বিপুল ব্যানার্জির মাথায় তখন ঘুরঘুর করছে সদ্য-পড়া একটা বইয়ের বিষয়বস্তু। বইয়ের নাম, কী করে দশদিনে ডিটেকটিভ হওয়া যায়। তাই শেষমেষ বললে, ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে তাহলে এই অ্যাক্সিডেন্ট, সুইসাইড অথবা মার্ডার।
চেয়ে রইল রাজীবলোচন।
ঝটিতি বললে বিপুল ব্যানার্জি, ত্রিভুজ রহস্য–চিরকাল যা ঘটে এসেছে, ঘটে চলবে।
রাজীবলোচন বললে, অ্যাক্সিডেন্ট? কক্ষনও না।
কেন না?
অ্যাক্সিডেন্ট মানে বলতে চাইছেন, অন্ধকারে দেখতে পাননি–জলে পড়ে গেছেন স্যার প্রদ্যুম্ন, কেমন?
নিশ্চয়, নিশ্চয়।
কিন্তু ঘটনাটা যখন ঘটে, তখন তো অন্ধকার তেমন গাঢ় হয়নি। তা ছাড়া, রাস্তা থেকে পুকুরটা কম করেও পঞ্চাশ গজ দূরে। রাস্তাও অচেনা নয়–চোখ বেঁধে ছেড়ে দিলেও পৌঁছে যেতেন নিজের বাড়ি। পঞ্চাশ গজ দূরে পুকুরের দিকে যাবেন কেন? না, একে অ্যাক্সিডেন্ট বলা যায় না। কোনওমতেই না। জেনেশুনে গিয়ে ধীরে-সুস্থে নিশ্চয় শুয়ে পড়েননি পুকুরের জলে।
সুইসাইড করার ইচ্ছে থাকলে–
সুইসাইডও নয়। মানুষ সুইসাইড করে কেন? জীবনে বিতৃষ্ণা এসে, মনে প্রচণ্ড আঘাত পেলে, অথবা দারিদ্র্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারলে–
বটেই তো! বটেই তো!
স্যার প্রদ্যুম্নর ক্ষেত্রে এর কোনওটাই খাটে না। জীবনে তাঁর তৃষ্ণা না থাকুক, বিতৃষ্ণা নেই। যাত্রাটাত্রা নিয়ে ছিলেন মনের সুখে। মনে আঘাত পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কেননা, তাঁর পারিবারিক জীবন অত্যন্ত সুখের। টাকা-পয়সার অভাব কাকে বলে, তা তিনি জন্মাবধি জানেননি–কোটিপতি বলা যায় এক কথায়। নইলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত যাত্রাপার্টির পেছনে দু হাতে টাকা ওড়াতে যেতেন না। সুখে ছিলেন, বড় সুখে ছিলেন–সুইসাইড করতে যাবেন কোন দুঃখে?
রহস্যনিবিড় চাপা স্বরে বললে বিপুল ব্যানার্জি, তাহলেই দেখুন এসে যাচ্ছে তৃতীয় সম্ভাবনাটা।
তৃতীয় সম্ভাবনাটা নিয়ে এই মুহূর্তে এত তাড়াহুড়ো করার কোনও প্রয়োজন দেখছি না, থেমে-থেমে নিরুত্তেজ গলায় বললেন রাজীবলোচন।
শুনে বিলক্ষণ বিরক্ত হল বিপুল ব্যানার্জি। তার আবার তাড়াহুড়ো করা স্বভাব সব ব্যাপারেই। তড়বড় করে মন্তব্য প্রকাশও করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রাজীবলোচন সে সুযোগ দিলে না। বললে, শেষ সম্ভাবনাটা আদৌ সম্ভব কিনা জানবার আগে দু-একটা বিষয় জানা দরকার। স্যার প্রদ্যুম্নর সেক্রেটারি আপনি। এই দু-একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করতে পারবেন শুধু আপনিই।
বিষয়গুলো কী যদি জানতে পারি–
ওঁর প্রপার্টি।
প্রপার্টি?
হ্যাঁ। ওঁর বিরাট সম্পত্তিটা দিয়ে যাচ্ছেন কাকে কাকে? সম্পত্তির পরিমাণটা কত? উইল নিশ্চয় একটা আছে। কী লেখা আছে, সেক্রেটারির জানা থাকতে পারে। জানেন কী?
যে ধরনের প্রাইভেট সেক্রেটারি হলে এই বিষয়টা অন্তত জানা যায়, সেই ধরনের প্রাইভেট সেক্রেটারি আমি নই।
বটে।
কিন্তু যাদের জানা আছে, তাদের নামটা জানি।
তারা কারা?
মেসার্স লাহিড়ী, মুখার্জি অ্যান্ড ব্যানার্জি কোম্পানি। গুরু নিবাস রোডে এঁদের অফিস। স্যার প্রদ্যুম্নর ইনকাম ট্যাক্স থেকে আরম্ভ করে বিষয়-সম্পত্তির দেখাশুনা করা সমস্ত করেন এঁরা।
সলিসিটর কোম্পানি?
হ্যাঁ। উইলের খবর এঁরাই জানেন নিশ্চয়।
ঠিক বলেছেন। উইল বাড়িতে রাখা সমীচীন নয়। সলিসিটরদের জিম্মাতেই থাকে। তাহলে ওঁদের ওখানে টু মারা যাক!
এখুনি। বিপুল ব্যানার্জির আর তর সইছে না।
কিন্তু রাজীবলোচন লোকটা যেন কী! উইলের পেছনে সঙ্গে-সঙ্গে দৌড়নোর কোনও অভিপ্রায় আছে বলে মনেই হল না। নিরেট বপু আর নির্ভাষ চাহনি নিয়ে বসে রইল চুপচাপ।
বিপুল ব্যানার্জি কিন্তু আর সামলাতে পারছে না নিজেকে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল চেয়ার ছেড়ে। সবেগে দু-পাক ঘুরে এল ঘরময়। উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যেন একটা চাপা আগ্নেয়গিরি। ফেটে পড়ল বলে।
এবং ফেটেও গেল পুরো দুটো মিনিট যেতে না যেতেই।
প্রশ্নটা ঠিকরে বেরিয়ে এল লাভা উদগীরণের মতোই, রাজীবলোচনবাবু, স্যার প্রদ্যুম্নর ডেডবডিটা এখন কোথায়?
ডক্টর তলাপাত্র তলিয়ে দেখছেন।
মানে?
মানে, এগজামিন করছেন। মৃত্যুর কারণ খুঁজছেন।
কোথায় দেখছেন? মানে, বডিটা এখন কোথায়?
স্রেফ পাথরের মূর্তির মতোই চেয়ে থেকে রাজীবলোচন বললে, থানায়।
রিপোর্ট রেডি হতে কত দেরি?
ঘণ্টাখানেক তো লাগবেই।
অসম্ভব।
কী অসম্ভব?
এত তাড়াতাড়ি এ ধরনের রিপোর্ট লেখা যায় না। হাপিত্যেশ করে বসে না থেকে চলুন সলিসিটর কোম্পানিতে যাওয়া যাক। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।
রাজীবলোচনের পাথর-চাহনি দেখে পরমুহূর্তেই কিন্তু থিতিয়ে গেল বিপুল ব্যানার্জি। সুর পালটে নিল চক্ষের নিমেষে। ইনসপেক্টরের ধীর-স্থির ভাবভঙ্গি তাকে যে বিলক্ষণ অপ্রস্তুত করেছে, তা প্রকট হল চোখে-মুখে।
বিপুল ব্যানার্জি যতখানি অস্থির উইল-বৃত্তান্ত জানতে, ঠিক সেই পরিমাণে প্রশান্ত রাজীবলোচন উইলের বৃত্তান্ত না জানতে। অথবা বলা যায়, জানতে সে চায় ঠিকই কিন্তু যথাসময়ে–এত হুটোপাটি করতে রাজি নয়।
তাই সুর বদলাতে হল বিপুল ব্যানার্জিকে। রাজীবলোচনের নিরেট বদনের দিকে চেয়ে আমতা আমতা করে বললে ওভার-স্মার্ট বিপুল ব্যানার্জি, ব্যাপারটা..মানে, ঠিক বোঝাতে পারছি না– ইয়ে..স্যার প্রদ্যুম্নর মেয়ের কথা বলছি…তার কথাটাও একটু ভাবা দরকার…এত বড় একটা শক..বুঝতেই পারছেন…
