মৃদু হেসে বলেছে পাদরিকে, ফাদার, স্যার প্রদ্যুম্নর উইলে ঘোরপ্যাঁচ কিচ্ছু নেই। সবাই যা করে, উনিও তাই করেছেন। স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি দিয়ে গেছেন একমাত্র সন্তান অলিম্পিয়াকে।
এরপরেই রাস্তায় নেমে এসেছে সবাই। রওনা হয়েছে মল্লিকভবনের দিকে। হন্তদন্ত হয়ে সবার আগে-আগে চলেছে বিপুল ব্যানার্জি। গন্তব্যস্থানে আগেভাগে না পৌঁছলেই যেন নয়।
কিন্তু সেরকম কোনও তাড়াহুড়োই দেখা যাচ্ছে না পেছনের দুটি মূর্তির ক্ষেত্রে। ধীরেসুস্থে যেন হাওয়া খেতে-খেতে চলেছে দীর্ঘকায় ডাক্তার আর হ্রস্ববপু পাদরি। গন্তব্যস্থানে তড়িঘড়ি পৌঁছনোর চাইতে অনেক বেশি আগ্রহ দেখা যাছে সাতপাঁচ কথাবার্তায়।
জীবন্ত প্রহেলিকা বলা যায় ডাক্তার তলাপাত্রকে। হাঁটছেন মুখ বুজে। পাদরি ঘনশ্যামের হযবরল কথাবার্তা যেন এ কান দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে ও কান দিয়ে।
প্রশ্নটা করলেন হঠাৎ।
ফাদার, একটা কথা জিগ্যেস করব?
কুৎকুতে চোখ ফিরিয়ে তাকায় ফাদার, কী বলুন তো?
ব্যাপারটা আপনার লাগছে কীরকম?
সেকেন্ড কয়েক অনিমেষে ডাক্তারের পানে চেয়ে রইল ফাদার। তারপর বললে, কীরকম মানে?
মানে, সব তো শুনলেন, এখন কী মনে হচ্ছে আপনার?
দু-একটা ধাঁধা ঘুরঘুর করছে মাথার মধ্যে।
ধাঁধা!
স্যার প্রদ্যুম্নকে তেমনি ঘনিষ্ঠভাবে জানতাম না বলেই একটু গোলমাল লাগছে?
গোলমালটা কোথায়?
স্যার প্রদ্যুম্নকে তেমন না জানলেও, ওঁর মেয়ে অলিম্পিয়াকে জানি বেশ ভালো করেই। ডাক্তারের সরাসরি প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে যায় ফাদার।
অজাতশত্রু ছিলেন স্যার প্রদ্যুম্ন। সুন্দর মুখখানাকে উৎকট গম্ভীর করে বলল ডাক্তার।
আছে, কিছু আছে। নিরীহ স্বরে বললে পাদরি ঘনশ্যাম।
কিছু আছে! কোথায়? কী?
আপনার কথার মধ্যেই। যা আপনি খুলে বলতে চান না।
দেখুন মশায়, স্বর রুক্ষ হয়ে ওঠে ডাক্তারের, আমার এই নাকটা দেখেছেন?
সুন্দর নাক।
এই নাকের আত্মসম্মান বোধটা একটু প্রখর। যেখানে সেখানে নাক-গলানো আমার ধাতে নেই। বুঝেছেন?
বুঝলাম।
স্যার প্রদ্যুম্ন খুন হয়েছেন তো আমার কী? ভদ্রলোকের মেজাজের একটু নমুনা পেয়েছি। কাজেই তার মৃত্যুরহস্য নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই নেই আমার।
কীরকম নমুনা শুনতে পারি?
আরে মশাই, সামান্য একটা ব্যাপার। অপারেশন করতে গেলে ওরকম একটু-আধটু ভুল সব ডাক্তারই করে। কিন্তু তিলকে তাল করে তুললেন উনি। কোর্টে পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
শেষপর্যন্ত আর যাননি?
সুবুদ্ধিটা শেষকালে এসেছিল বলেই যাননি। ওঁর নিচের থাকের মানুষদের পোকামাকড়ের মতো দেখতেন। ব্লু ব্লাড থাকলে যা হয় আর কী।
জবাব দিল না ফাদার ঘনশ্যাম। চেয়ে রইল একদৃষ্টে সেক্রেটারির দিকে। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে গেছে বিপুল ব্যানার্জি। হন্তদন্ত হয়ে হাঁটার কারণটাও আবিষ্কার করে ফেলল ফাদার ঘনশ্যাম।
অলিম্পিয়া। স্যার প্রদ্যুম্নর কন্যা। এখনও পঞ্চাশ গজ এগিয়ে রয়েছে বিপুল ব্যানার্জির সামনে। চলেছে মল্লিকভবনের দিকেই।
পঞ্চাশ গজ পথ হনহনিয়ে পেরিয়ে গিয়ে অলিম্পিয়ার নাগাল ধরে ফেলল সেক্রেটারি। দূর হতে মিলিয়ে গেল পাশাপাশি দুটি মূর্তি। অপলকে মূকাভিনয় দেখে গেল ফাদার ঘনশ্যাম পেছন থেকে। খুবই উত্তেজিত মনে হল সেক্রেটারিকে। কারণটা ফাদার ঘনশ্যাম আঁচ করতে পারলেও মুখে প্রকাশ করল না। ডাক্তারের সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে পৌঁছল মোড়ের মাথায়–অদূরে মল্লিকভবন।
আচমকা প্রশ্নটা করল ঠিক তখন।
ডাক্তার, আপনার আর কিছু বলার আছে বলে মনে হচ্ছে না।
কেন থাকবে শুনি? সঙ্গে-সঙ্গে মুখের ওপর জবাবটা ছুঁড়ে দিয়েই এমনভাবে লম্বা-লম্বা পা ফেলে উধাও হলেন ডাক্তার যেন জবাব নয়, প্রশ্নই করে গেলেন–বলার যদি কিছু থাকেও, বলতে যাবেন কেন? আদৌ কিছু বলার আছে কিনা, সেটাও অনিশ্চিত রয়ে গেল অদ্ভুত ভঙ্গিমায় নিক্ষিপ্ত শব্দ তিনটের মধ্যে। জবাব না জিজ্ঞাসা–কিছুই আঁচ করা না গেলেও ফাদার ঘনশ্যামের মস্ত মাথার মধ্যে শব্দ তিনটে কিন্তু ঘুরপাক খেয়েই গেল। একা-একা হেঁটে গেল বিপুল ব্যানার্জি আর অলিম্পিয়ার পেছন-পেছন।
কিন্তু থমকে দাঁড়িয়ে গেল মল্লিকভবনের ঝাউবীথির সামনেই।
আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে অলিম্পিয়া। দ্রুত চরণে এগিয়ে আসছে ফাদারের দিকেই। মুখভাব অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। জুলজুল করছে কিন্তু দুই চোখ। যেন টাটকা অথচ নামহীন আবেগে আপ্লুত হয়েছে অন্তরপ্রদেশ।
কাছে এসেই বললে চাপা গলায়, ফাদার, জরুরি কথা আছে। এখুনি শুনতে হবে। কী করব ভেবে পাচ্ছি না।
নিশ্চয়, নিশ্চয়। এখুনি শুনব। কিন্তু কোথায় বসে শুনব?
ঝাউবীথির দুপাশে বিরাট বাগান। ফাদার ঘনশ্যামকে এই বাগানের মধ্যেই নিয়ে গেল অলিম্পিয়া। বসল ঝরাপাতায় ঢাকা ঘাসজমির ওপর। মুখ খুলল সঙ্গে-সঙ্গে। যেন পেট থেকে কথা বার করে না দেওয়া পর্যন্ত আবেগকে আর ধরে রাখতে পারছে না–অজ্ঞান হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
কথাটা এই, বিপুল ব্যানার্জি এইমাত্র বড় ভয়ঙ্কর-ভয়ঙ্কর কথা বলে গেল।
নীরবে মস্ত মাথা নেড়ে সায় দিলে ফাদার ঘনশ্যাম। কথাগুলো যে খুবই ভয়ঙ্কর, তা পেছন থেকে বিপুল ব্যানার্জির ভয়ঙ্কর উত্তেজনা দেখেই আঁচ করা গেছিল।
অলিম্পিয়া বললে, কথাটা পীতাম্বরকে নিয়ে। চেনেন পীতাম্বরকে?
