পারছি। অমায়িক বচন রাজীবলোচনের।
আরও ঘাবড়ে গেল বিপুল ব্যানার্জি। ফলে স্পিড বেড়ে গেল কথার, মানে, সে বেচারি হয়তো অনেক হাবিজাবি কথাই ভেবে মরছে…দুশ্চিন্তা তো হবেই…ঠিক কিনা বলুন?
এক্কেবারে ঠিক।
ফালতু চিন্তা থেকে ওকে মুক্তি দেওয়া দরকার।
তা তো বটেই।
খামোকা ভেবে মরছে। এর মধ্যেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটন্ধুর সঙ্গে কনসাল্ট করবে ঠিক করে ফেলেছে। একজন তো এই মুহূর্তে এই টাউনেই রয়েছে।
কে বলুন তো?
নামটা তার যেমন বিদঘুঁটে, পেশাটাও তেমনি বিদঘুঁটে। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে যারা তাদের আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি না।
ধর্মের ব্যবসাদারদের অনেক সময়ে দুচোখ দিয়ে দেখাও যায় না।
মানে? মানে?
মনের চোখ দরকার।
এবার বিলক্ষণ চটিতং হল বিপুল ব্যানার্জি, আরে মশায়, এ লোকটা পয়লা নম্বর বুজরুক। ঈশ্বর নিয়ে কারবার করে, অথচ পাইপ খায় যখন-তখন।
খাক না। সাধু-সন্ন্যাসীরা গাঁজাও খায়।
যাচ্চলে! শিব গাঁজা খায় বলেই সন্ন্যাসীরা গাঁজা খায়। কিন্তু যীশু কি কোনওদিন পাইপ খেত?
কার কথা বলছেন? এবার যেন আগ্রহের রোশনাই দেখা যায় রাজীবলোচনের পাথর চোখে।
যার ভাঙা ছাতা, ন্যাতার মতো আলখাল্লার আর কুমড়োর মতো চেহারা দেখলে আপনি হেসে গড়িয়ে পড়বেন।
নামটা?
ফাদার ঘনশ্যাম।
ঘনশ্যাম পাদরি!
চেনেন নাকি?
আপনার চাইতে বেশি চিনি।
আ-আমার চাইতে! মা-মানেটা কী হল?
মানে হল এই যে, ফাদার ঘনশ্যামকে আমি যতটা চিনি, আপনি তার দশ ভাগের এক ভাগও চেনেন না। আইসবার্গের ওপরটুকুই কেবল আপনি দেখেছেন–চোখের আড়ালে যা আছে, তা দেখেননি।
আইসবার্গ! মা-মা–
মানে, হিমবাহ। ফাদার ঘনশ্যাম একটা মানুষ-হিমবাহ। তার বাইরেটা হাস্যকর। কিন্তু ভেতরটা যে কত ভেতরে গেছে, তা তলিয়ে দেখার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। বলে বিপুল ব্যানার্জির দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থেকে রাজীবলোচন বুঝিয়ে দিলে সাধারণ মানুষটা বর্তমান ক্ষেত্রে কে– অদ্ভুত একটা জুয়েল কেসে তার যে ভেল্কি দেখেছি, তাতেই বুঝেছি, ফাদার ঘনশ্যাম পাদরি না হয়ে পুলিশ হলে পারতেন।
অতঃপর ঘরের মধ্যে থাকা আর সমীচীন বোধ করেনি বিপুল ব্যানার্জি। বিপুল বেগে ঘর থেকে উধাও হয়ে যেতে-যেতে শুধু বলে গেছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে, তাহলে সলিসিটর কোম্পানিতে ফাদার ঘনশ্যামও আসুক। ডাক্তারও আসুক। এক জায়গাতেই সবকথা হয়ে যাক।
ব্যবস্থা হল সেইভাবেই। সমুদ্রসৈকত থেকে খুব দূরে নয় টাউন। ইনসপেক্টর রাজীবলোচনকে নিয়ে হুড়মুড় করে সলিসিটর কোম্পানির অফিসে ঢুকল বিপুল ব্যানার্জি। ফাদার ঘনশ্যাম পৌঁছে গেছে তাদের আগেই। কোলের ওপর বিরাট (এবং ভাঙা) ছাতাটা রেখে বসে আছে চেয়ারে। দুহাত রয়েছে তালিমারা নোংরা ছাতার ওপর। জমিয়ে গল্প করছে কোম্পানির সেকেন্ড পার্টনার সলিল মুখার্জির সঙ্গে। ডক্টর তলাপাত্রও হাজির অফিসরুমে। নিশ্চয় এইমাত্র এসেছেন। সুদৃশ্য ছাতাটা ঘরের কোণে রাখছেন। এখুনি এসেছেন বলেই নিশ্চয় স্যার প্রদ্যুম্নর মৃত্যুসংবাদ এখনও দেননি ফাদার ঘনশ্যাম এবং সলিল মুখার্জিকে। দুজনেরই মুখে তাই কৌতুক ঝলমল করছে। হাসির কথাই বলছে বোধ হয় ফাদার ঘনশ্যাম। চাঁদের মতো মুখ আর চশমার আড়ালে কুকুতে চোখে রসবোধ যেন উপচে উঠছে। সলিল মুখার্জি শুধু শুনে যাচ্ছে আর শব্দহীন হাসি হেসে চলেছে। ভদ্রলোকের মাথার চুলে পাক ধরেছে। বিলক্ষণ আমুদে বলেই দুই চোখ নাচিয়ে-নাচিয়ে ঘনশ্যাম পাদরির কথা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। চকচকে কাগজকাটা ছুরির পাশে পড়ে থাকা ধুলোয় ময়লা কলমটা নাড়তে নাড়তে নিমগ্ন হয়ে রয়েছে রসালাপে।
রাজীবলোচন আর বিপুল ব্যানার্জি সবেগে আবির্ভূত হতেই গোল চশমার ফাঁক দিয়ে চাইল ফাদার ঘনশ্যাম। বললে, ফাইন মর্নিং। ঝড় পালিয়েছে, সকালটাও যেন হাসছে।
রাজীবলোচন বললে, আপনার হাসিও তাই খুলেছে।
পুরোপুরি খোলেনি, বললে ফাদার ঘনশ্যাম, এখানে সেখানে এখনও কিছু কালো মেঘ জমে রয়েছে। তবে বৃষ্টি আর পড়েনি।
হ্যাঁ, এখনও কিছু কালো মেঘ জমে রয়েছে। বললে রাজীবলোচন।
কিন্তু এক ফোঁটা বৃষ্টিও আর পড়েনি। ফাদার ঘনশ্যামের সুরে সুর মিলিয়ে বললে সলিসিটর সলিল মুখার্জি, ও মেঘে আর বৃষ্টি হবে না। ছুটির মেজাজ আসে এমন দিনেই।
অথবা ছুটির মেজাজ উবে যায় এমন দিনেই। বললে রাজীবলোচন।
বিপুল ব্যানার্জি এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি। তাই এবার তার দিকে অ্যাপায়নের সুরে বললে সলিল মুখার্জি, আছেন কেমন ব্যানার্জি সাহেব? স্যার প্রদ্যুম্ন নাকি ফিরে আসছেন?
আসছিলেন, কিন্তু আর আসবেন না। কঁকা গলায় বললে বিপুল ব্যানার্জি।
কলম নামিয়ে রাখল সলিল মুখার্জি, কেন আসবেন না?
জলে ডুবে মারা গেছেন বলে।
মুহূর্তের মধ্যে পালটে গেল অফিসরুমের হালকা পরিবেশ। কিন্তু চেয়ারে আসীন মূর্তি দুটির সকৌতুক মুখচ্ছবি কৌতুক ঝলমলেই রইল আগের মতো। যেন এইমাত্র একটা মস্করা করে বসল বিপুল ব্যানার্জি-তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করে গেল সলিল মুখার্জি এবং ফাদার ঘনশ্যাম। ঠোঁটগুলো রইল কেবল নিস্পন্দ নিস্পন্দ রইল অবয়বও।
তারপর দুজনেই মৃদুকণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করলে একই কথাটা, জলে ডুবে মারা গেছেন!
বলে, ফাদার ঘনশ্যাম তাকালেন সলিল মুখার্জির মুখের দিকে। সলিল মুখার্জিও তাকাল ফাদার ঘনশ্যামের মুখের পানে।
