চক্ষুভ্রম কেটে যায় মুহূর্তের মধ্যে। পরমুহূর্তেই চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বিপুল ব্যানার্জি যা দেখল তা অস্বাভাবিক হতে পারে, অবিশ্বাস্য নয় মোটেই। একটি মূর্তি রয়েছে আরেকটি মূর্তির পেছনে–প্রায় পনেরো গজ পেছনে। দুজনকেই দেখে মনে হচ্ছে যেন–রাজবেশ আর সেনাপতির বেশ পরে নেমে এসেছে দুটি মানুষ সমুদ্র অভিযান সাঙ্গ করে। ঝলমলে পোশাকের জরি আর ঝালর, উষ্ণীষের মণি আর তরবারির সুদৃশ্য কোষ দূর থেকেও আর ততটা অস্পষ্ট মনে হচ্ছে না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এহেন বেশ পরে যাত্রাদলে অভিনয় চলে, মঞ্চে বীরদর্পে হাঁটা যায়, নিরালা সমুদ্রতীরে কেউ এভাবে হাওয়া খেতে আসে না। সামনের মূর্তিটি হনহন করে হাঁটছে, আপনমনে, খেয়ালই নেই যে পেছনে আসছে আর একজন। প্রথম ব্যক্তির খাড়া নাক আর ছুঁচলো দাড়ি দেখেই কিন্তু চিনতে পেরেছে বিপুল ব্যানার্জি। স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিক–তার মনিব। পেছন-পেছন যে আসছে, তাকে সে চেনে না। কিন্তু যাত্রাপার্টির অভিনেতাদের মতো এই যে কুচকাওয়াজ, এর অর্থ অস্পষ্ট নয় তার কাছে। স্যার প্রদ্যুম্ন যাত্রা-পাগল মানুষ। বছরের বেশির ভাগ সময় নিজস্ব বজরায় যাত্রার সরঞ্জাম আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যাত্রা দেখিয়ে বেড়ান এমন-এমন জায়গায়, যেখানে শহরের কোনও যাত্রাপার্টির পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় কোনওমতেই। যাত্ৰাই তার প্রাণ, যাত্ৰাই তার জীবন। শখের পার্টি নিয়ে জলবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে গিয়ে প্রমোদ বিতরণ করে যতটা আনন্দ দেন, তার শতগুণ আনন্দ পান নিজে। সেই বজরা যে ফেরার পথে, এ খবর রাখে বিপুল ব্যানার্জি। ছ-মাস পরে বাড়ি ফিরছেন স্যার প্রদ্যুম্ন। বজরা রেখে এসেছেন নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও। পরনে তাই যাত্রার রাজবেশ। কিন্তু বজরা থেকে রাজবেশ পরে তিনি নেমে এলেন কেন, এই রহস্যটা রহস্যই রয়ে গেল বিপুল ব্যানার্জির মস্তিষ্কে। মিনিট পাঁচেক তো লাগত ধড়াচূড়া পালটাতে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলেই পারতেন। রহস্যটা তাই জটিল ধাঁধার আবর্ত রচনা করে গেল সেক্রেটারি মশায়ের মগজের কোষে-কোষে। স্যার প্রদ্যুম্নর অভ্যেস সে জানে। কোথায় কী ধরনের পোশাক পরতে হয়, কখন কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়–স্যার অন্তত তা ভালো করেই জানেন। রহস্যটা তাই বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে জবর রহস্য থেকে গেছিল রহস্যময় এই ব্যাপারের সবচেয়ে বড় রহস্যের আকারে। ধূসর গোধূলি, ঘনায়মান আঁধার আর চলমান ওই দুটি নিঃশব্দ মূর্তি যেন যাত্রাপার্টিরই একটি নাটকের অংশবিশেষ।
প্রথম ব্যক্তির চেয়েও অনেক বেশি অসাধারণ দ্বিতীয় ব্যক্তি। পরনে যদিও সেনাপতির পরিচ্ছদ–কিন্তু চেহারা অতি অসাধারণ, তার চেয়েও অসাধারণ তার আচরণ। হাঁটছে অদ্ভুতরকম এলোমেলোভাবে–অস্বস্তি যেন ঠিকরে-ঠিকরে পড়ছে প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি অঙ্গসঞ্চালনে। কখনও হাঁটছে দ্রুতচরণে, কখনও মন্থর গতিতে। স্যার প্রদ্যুম্নর নাগাল ধরে ফেলা উচিত হবে কিনা, যেন ভেবে ঠিক করে উঠতে পারছে না কিছুতেই। স্যার প্রদ্যুম্ন কানে কম শোনেন বলেই বোধ হয় পেছনে বালির ওপর পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না। যদি শুনতে পেতেন এবং যদি ডিটেকটিভগিরি জানতেন, তাহলে শুধু পদশব্দ শ্রবণ করেই আঁচ করে নিতে পারতেন পায়ের মালিক কখনও খুঁড়োচ্ছে, কখনও নাচছে, এবং এই দুইয়ের মাঝখানে আরও প্রায় বিশ রকমের ভঙ্গিমায় পেছন-পেছন আসছে। লোকটার মুখ আঁধারে ভালো করে দেখা না গেলেও চকিত চাহনির ঝলক দেখতে পাচ্ছে বিপুল ব্যানার্জি নিরতিশয় উত্তেজনা যেন অদৃশ্য রশ্মি আকারে বিচ্ছুরিত হচ্ছে মুহুর্মুহু চঞ্চল দুই অক্ষিতারকা থেকে। একবার সে পাইপই করে দৌড়তে গিয়েও সামলে নিল পরক্ষণেই মন্থরচরণে পা ফেলে গেল অন্যমনস্কভাবে। তারপরেই যে কাণ্ডটি করে বসল, তা কোনও যাত্রাদলের অভিনেতার কাছে অন্তত আশা করেনি বিপুল ব্যানার্জি বিশেষ করে নিরালা এই সমুদ্রসৈকতে।
লোকটা খাপ থেকে টেনে বার করল তরবারি।
নাটকের এই নাটকীয় মুহূর্তে ক্লাইম্যাক্স যখন ফেটে পড়তে চলেছে, ঠিক তখনি চলমান মূর্তিদুটি অন্তর্হিত হল সৈকতভূমির একটা টিলার আড়ালে। ক্ষণেকের জন্যে বিস্ফারিত চক্ষু সেক্রেটারি শুধু দেখলে অবহেলাভরে বেগে তরবারি চালনা করে একটা সামুদ্রিক উদ্ভিদের শিরচ্ছেদ করল বিচিত্ৰবেশী আগন্তুক। ভাবসাব দেখে মনে হল যেন প্রথম ব্যক্তিটিকে কচুকাটা করতে পারার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় বিষম আক্রোশে ঝাল ঝাড়ল নিরীহ উদ্ভিদটার ওপরেই।
কিন্তু ভয়ানক চিন্তাকুটিল হয়ে উঠল মিস্টার বিপুল ব্যানার্জির বদনমণ্ডল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সৈকতভূমিতে ঘনায়মান চিন্তার মেঘে আচ্ছন্ন দুই চোখ মেলে।
তারপর গম্ভীরবদনে মন্থরচরণে অগ্রসর হল রাস্তার দিকে। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে রাস্তা বেঁকে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত–স্যার প্রদ্যুম্নর বিশাল প্রাসাদের পাশ দিয়ে গেছে এই সড়ক আরও কিছু দুরে।
সমুদ্রতীর থেকে প্রাসাদে পৌঁছতে গেলে স্যার প্রদ্যুম্নকে আসতে হবে এইপথ ধরেই। দূর থেকে সেক্রেটারি তার হাঁটার ধরন দেখে আন্দাজে তাই রওনা হল সেইদিকেই। নিশ্চয় বাড়ির দিকেই চলেছেন স্যার প্রদ্যুম্ন। অচিরে আবির্ভূত হবেন বাঁকা সড়কে। পথটির প্রথম অংশ বালিতে ঢাকা– যেহেতু সৈকত বরাবর গিয়েছে। তারপর বালি শক্ত হয়েছে আরও কিছুদূর এগিয়ে–অনতিদূরে দেখা যাচ্ছে মল্লিকভবন। প্রথমে মন্থরচরণে, তারপর দ্রুত পদক্ষেপে, অবশেষে নক্ষত্রবেগে নিরেট বালি দিয়ে তৈরি এই পথের দিকেই ধেয়ে গেল বিপুল ব্যানার্জি। গড়িমসি করা তার ধাতে নেই, সবকিছুই করে তড়িঘড়ি–সফল জীবনের মন্ত্রগুপ্তি তো সেইটাই।
