সেটা সৌভাগ্য, না দুর্ভাগ্য?
আমার ভাগ্যে যা আছে, তা কি আমিই জানি? ফাদার, প্রশ্নটা বিপুল ব্যানার্জির উচ্চাশা সফল করার ব্যাপারে নয়।
জানি। নরম গলায় বললে ফাদার ঘনশ্যাম, বিপুল ব্যানার্জি কোনও প্রবলেমই নয় এই মুহূর্তে। প্রবলেম হল–
পীতাম্বর।
হ্যাঁ, পীতাম্বর। বিপুল ব্যানার্জি ওর সম্বন্ধে যা-যা বলে গেল, তা কি সত্যি? তোমার তো মনে হয় সত্যি নয়।
শক্ত কাঠ হয়ে গেল অলিম্পিয়া। অদ্ভুত চোখে চেয়ে রইল ফাদার ঘনশ্যামের চশমার আড়ালে কুকুতে চোখজোড়ার দিকে। সে চোখে শ্যেনদৃষ্টি নেই, তবুও অলিম্পিয়ার মনে হয় যেন তার ভেতর
পর্যন্ত দুরবীণ দিয়ে দেখে নিচ্ছে অদ্ভুত নিস্তেজ ওই চোখজোড়া।
ভুরু কুঁচকে মুচকি হেসে বললে, অনেক কিছুই জানেন দেখছি।
ফাদার ঘনশ্যাম কিন্তু হাসির ধার দিয়েও গেল না। কণ্ঠস্বরেও অটুট রইল গাম্ভীর্য। বললে থেমে-থেমে, অলিম্পিয়া, জানি আমি অনেক কিছুই। কিন্তু এই ব্যাপারে জানি খুব সামান্যই। কিন্তু একটা ব্যাপারে জানি খুব ভালো করেই। আমি জানি, কে খুন করেছে তোমার বাবাকে।
ভীষণ চমকে উঠল অলিম্পিয়া। বসে থাকতেও পারল না। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁট হয়ে চেয়ে রইল ফাদারের দিকে ফ্যালফ্যাল করে। মুখ সাদা হয়ে গেছে। ফ্যাকাশে।
ফাদার ঘনশ্যাম কিন্তু নির্বিকার। বললে শুষ্ক কণ্ঠে, আমি একটা গাধা। নিরেট বোকা। বোঝা উচিত ছিল তখনই।
কখন?
যখন জিগ্যেস করা হচ্ছিল, কোথায় পাওয়া গেছে তোমার বাবাকে। সবুজ পাঁকে মাখামাখি অবস্থায়। ঠিক যেন সবুজ মানুষ।
বলে উঠে দাঁড়াল ঘনশ্যাম পাদরি। বিশাল ছাতাটা বাগিয়ে ধরল এমনভাবে যেন হঠাৎ নতুন। একটা সঙ্কল্প কঠিন করে তুলেছে অন্তরপ্রদেশকে।
কথার মধ্যেও প্রকট হল নতুন গাম্ভীর্য। বললে, তোমার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে যে হেঁয়ালি গড়ে উঠেছে, তার সমাধান-সূত্রটিও আমি জেনে ফেলেছি।
আ-আপনি জানেন?
কিন্তু এখুনি তোমাকে বলব না। খবরটা শুভ নয়, এইটুকুই শুধু জেনে রাখো। তবে যে অশুভ পরিস্থিতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছ, তার চাইতে বেশি অশুভ নয়। বলতে-বলতে কোটের বোতাম এঁটে নিল ফাদার। ঘুরে দাঁড়াল ফটকের দিকে, চললাম।
কোথায়?
পীতাম্বরের সঙ্গে দেখা করতে।
জানেন, কোথায় থাকে পীতাম্বর?
জানি। সমুদ্রের ধারে টালির ঘরটায়। বিপুল ব্যানার্জি সেখানেই তো দেখেছে ওকে পায়চারি করতে।
বেগে সমুদ্র-সৈকতের দিকে উধাও হয়ে গেল ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডল।
অলিম্পিয়া কল্পনার জগতে বাস করতে ভালোবাসে। কল্পনার আকাশপাতাল রচনা করে। তাই এই মুহূর্তে বয়স্ক এই বন্ধুটি যে ভয়াবহ ইঙ্গিতটি নিক্ষেপ করে অন্তর্হিত হয়ে গেল, সেই কল্পনা মনে নিয়ে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করল না। অথচ স্থানত্যাগ করে যেতেও পারল না। আচমকা অমন একটা ভয়াবহ ইঙ্গিত দিয়ে ঝড়ের মতো কেন যে উধাও হয়ে গেল ফাদার ঘনশ্যাম, আকাশপাতাল ভেবেও তার কুলকিনারা পেল না। ফাদার নাকি জানে কে খুন করেছে তার বাবাকে। কী করে জানল, সেটা একটা রহস্য। তার চাইতেও বড় রহস্য পুকুরের সবুজ পাঁকে সবুজ হয়ে যাওয়া মৃতদেহটাকে সবুজ মানুষ নামকরণ করা। সবুজ মানুষ! কীসের প্রতীক? এত হেঁয়ালি করে কথা বলে গেল কেন ফাদার? হেঁয়ালির মধ্যে হেঁয়ালি রচনা না করলেই কি চলত না? মনের চোখে যেন দেখতে পেল ভূতের মতো সবুজ মানুষ চক্কর দিচ্ছে পুকুরের পাড়ে–তাঁদের আলোয়। দিনের আলোয় এ ধরনের গা-ছমছমে কল্পনা মনের মধ্যে কেন যে হঠাৎ ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, বুঝে উঠল না অলিম্পিয়া। দিনের আলোটাকেই বরং আরও বেশি রহস্যময় মনে হল চঁদনি রাতের চেয়ে।
পুকুর। পাঁক। সবুজ মানুষ।
গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অলিম্পিয়া।
সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই অনেক দূরে দেখা গেল দ্রুত আগুয়ান একটা মূর্তিকে। আসছে তার দিকেই। দেখেই বুকের রক্ত চঞ্চল হল অলিম্পিয়ার। দুনিয়াটা মনে হল যেন হঠাৎ উলটে গেছে। যা কল্পনা করা যায় না, চোখের সামনে তাই দেখছে।
হনহন করে যে মূর্তি এগিয়ে আসছে তার দিকে সমুদ্রের ধার থেকে, তাকে চেনে অলিম্পিয়া। খুব ভালো করেই চেনে। কিন্তু তার হাঁটার ধরন আজ এরকম কেন? এরকম উচ্ছল ভঙ্গিমায় তো সে অনেকদিন হাঁটেনি?
আরও কাছে এগিয়ে এসেছে সে। না, ভুল হয়নি। পীতাম্বর আসছে। পড়ন্ত আলোয় ক্রমশ সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার মুখচ্ছবি। আনন্দের রোশনাইতে ঝলমল করছে সারা মুখখানা।
বিমূঢ় হয়ে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল অলিম্পিয়া।
হাসতে হাসতে উল্লাসে ফেটে পড়ল পীতাম্বর তার সামনে এসে। এতদিন যার ছায়া দেখলেই সরে গেছে দূর থেকে, এসে দাঁড়াল এক্কেবারে তার সামনে। দু-হাত রাখল তার দুকাঁধে। বললে সহর্ষে, মুখ তুলে চেয়েছেন ভগবান। এখন থেকে তোমার ভার আমার।
অলিম্পিয়া হতভম্ব। কিছুক্ষণ শুধু চেয়েই রইল ফ্যালফ্যাল করে পীতাম্বরের আনন্দনিবিড় চোখের তারা দুটোর দিকে। তারপর বলেছিল স্বগতোক্তির সুরে, এত আনন্দ কীসের? হঠাৎ এমনভাবে পালটে গেলে কেন পীতাম্বর?
কারণ, এইমাত্র শুনলাম অশুভ সংবাদটা। অলিম্পিয়া, আজ আমি সুখী, সত্যিই বড় সুখী!
.
মল্লিকভবনের সামনের বাগানে জড়ো হয়েছে সকলেই। বিচিত্র এই রহস্য উপাখ্যানে যাদের কিছু ভূমিকা আছে, তারা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে তারাও যাদের কোনও ভূমিকাই নেই। সবাই দাঁড়িয়ে আছে দু-পাশে ঝাউবীথি শোভিত পথের ওপর। উদ্দেশ্য একটাই। আইনবিদ মহাশয় এখুনি আনুষ্ঠানিকভাবে করবেন তার কর্তব্যটি। অর্থাৎ পড়ে শোনাবেন স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিকের শেষ ইষ্টিপত্র। সেইসঙ্গে জ্ঞানদানও করবেন। সেটাও তার কর্তব্য। এহেন সঙ্কটাবস্থায় যা-যা করণীয়, আইনজ্ঞ হিসেবে তা তাকে বলতেই হবে। ফলে, কী ঘটবে আর কী না ঘটবে, জানবার আগ্রহ প্রত্যেকেরই মনে।
