অলিম্পিয়া মৃদুস্বরে শুধু বললে, পীতাম্বর যাঁর সেনাপতি, তিনি নিজেও লম্পঝম্প করতে জানেন না, চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করতে জানেন না।
ওটা কথার কথা। ঝটিতি বললে প্রমীলা পিসি, যা বলতে চাই, তা হল…তা হল–পীতাম্বর ঝলমলে চকচকে নয় মোটেই
ছাতলা-পড়া সোনা কি ঝকমকে চকমকে হয়?
টগবগে খলবলও যদি হত—
সে তো পাগলা ঘোড়ারাই হয়।
তুই থাম। কিছুতেই বলতে দিচ্ছিস না যা বলতে চাই।
তুমি তো পীতাম্বরের কথাই বলছ।
একদম না। বললেই হল? আমি ওই বিপুল ব্যানার্জির কথা বলছি। খাসা ছোকরা। টগবগে তেজি ঘোড়া, ঝকঝকে হিরের টুকরো।
পরমুহূর্তেই অলিম্পিয়ার সেই আশ্চর্য হাসি সপ্তসুরে জাগ্রত হল কণ্ঠে। এ সুরের তুলনা হয় না–এ হাসি হাসতে পারে, এমন মানুষ দুনিয়ায় আর দুটি নেই। চোখের তারায়, মুখের প্রতিটি পেশিতে হাসি বন্যার মতো ধেয়ে গেল চক্ষের নিমেষে।
ঘোড়ার মতো লাফ দেওয়া আর হিরের মতো চকচক করার গুপ্তবিদ্যেটা বিপুলবাবু অন্যসব বিষয়ের মতোই শিখে নিতে পারেন পলকের মধ্যে। কৌশল রপ্ত করতে তার জুড়ি নেই।
পিসির মুখের রং পালটে যাচ্ছে দেখে আশ্চর্য হাসিটাকে পত্রপাঠ মনের কন্দরে নিক্ষেপ করে সহজ হয়ে গেল অলিম্পিয়া।
বললে উদাস-উদাস গলায়, সত্যিই তো, বিপুলবাবু এখনও এসে পৌঁছলেন না কেন?
গোল্লায় যাক বিপুলবাবু। বলে গাত্রোত্থান করল প্রমীলা পিসি–জানলা দিয়ে চেয়ে রইল বাইরে।
গোধূলির ধূসর রং আর ধূসর নেই। চাঁদের আলোয় ধরার ধূসর রং এখন প্রায় সাদাটে বললেই চলে। সমুদ্রের ধার বরাবর যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকেই এই আশ্চর্য রহস্য-থমথমে আলো ছড়িয়ে পড়ছে একটু-একটু করে। বহুদূরে দেখা যাচ্ছে তীরের ভেতর দিকে একটা পুকুরপুকুর ঘিরে তেড়াবাঁকা গাছের জটলা। তারও ওপাশে সৈকতভূমিতে প্রায় গা ঘেঁষে একটা শ্রীহীন দীনহীন চেহারার টিনের চালাঘর। এ অঞ্চলের চা-পানের একমাত্র আড্ডাখানা। নামটা বিচিত্র। সবুজ মানুষ।
হ্যাঁ। চায়ের দোকানের নাম সবুজ মানুষ। কেন যে দোকানের এহেন নামকরণ করেছে কৃষ্ণকায় দোকানদার হরিহর–তা শুধু হরিহরই জানে। গায়ের রং তার কালো জামরুলের মতোই ঘোর কালো। কিন্তু সবুজ রঙের ওপর তার অহেতুক প্রীতি-রহস্য সমাধান করার জন্যে যখন এ কাহিনির অবতারণা করা হয়নি, তখন বিচিত্র নাম নিয়ে অযথা গবেষণা করার আর দরকার নেই।
সাদাটে চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে সবুজ মানুষ চায়ের দোকান পর্যন্ত। জীবন্ত কোনও প্রাণী নেই কোথাও। একটু আগেই গোধূলির আলোয় এই অঞ্চলেই কিন্তু হেঁটে গেছিল নতমুখ স্যার প্রদ্যুম্ন আর নৃত্যপর পীতাম্বর। কিন্তু কেউ তাদের দেখেনি। দেখেছিল শুধু একজন। বিপুল ব্যানার্জি। তাকেও কেউ দেখেনি।
রাত গম্ভীর হল। মাঝরাত পার করে দিয়ে আবির্ভূত হল বিপুল ব্যানার্জি। অতিশয় বিপুল বেগে এবং বিষম চেঁচিয়ে ঘুম-ঘর থেকে টেনে আনল বাড়ির প্রত্যেককে। প্রেতের মতো ফ্যাকাশে মুখ বিপুল ব্যানার্জির। আরও ফ্যাকাশে লাগছে পুলিশ ইনসপেক্টরের ভাবলেশহীন নিরেট মুখ এবং অবয়বের পাশাপাশি থাকায়। কিন্তু ভাবলেশহীন থাকার বহু চেষ্টা সত্ত্বেও ভাবলেশহীন থাকতে পারেনি আরক্ষাবাহিনীর এই অফিসারটি। মনে হয়েছিল যেন নির্বিকার একটা মুখোশ পরে প্রাণপণে চেপে রাখতে চাইছে ভেতরকার আবেগকে। প্রমীলা পিসি আর অলিম্পিয়ার সামনে যথাসম্ভব রেখে-ঢেকে খবরটা হাজির করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা চক্ষের নিমেষে যেন হাওয়ায় ভর করে ছড়িয়ে গিয়েছিল বাড়িময়।
বড় ভয়ঙ্কর সংবাদ বহন করে এনেছে নিশীথ রাতের এই দুটি পুরুষ। অনেক চেষ্টার পর অবশেষে পাওয়া গেছে স্যার প্রদ্যুম্নর দেহ। শুধু দেহ। প্রাণহীন দেহ। গাছ-ঘেরা পুকুরে জাল ফেলে পচা পাঁক আর কাদার মধ্যে টেনে তোলা হয়েছে সেই দেহ।
জলে ডুবে মারা গেছেন স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিক।
.
বিপুল ব্যানার্জিকে যারা চেনে এবং জানে, তারা নিশ্চয় আঁচ করে নিয়েছে মহা তৎপর এই মানুষটি রাতের উদ্বেগ উত্তেজনা বেমালুম ঝেড়ে ফেলবে সকাল হতে-না-হতেই। কার্যক্ষেত্রেও দেখা গেল তাই। গতরাতের উদভ্রান্ত বিপুল ব্যানার্জি এখন রীতিমতো প্র্যাকটিক্যাল। তড়িঘড়ি হাজির হয়েছে ইনসপেক্টর রাজীবলোচনের কাছে। গতরাতে এই রাজীবলোচনের সঙ্গেই পথে দেখা হয়ে গিয়েছিল বিপুল ব্যানার্জির। সবুজ মানুষ চায়ের দোকানের ঠিক পাশটিতে। সকাল হতেই ইনসপেক্টরকে নিরালা একটা ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রশ্নে-প্রশ্নে নাস্তানাবুদ করে তুলল বিপুল ব্যানার্জি–যেন জেরা করার অধিকারটা আছে শুধু তারই রাজীবলোচনের নয়।
রাজীবলোচন লোকটিও বড় কম যায় না। শুধু বাইরেটা নয়, ভেতরটাও যেন আস্ত গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি। একেবারে নিরেট। হয় নিরেট বোকা, না হয় দারুণ ধূর্ত। তাই এইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা গরম করবার পাত্র নয় মোটেই।
অচিরেই দেখা গেল, রাজীবলোচনের চেহারা আর চাউনি যতই বোকা-বোকা হোক না কেন, ভেতরে-ভেতরে সে নিদারুণ সেয়ানা। বিপুল ব্যানার্জিকে সব প্রশ্নেরই জবাব দিয়ে গেল বেশ ওজন করে করে। খামতি বা ঝুঁকতি নেই কোনও জবাবেই।
প্রশ্নগুলো এল ঝড়ের বেগে, কিন্তু জবাবগুলো গেল গদাই লস্করি চালে রীতিমত যুক্তিতে ঠাসা অবস্থায়।
