দৃষ্টি বিনিময় সাঙ্গ করে দুজনেই দৃষ্টিশর নিক্ষেপ করল বার্তাবহ বিপুল ব্যানার্জির পানে। কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ।
পরমুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল প্রশ্নের-পর-প্রশ্ন।
পাদরির প্রশ্ন, কখন?
সলিল মুখার্জির প্রশ্ন, কোথায়?
জবাবটা দিল ইনসপেক্টর, সবুজ মানুষ চায়ের দোকানের কাছেই যে পুকুরটা আছে– সেইখানে। সবুজ পাঁক আর সবুজ শ্যাওলায় মাখামাখি লাশটা টেনে তোলবার পর চিনতে কষ্ট হয়েছে। ডক্টর তলাপাত্র তারপর আরে! আরে! ফাদার ঘনশ্যাম! আপনার কী হল? শরীর খারাপ নাকি?
শিউরে উঠে বললে ফাদার ঘনশ্যাম, সবুজ মানুষ! সবুজ মানুষ!
লাশটাকে সবুজ মানুষের মতোই লাগছিল বটে—
সরি, ইনসপেক্টর! মাথাটা হঠাৎ কীরকম ঘুরে যাওয়ায়–বলুন, বলুন, আপনি বলে যান।
রাজীবলোচন চোখ দুটো একটু ছোট করে ফাদার ঘনশ্যামের দিকে চেয়ে রইল সেকেন্ড কয়েক। তারপরে বললে, মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল কেন?
কাষ্ঠহাসি হাসল ফাদার ঘনশ্যাম। বললে আমতা-আমতা করে–ডেডবডিটা সবুজ পাঁক আর সবুজ শ্যাওলায় মাখামাখি হয়েছিল শুনেই–
কী মুস্কিল! তাতে মাথা ঘুরে যাবে কেন?
আমি ভেবেছিলাম, সমুদ্রের সবুজ উদ্ভিদের জন্যে সবুজ মানুষ হয়ে গেছেন স্যার প্রদ্যুম্ন। সেইটা হলেই বরং ছিল ভালো–পাঁক আর শ্যাওলাটা বড় বিচ্ছিরি জিনিস।
ঘরসুদ্ধ সবাই নিমেষহীন চোখে তাকিয়ে থাকে ঘনশ্যাম পাদরির দিকে। পাগল নিশ্চয়। মাথায় ছিট আছে। ঘর নিস্তব্ধ।
নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করলেন ডাক্তার তলাপাত্র।
ভদ্রলোক নিঃসন্দেহে অসাধারণ পুরুষ। অন্তত বাহ্য-আকৃতির দিক দিয়ে। মাথায় তালঢ্যাঙা। রোগা ডিগডিগে। চর্বি-টর্বির বালাই নেই। তাই বলে অস্থিচর্মসার মোটেই নন। পোশাক-আশাকেও রীতিমত পারিপাট্য। যে ধরনের কোট-প্যান্ট পরলে ডাক্তার বলে মনে মনে সম্ভ্রম জাগে–পরেছেন ঠিক সেই ধরনের কোট-প্যান্ট-টাই। তবে যা একটু সেকেলে। কোট-প্যান্টের কাট-ছাঁট অথবা নেকটাইয়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আধুনিক ফ্যাশন অনুযায়ী অচল। বয়স কিন্তু তেমন কিছু নয়। চল্লিশও ছাড়িয়েছে কিনা সন্দেহ। ধড়াচূড়ায় সেকেলে, কিন্তু দাড়ি রাখার ব্যাপারে আধুনিক। মাইকেল মধুসূদন টাইপের দাড়ি রেখে আঁতেল হতে চায় এ যুগের অনেকেই। ডাক্তার তলাপাত্রও সযত্নে মাইকেল দাড়ির চাষ করেছেন দুই গালে। বরং একটু বাড়িয়েই রেখেছেন। রাবীন্দ্রিক স্টাইলে বুক পর্যন্ত লুটিয়ে দিয়েছেন। দুই চোখে কিন্তু রাবীন্দ্রিক বা মাইকেলি চাহনির ছিটেফোঁটাও নেই। অন্তর্ভেদী রুক্ষ চাহনি। মুখভাব তা সত্ত্বেও সুন্দর। কিন্তু এই মুহূর্তে কেন জানি বড় ফ্যাকাশে মনে হচ্ছে। সরু ছুরির মতো চোখজোড়া বড় চঞ্চল। কোনওদিকে বা কারও দিকেই স্থির থাকছে না, অথচ স্থির রাখার চেষ্টা চলছে অবিরাম।
ঘরের প্রত্যেকেই লক্ষ করল এইসব কিছুই। কেউ কিছু বলার আগেই মুখ খুললেন ডাক্তার। কণ্ঠস্বরে জাগ্রত হল কর্তৃত্ব, প্রখর ব্যক্তিত্ব। নায়ক যেন তিনি এখন নিজে। আশ্চর্য এই কর্তৃত্বব্যঞ্জক কণ্ঠস্বরকে ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। বুঝে নিতে হবে।
যা বললেন তিনি, তা এই : স্যার প্রদ্যুম্নর লাশ জলের মধ্যে পাওয়া গেছে ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে একটা রহস্য।
থামলেন। সবাইকে দেখলেন। তারপর বললেন, জলে ডুবে উনি মারা যাননি।
তড়িৎস্পর্শে যেন সচকিত ইনসপেক্টর রাজীবলোচন। এবং সেই প্রথম তীব্র কণ্ঠে প্রশ্ন করতে শোনা গেল তাকে, এক্সপ্লেন।
ডেডবডি এগজামিন করে এলাম এইমাত্র। স্যার প্রদ্যুম্নর মৃত্যু হয়েছে হৃৎপিণ্ডের মধ্যে একটা সরু তীক্ষ্ণ বস্তু ঢুকে যাওয়ার ফলে। ছোট ছোরাজাতীয় কিছু।
রাজীবলোচন চেয়ে আছে। চোখের পাতা পড়ছে না। গোল চশমার আড়ালে চোখের পাতা বন্ধ করে যেন মনের চোখে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করছে ঘনশ্যাম পাদরি।
বললেন ডাক্তার, মৃত্যুর বেশ কিছুক্ষণ পর ডেডবডি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল পুকুরের জলে।
এইবার দুই চোখ খুলে গেল ফাদার ঘনশ্যামের। নিষ্প্রভ মণিকা দুটো এখন আশ্চর্য উজ্জ্বল। যেন প্রাণশক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে তারারন্ধ্র থেকে। একদৃষ্টে চেয়ে আছে ডাক্তারের পানে। ফাদার ঘনশ্যামকে যারা দীর্ঘদিন ধরে চেনে, তারা অন্তত জানে, কদাচিৎ এভাবে কারও দিকে তাকিয়ে থাকে বিচিত্র এই পাদরি।
অফিসরুম থেকে একে-একে সবাই বেরিয়ে আসে রাস্তায়। ফাদার ঘনশ্যাম কিন্তু আঠার মতো লেগে আছে ডাক্তারের পেছনে। হঠাৎ গায়ে পড়ে আলাপ শুরু করে দেয় অত্যন্ত অমায়িক ভঙ্গিমায়।
ঘর ছেড়ে বেরোনোর আগেই অবশ্য আসল প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনা সেরে নিয়েছে বিষম কৌতূহলী বিপুল ব্যানার্জি।
প্রসঙ্গটা স্যার প্রদ্যুম্নর উইল সংক্রান্ত।
সলিল মুখার্জি প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ আইনবিদ। উইলের ব্যাপারে চট করে মুখ খুলতে চায় কোনও আইনজীবীই। বিপুল ব্যানার্জির অস্থিরতা তাকে একটু বিরক্তই করেছে বলা চলে। চুলচেরা চোখে লক্ষও করেছে, উইলের বৃত্তান্ত না জানা পর্যন্ত যেন স্বস্তি পাচ্ছে না সেক্রেটারি।
রাজীবলোচনও দেখেছে বিপুল ব্যানার্জির অধীর কৌতূহল। পুলিশি কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে সলিল মুখার্জির মুখ বন্ধ রাখতেও পারত সেই মুহূর্তে। কিন্তু যে ব্যাপারে কোনও রহস্য নেই, অযথা সেই ব্যাপারটাকে রহস্যময় করে তুলতে চায়নি ফাদার ঘনশ্যাম। বলতে গেলে তারই অনুরোধে অবশেষে মনের আগল খুলেছে সলিল মুখার্জি।
