প্রথম সংঘাত যে এইখানেই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই আর রইল না আমার। প্রথমত কয়লা সম্বন্ধে আমার সিদ্ধান্ত যে অভ্রান্ত তার প্রমাণ পেলাম মাইলখানেক পরে শুধু অঙ্গার দেখে যন্দুর মনে হল খুব পুরু একটা কয়লার স্তরের একেবারে নীচ পর্যন্ত স্কুলে গেছে। তারপরই এসে পড়লাম বিশাল একটা মসৃণ সমতলভূমির ওপর বহু দূরে দিগরেখায় গিয়ে মিশেছিল চ্যাটালো জমিটা। আর কী দারুণ ঠান্ডা। সর্বত্র তুষার গলে গেছে কিন্তু এ জমি তখনও ঢাকা রয়েছে সাদা তুষারে। পরের দিন সকালে এই ধু-ধু ফাঁকা জমিটার ওধারে আরও কয়েক মাইল যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, তাই রাতের মতো সেইখানেই তাঁবু ফেলতে বললাম, কিন্তু রাজি হল না এস্কিমোরা। কারণ জিগ্যেস করলাম। ওরা বললে, খারাপ বরফ। তুষারের মধ্য দিয়ে খোঁচা দিয়ে দেখলাম, বাস্তবিক ইস্পাতের মতো কঠিন সে বরফ। ওরা কিন্তু বারবার বলতে লাগল, খারাপ বরফ। তাতে ক্ষতি কী? ওদের ভাষা যতটা পারলাম বললাম।
দারুণ ঠান্ডা। খুব খারাপ বরফ। বললে ওরা।
বরফ ঠান্ডা হলে বুঝি খুশি হও না তোমরা? জিগ্যেস করার চেষ্টা করি আমি। কিন্তু দেশি লোকদের সঙ্গে এ শ্লেষের কোনও মানেই হয় না বিশেষ করে ইঙ্গিত দিয়ে তো শ্লেষ ফোঁটানো যায় না।
ওরা শুধু বললে, না। খুব ঠান্ডা।
ধুত্তোর, বলে শেষ অবধি তবু সমেত একটা গাধা নিয়েই রওনা দিলাম তুষারের মধ্য দিয়ে। খুঁটি পুঁতে গাধাটাকে বাঁধবার কোনও ব্যবস্থা করতে পারলাম না কাজেই একটু জিরিয়ে নিয়ে সেই রাতেই সরে পড়ল সে; আমি কিন্তু কোনওরকমে তাঁবু খাঁটিয়ে হাড় কাঁপানো নিদারুণ ঠান্ডা সত্ত্বেও একটু ঘুমের চেষ্টা করলাম। সেই আশ্চর্য নিথর নৈঃশব্দ্যকে কোনও ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়; বরফ ভাঙার ক্ষীণ শব্দও নেই, নেই জলের কুলকুল ধ্বনি। বরফের মধ্যে দিয়ে গুঙিয়ে ওঠে কত হাজারও রকমের বিচিত্র শব্দ, কিন্তু শুধু গাধাটার শ্বাসপ্রশ্বাসের ফেস-ফোঁস শব্দ ছাড়া পেলাম না কোনও প্রাণের সাড়া, ফিসফিসানি অথবা মর্মরধ্বনি; সব কিছুকেই টুটি টিপে কেউ যেন বোবা করে দিয়েছে। শেষপর্যন্ত গাধাটাও চলে গেল, পাঁচ মাইল পর্যন্ত শুনলাম ওর যাওয়ার শব্দ–সে শব্দ ছাড়া চারপাশের দিগন্ত জোড়া ধু-ধু শূন্যতার মাঝে ছিল না আর কোনও শব্দ। তাই পাঁচ মাইল পেরিয়ে অপর পারে পৌঁছনো না পর্যন্ত স্পষ্ট শুনতে পেলাম তার পায়ের শব্দ। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে সেই অস্বাভাবিক নিঝুম নিস্তব্ধতা অনেকক্ষণ পর্যন্ত জাগিয়ে রাখলে আমায়। ভোর হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে স্কেট পরে নিলাম; কিন্তু তার আগেই বুঝেছিলাম, একটা কিছু গলতি আছে এখানে, এস্কিমোদের কথাই ঠিক। স্কেট পরে নিলাম, কেননা তুষার একেবারে গলে গেছিল–কোনও চিহ্নই আর দেখলাম না তার। হার্ড টেনিস কোটের ওপর তুষার গলে গেলে যেমন দেখায়, সেইরকমই দেখাচ্ছিল চারদিক। বল্গা হরিণের গাড়িতে ফেলে এসেছিলাম তুষার জুতো, তাই রাত্রে বুট পরে হাঁটতে হয়েছিল। কিন্তু এখন স্কেট পরে নিয়ে মনেমনেই হিসেব করে দেখলাম ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব অপর পারে। কিন্তু আশ্চর্য একটা জিনিস লক্ষ করলাম। বরফের এরকম জৌলুস এর আগে কখনও দেখিনি। অচিরেই পায়ের তলার বরফের আর একটা বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করলাম। ইস্পাতের চেয়েও অনেক কঠিন সে বরফ। আমার স্কেটজোড়া তো কিছুতেই আঁকড়ে ধরতে পারল না তার মসৃণ গা–বারবার হড়কে গিয়ে আর আছাড় খেয়ে সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল আমার। উল্কার সঙ্গে সংঘর্ষে কী এমন পরিবর্তন আসতে পারে এখানকার বরফে–তাই ভাছিলাম। আর তখনই আচমকা বুঝলাম ব্যাপারটা। বরফের চেয়ে কঠিন যদি হয়–তবে এ বরফ নয়। চার হাত পায়ে ভর দিয়ে নীচু হয়ে বরফের দীপ্তির গভীরতায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝলাম আসল ব্যাপারটা। পকেট-ছুরিটা বার করে আঁচড় কাটবার চেষ্টা করলাম। কোনও দাগই পড়ল না। যেসব জিনিসের ওপর ইস্পাতেরও কোনও দাগ পড়ে না, তাদের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব বেশি নয়–এ জিনিসটাও তাদেরই অন্যতম। সে সময়ে একটা আংটি পরতাম আমি; আংটিটার সোনার মাঝে গাঁথা ছিল একটা পাথর। পাথরটা আসলে একটা পাথুরে কৃস্টাল। না, না, এখন যেটা দেখছ আঙুলে, এটা নয়–সেটা আসল পাথর ছিল। লোকে ভাবত হিরে–যদিও সে উদ্দেশ্যে কিনিনি পাথরটা। কী কারণে কিনেছিলাম তাও মনে নেই–বোধহয় নিছক খেয়ালের বশে অথবা দেখতে ভালো লেগেছিল বলেই। সে যাই হোক, পাথর সমেত আংটিটা আঙুলেই ছিল তখন। খুলে নিয়ে ঠান্ডা ঝকঝকে জিনিসটার ওপর বেশ করে ঘষলাম সেটা–কোনও আঁচড়ই পড়ল না। দুটোই যদি পাথুরে কৃস্টাল হত, তাহলে আঁচড় নিশ্চয় পড়ত। কাজেই সম্ভাব্য জিনিসগুলোর সংখ্যা আরও কমে এল। ভিজে পাথরটার ওপর বসে খুলে ফেললাম স্কেট। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ানক দীপ্তি থেকে চোখ আড়াল করে ভাবতে লাগলাম। এ বিশাল সমতল জমিটা যে বরফ–সে কথা ভেবে আর লাভ নেই। অবিজ্ঞানীরাই এ ধরনের আজেবাজে চিন্তায় সময় নষ্ট করত। কিন্তু ইস্পাত ছুঁইয়ে তো প্রমাণ হয়ে গেছে বস্তুটা আদতে কী। কাজেই নতুন থিওরি চিন্তা করতে হল আমায়। খুব সহজেই শেষ হল আমার চিন্তা। ধরো, তুমি নিজেই একজন বিজ্ঞানবিৎ; তাহলে যে-কোনও একটা পাথর দেখলে প্রথমেই কী করো তুমি? কোন স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেইটাই লক্ষ কর, কেমন? একথা ভাবামাত্রই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু। আমি দাঁড়িয়েছিলাম কয়লার ওপর; কিনারার চারধারে পোড়া অঙ্গার আমি দেখে এসেছি। আর জানোই তো কয়লা কী।
