুর পালটে নিয়ে বললে সঙ্গে-সঙ্গে, আপনি না হয়ে আর কেউ হলে কিন্তু আমাকে রুখতে পারত না–
