কিন্তু একী! বাড়ি ফেরার পথ ধরে স্যার প্রদ্যুম্নকে তো বাড়ি ফিরতে দেখা গেল না। কোথায় গেলেন তিনি?
তার চাইতেও আশ্চর্য ব্যাপারটা দেখা গেল কিন্তু এর পরেই।
বাড়ি অভিমুখে রওনা হল না বিপুল ব্যানার্জিও।
গেল কোথায়, তা জানে শুধু বিপুল ব্যানার্জিই। বাড়ি ফিরেছিল ঠিকই–বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে। বিপুল রহস্য এবং ভয়ানক উত্তেজনার সঞ্চার ঘটিয়ে বসিয়েছিল মল্লিকভবনের প্রতিটি প্রাণীর অন্তরে দীর্ঘ অনুপস্থিতির দরুন।
বিরাট বিরাট থাম আর পামবৃক্ষ সুশোভিত প্রাসাদে অধীর হয়ে উঠেছিল প্রত্যেকেই। এত দেরি হচ্ছে কেন? সাগ্রহ প্রতীক্ষার পরিশেষে উপস্থিত হল নিদারুণ অস্বস্তি। সবচেয়ে বেশি ছটফট করতে দেখা গেল খাসভৃত্য কদমচাঁদকে। বিপুলকায় এই জীবটি স্বভাবে অতিশয় শান্ত, অস্থিরতা বস্তুটা ধাতে নেই মোটেই। কথা বলে খুব কম–অস্বাভাবিক নীরবতাই তার চরিত্রের বৃহত্তম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এহেন শান্তশিষ্ট নির্মূপ প্রকৃতির জীবটিই মুহুর্মুহু গবাক্ষপথে দৃষ্টিচালনা করতে থাকে সমুদ্রসৈকতের ওপর দীর্ঘ বাঁকা সাদা পথটির দিকে সবেগে পদচারণা করতে থাকে সামনের বড় হলঘরটিতে।
স্যার প্রদ্যুম্নর প্রাণপ্রিয় ভগ্নী প্রমীলার চিত্তও চঞ্চল হয়েছে বিলক্ষণ। খেয়ালি ভাই যাত্রা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বারোমাস। এত বড় বাড়ি আর সংসারের যাবতীয় ঝঞ্জাট পোহাতে হয় তাকেই। নামটা তার প্রমীলা-আকৃতিতেও রাবণপুত্র মেঘনাদের পত্নী প্রমীলার মতোই। বিবাহ নামক শুভকার্যটি ললাটে লেখা ছিল না সেই কারণেই। ভাইয়ের মতই তার নাসিকা প্রত্যঙ্গটি অবিকল খাঁড়ার মতোই শাণিত এবং কোপ মারার ভঙ্গিমায় উদ্যত। শুধু এই খাঁড়া নাকের মহিমাতেই জবরদস্ত এই মহিলাটিকে ভয় পায় এ তল্লাটের কাক-চিল পর্যন্ত। এই পৃথিবীর সব্বাই জানে, মেয়েরা জিহ্বা চালনায় এবং অবিরল কথা বলে যাওয়ায় টেক্কা মারতে পারে যে-কোনও বচনবাগীশ পুরুষকে। প্রমীলা হার মানিয়ে দেয় দুনিয়ার সব মেয়েছেলেকে। মুখে কথার তুবড়ি ফোটে অনর্গল বিরাম নেই এক মুহূর্তের জন্যেও। ঘ্যানোর-ঘ্যানোর করা নয় কিন্তু। কানের পোকা বার করে দেওয়ার মতো আতীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর মাঝে-মধ্যে যখন কাকাতুয়ার তীব্র ডাকের মতো প্রচণ্ড হয়ে ওঠে, তখন কাক-চিল পর্যন্ত উড়ে পালায় মল্লিকবাড়ির ত্রিসীমানা ছেড়ে।
স্যার প্রদ্যুম্নর প্রাণাধিকা কন্যা অলিম্পিয়া কিন্তু একেবারেই বিপরীত প্রকৃতির। পিসির মতো ডাকসাইটে তো নয়ই, আকৃতিতেও মেঘনাদ-পত্নীর মতো নয়। রঙটা একটু ময়লা বটে, কিন্তু আয়ত দুই চোখে অষ্টপ্রহর স্বপ্ন যেন লেগেই আছে। চেঁচিয়েমেচিয়ে পিসি বাড়ি মাতিয়ে রাখে বলেই বোধ হয় তার আর চেঁচানো তো দূরের কথা, টু শব্দটিও করার দরকার হয় না। চোখেমুখে মাখানো অদ্ভুত বিষাদ। কেন, তা জানা নেই এই কাহিনিকারের। এহেন ভাইঝির সঙ্গে তাই একাই তড়বড় করে কথা বলে যেতে হয় খান্ডারনি পিসিকে এবং বিন্দুমাত্র অনিচ্ছা প্রকাশ পায় না অনর্গল কথা বলার সময়ে। কানে তো আর তুলো গুঁজে রাখা যায় না, তাই চুপচাপ সব শুনে যায় অলিম্পিয়া। মাঝে-মাঝে কিন্তু এমন প্রাণখোলা হাসি হেসে ওঠে, যা শুনলে এবং দেখলে থমকে যায় উড়ন্ত কাক-চিলও। হাসিটি বড় মিষ্টি, বড় সুরেলা, বড় ঝঙ্কারময়। অলিম্পিয়ার ভেতরটা যে সঙ্গীতময় এবং প্রাণময়তার প্রকাশ ঘটে চকিতের জন্যে অপূর্ব ওই হাস্যধ্বনির মধ্যে।
আড়িপাতা যাক এবার পিসি-ভাইঝির কথোপকথনে।
পিসি বলছে, এতক্ষণে তো এসে যাওয়া উচিত ছিল দুজনের।
ভাইঝি উদাস চোখে তাকিয়ে রইল সমুদ্রের দিকে।
খরখরে চোখে সেদিকে (মানে যুগপৎ ভাইঝি এবং সমুদ্রের দিকে) তাকিয়ে নিয়ে পিসি বললে, চিঠি দিতে এসে পিয়ন কিন্তু দিব্যি গেলে বললে, দাদাকে আসতে দেখেছে সমুদ্রের তীর বেয়ে। পেছনে ছিল সেই ভয়ানক জীবটা।
ভয়ানক জীব? চোখ না ফিরিয়েই বলে অলিম্পিয়া।
পীতাম্বর! পীতাম্বর! কেন যে সবাই ওকে সেনাপতি পীতাম্বর বলে, ভেবে পাই না।
ক্ষণেকের জন্যে অলিম্পিয়ার বিষাদ-কালো দুই চোখে কৌতুকের বিদ্যুৎ খেলে যায়, সেনাপতি বলেই বোধ হয় সেনাপতি বলে। রাজাকে রক্ষে করাই যার কাজ, তার নামই হয় সেনাপতি।
ওরকম বিতিকিচ্ছিরি লোককে ল্যাজে বেঁধে কোথাও নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয়? চাকরি খেয়ে দিলেই ল্যাটা চুকে যায়।
দাদাকে বিষম ভালোবাসে প্রমীলা। কিন্তু লোক চেনার ব্যাপারে দাদার ওপর তিলমাত্র আস্থা তার নেই। এই একটি বিষয়ে সে সর্বেসর্বাই থাকতে চায়। কিন্তু দাদাটা যেন কী! যত্তো সব আপদদের জুটিয়েছে চারপাশে।
পীতাম্বর মুখচোরা বলেই গায়ে পড়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারে না–বিশেষ করে মহিলাদের সঙ্গে। শেষ কথাটা বলার সময়ে অলিম্পিয়া আয়ত নেত্রপাত করলে প্রমীলা পিসির দিকে, কিন্তু তার মানেই এই নয় যে সে লোক খারাপ, সেনাপতি হওয়ার অযোগ্য এবং ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার পক্ষে যোগ্যতম পুরুষ।
প্রমীলার কণ্ঠে এবার জাগ্রত হল সেই বিখ্যাত কাকাতুয়ানিনাদ, সেনাপতি! সেনাপতি কাকে বলে জানিস? আমি জানি। অ্যাত্তটুকু বয়স থেকে কত সেনাপতি দেখেছি, সবই অবশ্য যাত্রার সেনাপতি! সেনাপতিদের সবসময়ে লম্পঝম্প করতে হয়, চেঁচিয়ে আকাশ ফাটাতে হয়, চেঁচিয়ে আকাশ ফাটাতে হয়–
