কিন্তু মাটি খুঁড়ে কি উদ্ধার করা যেত না! হঠাৎ রাগেদুঃখে যেন কী বলবে ভেবে পায় না জরকেন্স।
মাটি খুঁড়ে কি উদ্ধার করা যেত না! নিশ্চয় যেত। কিন্তু শুরুতেই লাগত হাজার দুয়েক লোক। ঠিকমত আটঘাট বেঁধে কাজ করতে গেলে হাজার পঞ্চাশের কমে অবশ্য সম্ভব নয়–মজুরিও তো খুব সস্তা ওখানে হপ্তায় দশ শিলিংই যথেষ্ট ওদের পক্ষে। তাহলে গিয়ে প্রতি হপ্তায় যাচ্ছে পঁচিশ হাজার পাউন্ড। দশ হপ্তায় যদিও কাজ শেষ হত না–তবুও ফলাফলের মুখ দেখতে পেতাম খানিকটা। তাহলে শুধু মজুরিই যেত আড়াই লক্ষ পাউন্ড। সেই অনুপাতে টাকা লাগত ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে–আর প্রায় তত টাকাই যেত গাড়ির আয়োজনে। তারপর ছিল বাড়ি ঘর-দোর তৈরির খরচ; স্রেফ আদিম প্রথার কুঁড়ে বানালেই কাজ চলে যেত আমাদের। মোটমাট দশ লক্ষ পেলেই কাজ শুরু করা যেত। লন্ডন শহরে দশ লক্ষ পাউন্ড কি সোজা কথা হল? সবরকম চেষ্টাই করেছি। আমি; বকবক করেছি একনাগাড়ে ঘন্টার-পর-ঘণ্টা, যত পেরেছি মদ গিলিয়েছি। কিন্তু কেউই রাজি হল না দশ লক্ষ ঢালতে। হায়রে, লাভের হিসেবটা একবার ভাব তো! তুচ্ছ ওই দশ লক্ষ পাউন্ডের লাভ দাঁড়াত, শতকরা কোটি-কোটি পাউন্ড। কিন্তু রাজি হল না কেউই। শেষপর্যন্ত ওরা যে আসলে কী, তা ওদের মুখের ওপর বলে দিয়ে ছেড়ে দিলাম সব প্রচেষ্টা।
ওয়েটার! হাঁক দিল জরকেন্স। খুব ছোট্ট একটা হুইস্কি এনে দাও–আর সামান্য একটু সোডা ছিটিয়ে দিও তাতে।
আমাদের ক্লাবে খুব ছোট্ট হুইস্কি পাওয়া যায় না। ছোট্ট হুইস্কি অবশ্য আছে কিন্তু সব ওয়েটারই জানে জরকেন্সের কাছে ছোট্ট হুইস্কি কখনও না চলে না। * মাসিক রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত। (কার্তিক, ১৩৬৬)
সবুজ মানুষ
একমনে নিজের সঙ্গে গলফ খেলা প্র্যাকটিশ করে চলেছে এক যুবক সমুদ্রের ধারে বালুকা সৈকতের ওপর। গোধূলির ধূসর রঙের ছোঁয়া লেগেছে সমুদ্রে। কোনও স্ট্রোকের মধ্যেই হেলাফেলা নেই, আছে একাগ্র নিষ্ঠা, আণুবীক্ষণিক প্রচণ্ডতা। যেন নিখুঁত খুদে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে এক-একটা স্ট্রোক মারার সঙ্গে-সঙ্গে। চটপট অনেক খেলাই সে রপ্ত করেছে এই জীবনে; কিন্তু চটপট খেলা রপ্ত করে নেওয়ার প্রবণতা আছে বলেই যেসব খেলা চটপট শেখা যায় না, সেসবও রপ্ত করেছে খুবই তাড়াতাড়ি। অ্যাডভেঞ্চার জিনিসটাকে সে ভালোবাসে, অ্যাডভেঞ্চার-ঠাসা পরিবেশে থাকতে পারলে আর কিছুই চায় না। বর্তমানে সে স্যার প্রদ্যুম্ন মল্লিকের প্রাইভেট সেক্রেটারি। বালুকা-সৈকতের ঠিক পাশেই এই যে বিরাট উদ্যান, তার ঠিক পেছনেই স্যার প্রদ্যুম্নর বিশাল ইমারত। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। বলেই অনন্তকাল কারো প্রাইভেট সেক্রেটারি হয়ে থাকার অভিপ্রায় নেই যুবকটির। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানও আছে সেই সঙ্গে; তাই সে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বুঝেছে সেক্রেটারি জীবনটায় ছেদ টেনে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ পন্থা হল, নিষ্ঠার সঙ্গে সেক্রেটারিগিরি করে উত্তম সেক্রেটারিরূপে স্বীকৃতি পাওয়া। কার্যত সে তাই বটে। অতি উত্তম সেক্রেটারি। গলফ বলটিকে যেরকম ক্ষিপ্রতা সহকারে নিয়ে ফেলছে একদিক থেকে আর একদিকে, হুবহু সেই ক্ষিপ্রতা দিয়ে একাই জবাব দিয়ে যাচ্ছে স্যার প্রদ্যুম্নর নিত্য জমে যাওয়া চিঠির তাড়ার। চিঠির জবাব নিজের মর্জিমাফিক একাই দিয়ে যেতে হচ্ছে বর্তমানে। বলতে গেলে, একাই লড়ে যাচ্ছে পত্রবাহিনীর সঙ্গে। কারণ স্যার প্রদ্যুম্ন তাঁর বিলাস-তরণী নিয়ে জলে ভেসেছেন ছমাস আগে। ফেরার সময় হয়েছে–ফিরেও আসছেন–কিন্তু বেশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে সম্ভাবনা নেই। কয়েক ঘণ্টা কেন, কয়েক দিনও কেটে যেতে পারে। তারপর হয়ত ফিরবেন।
যুবকটির নাম বিপুল ব্যানার্জি। খেলোয়াড়ি পদক্ষেপে বালুকা সৈকতের গা-ঘেঁষে ঘাসজমিটুকু পেরিয়ে এসে দৃষ্টিচালনা করল সমুদ্রের দিকে। দেখল একটা অদ্ভুত দৃশ্য। সুস্পষ্ট দেখতে পেল না অবশ্য। ঝোড়ো মেঘের আড়ালে গোধূলির আলো মিলিয়ে যাচ্ছে একটু-একটু করে–ঘনীভূত হচ্ছে। তমিস্রা। কিন্তু পলকের জন্যে মনে হল যেন ইতিহাস-আশ্রিত একটি নাটক, অথবা একটা ভৌতিক নাটক স্বপ্নকারে অভিনীত হয়ে চলেছে অদূরে–মুহূর্তের মরীচিৎকার মতো যেন বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে এসেছে একটা দৃশ্য।
সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি তাম্রবর্ণ এবং সুবর্ণবর্ণ সুদীর্ঘ রেখাপাত করেছে কালচে সমুদ্রের ওপর। নীল সমুদ্র আর নীল নেই কৃষ্ণবর্ণ হয়ে এসেছে এর মধ্যেই অন্ধকারের এই পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে আরও অন্ধকারময় দুটি মূর্তিকে। যেন ঐতিহাসিক নাটকের দুটি চরিত্র। যেন মূকাভিনয় চলছে ঘনিয়ে আসা আঁধারের বুকে। একজনের মাথায় উষ্ণীষ–আরেকজনের কোমরে তরবারি। যাত্রাদলের দুটি চরিত্র যেন সহসা নেমে এসেছে ছায়াময় দেহ নিয়ে দারুময় কোনও জাহাজের মধ্যে থেকে।
মরীচিকা দর্শনের প্রবণতা নেই বিপুল ব্যানার্জির। ছায়াদৃশ্যও মরীচিকাসম নয় মোটেই। যুক্তিবুদ্ধি বৈজ্ঞানিক নিষ্ঠা নিয়ে যে-কোনও পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। অতীত অথবা ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে যে-কোনও দৃশ্যই ভেলকির মতো সহসা আবির্ভূত হলে মন দিয়ে যাচাই করে নিতে সে পারে। তাই বিচিত্র এই মূকাভিনয় দেখে মুহূর্তের মধ্যে উপনীত হল যে সিদ্ধান্তে উঁদে ভবিষ্যদ্বক্তাও অত তাড়াতাড়ি সে সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছতে পারত কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে বিলক্ষণ।
