ভাষার স্থপতি তুমি নও। গল্প-উপন্যাসের যে বিষয়বস্তু তুমি নির্বাচন করেছ, সেখানে এই স্থাপত্য দেখানোর সুযোগও নেই। ভাষার স্পন্দমায়া তাই তোমার লেখায় কখনো ফুটে ওঠেনি। ভাষাশিল্পের সুরম্য শিবিরে আবদ্ধ হয়ে থাকাটাও তোমার লক্ষ্যমাত্রা নয়। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াটাই আমার নেশা, অঘটনের মধ্যে মিশে যাওয়াটাই আমার আনন্দ। তুমি তোমার সরল ভাষার দীপাধার নিয়ে আমার এই নেশা আর আনন্দকেই উদ্ভাসিত করেছ দশজনের সামনে। তোমার গল্পে আমি কখনো হয়েছি রঙমহলের রাজা, কখনো দেখিয়েছ আমার হিরণ হাসির কিরণ। কিন্তু কখনো ভাবোনি, আমার কুটিল হাসিও ঘটিয়ে তোলে জটিল সর্বনাশ। তুমি রুদ্রের ডম্বরধ্বনি শুনিয়েছ তোমার পাঠকপাঠিকাদের, কিন্তু তার জীবনের স্কুল মিথ্যার খেলাকে কখনো ধরতেও পারো নি। তুমি লিখেছ তার শান দেওয়া খর খঙ্গসম ললাটে বুদ্ধি দিচ্ছে পাহারা, কিন্তু শান দেওয়া প্রতারণার ছুরিটা তোমার নজর এড়িয়ে গেছে। তুমি দেখেছ তার তীক্ষ্ণ সজাগ আঁখি, দেখেছ কটাক্ষে তার ধরা পড়ে কোথায় কার ফাঁকি–কিন্তু দেখোনি তার নেশাভ্রান্ত চরিত্রের ঝড়ের কলোগ্লাস, বিদ্যুতের অট্টহাস। তুমি দেখছে। তার উড়োপাখির ডানার মতো যুগল কালো ভুরু, কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছ, কি তীব্র তার হাস্য?
মৃগাঙ্ক, আমিই সেই ইন্দ্রনাথ রুদ্র। তোমার কপট প্রতারক প্রবঞ্চক বন্ধু ইন্দ্রনাথ রুদ্র। আমাকে তুমিও ধরতে পারোনি। ঘরে ঘরে সর্বনাশের বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে আজ আমি ক্লান্ত, অনুতপ্ত, বিমর্ষ। আমার চোখ খুলে দিয়েছে একটি মেয়ে। ছোট্ট একটি মেয়ে।
অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হয়ে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে মনে হত, আমিও বুঝি কারো শাপে পাষাণ হয়ে পড়ে আছি জীবনের সুবিস্তীর্ণ প্রান্তর বক্ষের ওপর দিয়ে। আমার শাপান্ত ঘটিয়েছে বোধহয় এই মেয়েটিই। আমার মনের কঠিন শুষ্ক শয্যার ওপর একটি মাত্র কচি স্নিগ্ধ শ্যামল ঘাস বলা যায় এই মেয়েটিকে। নামটিও তার মিষ্টি–শ্রাবণী। নীলবর্ণের বনফুল সেন।
শ্রাবণীকে কিছুদিন হল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলাম আমার ঘরদোর মোছা আর বাসন মাজার কাজে। স্বপাকে আহার এখনো করি–বরাবরের অভ্যেস। ওই কাজটি কারও হাতে তুলে দিতে মন চায় না। প্রেশারকুকারে বেশিক্ষণ সময়ও লাগে না। কিন্তু ঘরদোর বাসনপত্র পরিষ্কার রাখতে ইদানীং বড়ই আলস্যবোধ করছিলাম।
মাসান্তে মাত্র পনেরো টাকা বেতনের বিনিময়ে শ্রাবণী আমাকে এই ঝাট থেকে মুক্তি দিয়েছে। খুবই গরিব। মাথার চুলে কোনওদিন তেলের ছোঁয়া লাগে বলে মনে হয় না। রুখু লালচে চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে রাখে। একটাই লাল ফ্রক রোজ পরে। রোজ ভোর পাঁচটায় আসে। আমি ঘুম থেকে উঠি কাক ডাকবারও আগে–বেড়িয়ে ফিরি কাক ডাকবার সময়ে। শ্রাবণী আসে তারপর। রোজ শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়িয়ে আনে। প্লেটে করে সাজিয়ে রাখে টেবিলে। ডালশুদ্ধ ফুল এনে রাখে ফুলদানিতে। জল পাল্টে দেয় নিজেই। আমাকে কিছু বলতে হয় না।
একদিন সে যাবার সময়ে বলে গেল, কাকু, আজ বিকেলে আসতে একটু দেরি হবে।
রোজ বিকেলে শ্রাবণী আসত চারটে বাজলেই–সেদিন এল ছটায়। ঘর মুছতে মুছতে হাসি হাসি মুখে নিজেই বললে, দাদার কাছে গেছিলুম, কাকু। দাদা বললে, আজকে থেকে যা। তোমার কষ্ট হবে বলে চলে এলুম।
আমি বললাম, বেশ করেছিস। দাদার কাছে গেছিলিস কেন? বেড়াতে?
না। টাকা আনতে।
টাকা আনতে কেন?
পাঁচ-ছদিন খাওয়া হয়নি যে।
সে কী! পাঁচ-ছদিন খাসনি?
না।
টাকা পেয়েছিস?
না।
আজ তাহলে খাবি কী?
হাসল শ্রাবণী। ঘর মুছতে লাগল মাথা নীচু করে।
আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, আমাকে বলিসনি কেন? না খেয়ে থাকতে কষ্ট হয় না?
শ্রাবণী কথা বলল না।
আমি মানিব্যাগ খুলে দশটা টাকা দিয়ে বললাম, আবার দরকার হলে বলবি।
শ্রাবণী আর বলে নি। দাদার কাছ থেকেই নাকি টাকা এনেছিল। চার-পাঁচটা ছোট ভাইবোন আর মাকে নিয়ে কখনো একবেলা কখনো দু-বেলাই না খেয়ে থেকেছে। দাদা সেই কারণেই একা থাকে। বাবা নেই। শ্রাবণীর বয়স বড়জোর বারো।
এর দিন কয়েক পরেই ট্যাক্সি ড্রাইভার বলবন্ত সিং খুন হল আমাদের পাড়াতেই। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে–নোংরা জলের নালার একটু দূরে।
বেলেঘাটা সি-আই-টি বিল্ডিংস তুমি দেখছ। বাইপাসটা গেছে তার গা ঘেঁষে। কিছুদিন আগেও এই বিল্ডিং ছিল কলকাতার পুব অঞ্চলের শেষপ্রান্ত–তারপরেই চব্বিশ পরগনা। ধু-ধু মাঠ আর ভেড়ি। এখন সেখানে সল্ট লেক স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে, ফ্ল্যাটবাড়ির পর ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে। চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সাপের মতো ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস এই দুইয়ের মাঝ দিয়ে যেন জড়শয়নে শুয়ে রয়েছে। স্থির, অবিচল, ধুলোয় লুণ্ঠিত। রাত্রিদিন তার ওপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে যাচ্ছে। চাকা, হেঁটে যাচ্ছে চরণ। অহর্নিশ দুঃস্বপ্নের মতো বিচিত্র শব্দ আবর্তিত হয়েই চলেছে। চরণের আর চাকার স্পর্শে হৃদয় পাঠ করার বিদ্যে যদি এই মহাপথের জানা থাকত, তাহলে বলতে পারত কে বাড়ি যাচ্ছে, কে এয়ারপোর্টে যাচ্ছে, কে দক্ষিণের বালিগঞ্জ-পার্কসার্কাসে যাচ্ছে, কে জিরোতে যাচ্ছে, কে শ্মশানে যাচ্ছে। জানে না বলেই ধরতে পারেনি গভীর রাতে বলবন্ত সিং ট্যাক্সি চালিয়ে এসেছিল তার বুকের ওপর দিয়ে নিয়তির নির্দেশে দেহপিঞ্জর ত্যাগের লিখনকে সত্য করে তুলতে।
