কার্বন। শেষ যে কথা বলেছিল, সেই আবার উত্তর দিলে।
কিন্তু…, আর একজন শুরু করে। শান্তভাবে জরকেন্স তাকেই শুধোয়, আচ্ছা, কার্বন বা ওই জাতীয় কিছুকে দানা বাঁধাতে কী দরকার তা জানো নিশ্চয়?
চাপ, তাই না? বলে অপরজন।
কল্পনা করতে পারি না এমনই চাপ, আর আজ পর্যন্ত যত আগুন আমরা জ্বালাতে পেরেছি, তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি উত্তাপ। বললে জরকেন্স। অবশ্য ক্ষমতাতীত নয়, কেননা, ল্যাবরেটরিতে একটা হীরা আমরা তৈরি করতে পেরেছি। কিন্তু তার আকার এতই ছোট্ট আর প্রয়োজনীয় চাপ এমনই ব্যয়বহুল যে আমার তো মনে হয় না সে চেষ্টা আর কেউ করেছে বলে। কিন্তু কল্পনা করো তো উত্তাপে সাদা একটা পাহাড় মিনিটে হাজার মাইল বেগে ধেয়ে চলেছে; সেই সঙ্গে যোগ দাও আমাদের পৃথিবীর গতিবেগ–তাও প্রায় মিনিটে হাজার মাইল, বরং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য আরও কিছু বেশি। তারপর সমস্ত জিনিসটাকে সিধে আছড়ে ফ্যালো কার্বনের একটা জমির ওপর। ফলাফল জানার জন্যে কষ্ট করে এতদূর না হলেও চলত আমার। কিন্তু এসেই যখন পড়েছি, তখন স্থির করলাম ওদিক পর্যন্ত গিয়ে সবটুকু দেখতে হবে আমায়। কিন্তু কী কষ্টে যে এই পথ চলেছিলাম, তা বোঝাতে পারব না। ভয়ংকর কঠিনতা, নিদারুণ ঠান্ডা আর মারাত্মক জৌলুস, শ্রান্ত পা, মাথা আর মন। আসলে আমি খুঁজছিলাম সামান্য একটু খাঁজ কি চিড়-যার ফাঁকে আমার ছুরির ফলাটা বা স্কেট ঢুকিয়ে বেশ বড় একটা চাই খসিয়ে আনতে পারি। কিন্তু জানি না বিশ্বাস করবে কিনা সমস্ত পথ হেঁটেও এতটুকু ফাটল দেখতে পেলাম না কোথাও।
সাঙ্ঘাতিক জ্বলজ্বলে ওই দীপ্তিতে মাথা ধরে গেছিল আমার–যতই এগোতে লাগলাম, ততই তা বাড়তে লাগল। ওদিককার অক্ষাংশে জুন মাসের শেষে এমন কোনও রাতের আবির্ভাবের সম্ভাবনা ছিল না যাতে আমি একটু আরাম পেতে পারি। শ্রান্ত পা দুটো টেনে-টেনে চলতে লাগলাম আমি হিরে দেখে এরকম ক্লান্ত আর কখনও হইনি আমি। লেডি ক্লাশনের ইভনিং পার্টিতে আমার না যাওয়ার এইটাই আসল কারণ–যাকে খুশি এখন তা বলতে পারো। যাক, চললাম তো চললামই। তারপর অনেকক্ষণ পরে, অন্য দেশে যখন সন্ধ্যা, এসে পৌঁছলাম অপর পারে। পোড়া অঙ্গার ছাড়া সেখানে আর কিছুই দেখার ছিল না। ছাই আর ধুলোর মধ্যে হাঁটা খুবই কষ্টকর সন্দেহ নেই, কিন্তু তবুও হিরেটা আবার এড়োএড়ি পেরোবার চেষ্টা না করে সমস্ত পথটা ছাই মাড়িয়েই এলাম। সলোম পশুচামড়ার পোশাক পরেছিলাম–তাই ঘুমোতে পেরেছিলাম পথেই। দিনভর বিশ্রাম নিয়ে রওনা দিলেও একদমে সমস্ত পথটা পেরোবার ক্ষমতা আমার ছিল না। হিরের পার বরাবর ছাই মাড়িয়ে দীর্ঘপথ পেরিয়ে ফিরে এলাম যাত্রা শুরুর জায়গাটিতে।
এস্কিমোগুলোকে দেখলাম বটে, কিন্তু কোনও প্রলোভনেই ওরা হিরেটার কাছে যেতে রাজি হল না। দেবতা বিদায় নেওয়ার পর শয়তান এসে আড্ডা গেড়েছে ওখানে–জাদুমন্ত্রে সমস্ত জায়গাটুকু ঠান্ডায় আর জ্বলজ্বলে দীপ্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। ওদের ভাষা তো বেশি বুঝি না, তাই বুঝলাম না, শয়তান মহাপ্রভু দেবতার পিছুপিছু পৃথিবীতে এসেছিল, না দেবতার অন্তর্ধানের পর বেদখল করেছে জমিটুকু। সে যাই হোক, সব কিছুরই সহজ একটা ব্যাখ্যা থাকে; ওরা গেল ধর্মের ব্যাখ্যায় আর আমি এলাম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায়।
উপকুলে এসে অনেক পরিশ্রম আর বেশকিছু প্রচারকার্য চালিয়ে হয়তো খানিকটা ডিনামাইট সংগ্রহ করে ফিরে এসে Rue de la Paix-এর ভাড়ার ভরাবার মতো বেশকিছু টুকরো হিরে নিয়ে যেতে পারতাম। প্যারীর নাম শুনেছ তো? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেইখানেই। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিল তার চাইতেও অনেক বড়। পৃথিবীর সবকটা বাড়ি আমি সুন্দর করে তুলতে চেয়েছিলাম। এমন একটা কোম্পানি গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, যারা মধ্যবিত্তের হাতের মুঠোয় এনে দিত আশ্চর্য সুন্দর হিরের বেলওয়ারী ঝাড়। জমকালো ফুলদানির পরিকল্পনাও ছিল। আরও রকমারি রোজকারের ব্যবহারের জিনিসপত্র তৈরির পরিকল্পনা এসেছিল আমার মাথায়।
কিন্তু শেষপর্যন্ত হল কী? ঠিক যেদিন আমি লন্ডনে পৌঁছলাম, সেদিনই রাস্তায় পোস্টার দেখলাম–বিরাট ভূমিকম্প… শুধু এইটুকু দেখেই ছুটলাম খবরের কাগজওয়ালাদের দোকানে। একটা কাগজ ছিনিয়ে নিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ তাই বটে। রাশিয়াতেই হয়েছে ভূমিকম্পটা।
আমি জানতাম। পৃথিবী যে কী প্রচণ্ড ঘা খেয়েছে, তা আমি জানতাম। জানতাম, ওই ভীষণ সংঘর্ষে পৃথিবীর বুক থেকে বহু মাইল ভেতর পর্যন্ত টুকরো-টুকরো হয়ে গেছে, ফেটে-ফুটে গেছে। সমস্ত স্তরগুলো। ধরো, তোমার কোনও বন্ধুর গোড়ালি বা হাঁটু জখম হয়েছে, তারপরেই হঠাৎ একদিন কাগজে তার নাম দেখলে। তৎক্ষণাৎ তুমি বুঝে নেবে আদতে হয়েছে কী। জখম হাঁটু আর গোড়ালি যে বন্ধুটির দেহভার বইতে পারেনি, পড়ে গিয়ে বেশ আহত হয়েছে সে, তা বুঝতে তোমার এক লহমাও লাগে না। প্রবীণা ধরিত্রীর বেলাও ঘটেছে তাই। কী প্রচণ্ড আঘাত যে সে বুক পেতে নিয়েছে, তা আমি জানতাম। তাই যে মুহূর্তে ভূমিকম্প শব্দটা দেখলাম, বুঝলাম সব কিছুই। ওরা সিসমোগ্রাফ দেখে উৎপত্তিস্থান বার করেছে–আমি কিন্তু কিছু না দেখেই ঠিক আসল কেন্দ্রটি বলে দিতে পারতাম।
তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলাম আমি সবকিছুই নিজের চোখে দেখতে। স্বচক্ষে না দেখে তো আর কোম্পানি গঠন করা চলে না। পরের বোটেই গেলাম। যে ভয় করেছিলাম, অবস্থা দেখি তার চাইতেও অনেক খারাপ। সাঙ্ঘাতিক ভূমিকম্প। আশ্চর্য হলাম না মোটে–আঘাতটা তো আর সামান্য নয়। বরং ওই আঘাত সয়ে এতদিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকাটাই তো আশ্চর্য। অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে উঠেছে। সামান্য একটু ঢালু অবস্থায় দেখে গেছিলাম হিরেটাকে। ও অবস্থায় না থেকে যদি সমতল অবস্থায় থাকত, তাহলে কখনই এভাবে বেমালুম চোখের আড়াল হত না। কিন্তু এতটা আশা করাও যায় না। কল্পনাতীত একটা রেল দুর্ঘটনার পর সেতুর খিলানগুলো যেরকম টুকরো-টুকরো হয়ে যায়, সেইভাবেই গুঁড়িয়ে গেছিল ভূ-স্তরগুলো। কাজেই দীর্ঘদিন কোনওরকমে খাড়া থাকলেও এক সময়ে আর ভার সইতে না পেরে স্রেফ টুপ টুপ করে ভূগর্ভে ধ্বসে পড়েছে স্তরগুলো। যেভাবেই হোক না কেন অদৃশ্য হয়ে গেছে হিরেটা। এমনকী অঙ্গারগুলোরও কোনও হদিশ পেলাম না। হিরের ধার বরাবর সাগরের বেলাভূমির মতো পড়েছিল অঙ্গারের রাশ। সব চিহ্ন সমেত তলিয়ে গেছে হিরে আর সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে ধরিত্রীর মুখ। এই হয়তো ভালো। হিরে রইল না বটে কিন্তু তাতে মানবসমাজের মঙ্গল বই অমঙ্গল কিছু হল না। কিন্তু কস্মিনকালেও দার্শনিক নই আমি, তা তো জানো। হিরেটার আকারও তুচ্ছ নয়–যে ক্ষতি আমার হল, তাও বলবার নয়। তবুও মুখ বুজেই থাকি। কিন্তু বড় হিরেটিরে নিয়ে কেউ যদি বড়-বড় কথা বলে, তাহলেই মেজাজ যায় বিগড়ে। কী করব বলো, সামলাতে পারি না নিজেকে।
