চিনি…মানে–
সে চেনা নয়, অধীর কণ্ঠে বলে অলিম্পিয়া, জানেন তার নাড়ীনক্ষত্র? তার চরিত্র? তার স্বভাবপ্রকৃতি?
অত কি আর জানি। যেটুকু শুনেছি, তা একটু গোলমেলে বইকী।
কী রকম? কী রকম?
পীতাম্বরকে যাত্রা-পার্টির সবাই পীতাম্বরানন্দ বলে ডাকে। অথচ সে আনন্দে ভরপুর নয় কখনওই। তাকে দেখলেই মনে হয় যেন একটা জীবন্ত বিষের বোতল কঙ্কালের করোটির ওপর যেন আড়াআড়িভাবে রাখা দুটো মড়ার হাড়।
কী ভয়ঙ্কর! কী ভয়ঙ্কর!
ভয়ঙ্কর তো বটেই। ওরকম চেহারা যার–
পীতাম্বরকে মোটেই ওরকম দেখতে নয়। কিন্তু…
কিন্তু বলতে-বলতে খাদে নেমে আসে অলিম্পিয়ার কণ্ঠস্বর, অদ্ভুত কিছু একটা ঘটেছে ওর মধ্যে। এইটুকু বয়স থেকে ওকে আমি চিনি– হাড়ে-হাড়ে চিনি–মড়ার হাড় ওর মুখের ওপর কখনও কল্পনাও করতে পারি না–ভেতরে তো নয়ই। কত খেলা খেলেছি দুজনে সমুদ্রের ধারে বালির ওপর। ঝিনুক কুড়িয়েছি, কাড়াকাড়ি করেছি, বালির কেল্লা গড়েছি, ভেঙে তছনছ করে দিয়েছি। ওর কথাগুলো একটু ঝাঁঝালো। বড় চোখাচোখা। মনের ভেতর পর্যন্ত কুপিয়ে কাটে। যারা ওকে চেনে না, জানে না, বোঝে না তাদের কাছে তাই ও বিষের বোতল, কঙ্কালের করোটি আর মড়ার হাড় হতে পারে–আমার কাছে নয়। কেননা, আমি জানি ওর ছুরির মত ধারালো কথাবার্তার মধ্যে আছে কবিতার সুর আর ছন্দ, ফুলের মতো ওর মনের গন্ধ আর রং। সেই সময়ে আমিও ওকে পীতাম্বরানন্দ বলে খেপাতাম। আনন্দ দিতে জুড়ি ছিল না। আনন্দ বিতরণ করতে ভালোবাসত বলেই যাত্রাপার্টিতে ঢুকেছিল পাঁচজনকে আনন্দ দেবে বলে। কিন্তু…কিন্তু
তারপর? অসহিষ্ণু কণ্ঠে শুধু বললে ফাদার ঘনশ্যাম।
ইদানীং যে যাত্রাপার্টিতে আনন্দের খোরাক আর পাচ্ছে না, আমার কাছে তা বলেছিল। আমার কাছেই শুধু বলেছিল–আর কাউকে নয়। কিন্তু ভেতরে যার আনন্দ নেই, সে তো নিরানন্দ থাকবে বাইরেও। কাঠের মতো শক্ত হয়ে মুখখানাকে পেঁচার মতো করে না-না, কঙ্কালের করোটির মত কক্ষনও নয়–পেঁচার মতো করে দিনগত পাপক্ষয়ই কেবল করে গেছে। মড়ার মতো হেঁটে যাওয়া বলতে পারেন–আড়ষ্ট, প্রাণহীন। প্রাণে ফুর্তি থাকলে তো বাইরে বেরোয় ফুর্তির ফোয়ারা– কেন, আমি জানি না! এড়িয়ে চলে আমাকে। তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমার জন্যে ওর ভেতরটা গুঁড়িয়ে গেছে, আমার তা মনে হয় না। খুব বড় রকমের একটা দুঃখ শুকিয়ে দিয়েছে ওর ফুর্তির ফোয়ারা। এখন যা শুনলাম বিপুল ব্যানার্জির মুখে, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলব, ওর এই দুঃখটা এসেছে পাগলামি থেকে। অথবা
অথবা?
ওর ঘাড়ে ভূত চেপেছে।
বিপুল ব্যানার্জির কাছে কী শুনেছ, অলিম্পিয়া? তা এতই ভয়ঙ্কর যে বলতেও মুখে আটকাচ্ছে।
আটকাক। তবুও বলো।
বিপুল ব্যানার্জি নিজের চোখে দেখেছে, বাবার পেছন-পেছন পা টিপে টিপে আসছিল পীতাম্বর। কিছুতেই যেন মনস্থির করে উঠতে পারছিল না। তারপর খাপ থেকে টেনে বার করেছিল তলোয়ার…।
তারপর?
ডাক্তার তো বলছেন, ইস্পাতের সরু ফলা দিয়ে বুক ফুটো করা হয়েছে বাবার।
বলেছেন বটে।
ফাদার, আপনার কী মনে হয়—
তোমার কী মনে হয় অলিম্পিয়া, আগে তা বলো।
আমার কী মনে হয়? আমার কী মনে হয়, তা কি আপনি আঁচ করতে পারেননি ফাদার? পীতাম্বর ইদানীং মুষড়ে থাকত। বাবার মেজাজ তো জানি–মেজাজ সপ্তমে উঠতে দেরি লাগে না। পীতাম্বরের সঙ্গে খিটিমিটি লেগে থাকতই। তবু বলব, বিপুল ব্যানার্জি নিজের চোখে যাই দেখুক না কেন, পীতাম্বরের পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয় কোনওমতেই।
কিন্তু বিপুল ব্যানার্জি তো ভুল দেখেনি।
আমিও আমার পুরোনো বন্ধুর হয়ে ওকালতি করতে বসিনি। তা ছাড়া, পীতাম্বর তো এখন আমার বন্ধু নয়–ছিল এককালে–অনেক-অনেক বছর আগে। এখন আমার ছায়া মাড়ানো দূরে থাক দূর থেকেই ছায়া দেখলে সরে যায়। বন্ধু সে আর নয়, শত্রুও নয়। সুতরাং পীতাম্বরের পক্ষে যা অসম্ভব, তা হাজারবার বলতে দ্বিধা নেই আমার। অথচ প্রায় হাজারবার ওই একটা কথাই বলে গেল বিপুল ব্যানার্জি–
একই কথা হাজারবার বলাটা বিপুল ব্যানার্জির মুদ্রাদোষ।
মুদ্রাদোষ!
বলেই থেমে গেল অলিম্পিয়া। গুম হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ।
তারপরেই মুখ তুলে বললে এক্কেবারে অন্য সুরে, মুদ্রাদোষটা আমার ক্ষেত্রে না দেখালেই ভালো হত না? বিশেষ করে এই সময়ে?
তোমার ক্ষেত্রে? জুলজুল করে তাকায় ফাদার ঘনশ্যাম।
হাজারবার বলে গেল একটাই কথা বিয়ে করতে চায় আমাকে।
সুসংবাদ।
সুসংবাদ?
অভিনন্দনটা কাকে জানাব, সেটাই শুধু ঠিক করে উঠতে পারছি না। তোমাকে, না বিপুল ব্যানার্জিকে?
ফাদার!
অলিম্পিয়া, উত্তেজনা কোনও সমস্যারই সমাধান করতে পারে না, বরং আরও জট পাকিয়ে দেয়।
উত্তেজিত এখন হয়েছি–তখন হইনি।
আমিও তা দেখেছি। খুবই উত্তেজিত হয়েছিল বিপুল ব্যানার্জি। বিয়ের প্রস্তাবটা শোনবার পর কী বললে তুমি?
বললাম, এখন ওসব কথা থাক।
চমৎকার বলেছ। বিপুল ব্যানার্জি কী বলল?
কথা কানেই তুলতে চায় না। একই কথা বলে গেল হাজার বার। বলতে বলতে অলিম্পিয়ার কথায় জাগল সেই আমুদে সুর–যা ওর অন্তর-প্রকৃতির মধ্যে সুপ্ত থাকে বাইরে থেকে দেখে মোটেই বোঝা যায় না, কত কথাই না বলে গেল। জীবনে বড় হতে চায়, অনেক উচ্চাশাকে সফল করতে চায়। এক সময়ে নাকি আমেরিকাতে ছিল–অথচ আমেরিকার ডলার ছাড়া আর কোনও আমেরিকাব বিষয় নিয়ে ওকে কথা বলতে এর আগে শুনিনি। উচ্চাশাগুলো যে কত উচ্চে পৌঁছেছে, তাও জানবার সৌভাগ্য কখনও হয়নি–জানলাম এই প্রথম। বিয়ে করে নিয়ে যেতে চায় আমাকে আমেরিকার স্বর্গরাজ্যে ।
