জরকেন্স অবাক হোক, তা আমি চাইনি। কেননা এবার যদি তা হয়, তাহলে ওকে কায়দা করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।
শুধোলাম, কিন্তু পাহাড় দেখে তোমার খটকা লাগল কেন, তা তো কই বললে না?
আরে, অত বড় একটা বিশাল জিনিস–আকারে যা আল্পসের চেয়ে কম হবে না–অকল্পনীয় গতিতে মহাশূন্য পথে ধেয়ে এসে ধাবমান পৃথিবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লে কী হবে বলো তো? বিপুল সংঘর্ষের ফলে জিনিসটা সিধে ঢুকে যাবে পৃথিবীর বুকে, সেঁধিয়ে যাবে ধরিত্রীর জঠরে চিরকালের জন্যে। কিন্তু তা তো হয়নি। চোখের সামনেই সেন্ট গোথার্ডের চূড়ার মতো নাক উঁচু করে পড়ে রয়েছে পাহাড়টা। বল্গা হরিণ-টানা শ্লেজ চালানোর জন্যে জন তিন-চার এস্কিমোকে সঙ্গে এনেছিলাম আমি। ওদেরকে বাধ্য হয়ে জিগ্যেস করলাম। জানোই তো, ইউরোপের এদিকে উল্কা সম্বন্ধে একমাত্র এস্কিমোদের গুজব ছাড়া আর কোনও খবরই আসেনি। আর এই গুজব ছাড়া কাজ শুরু করার মতো বিজ্ঞানসম্মত তথ্য কিছুই ছিল না আমার হাতে। ওদেরকে জিগ্যেস করতে ওরা কিন্তু সেই একই কাহিনি বারবার শোনাতে লাগল আমায়। পেল্লায় রথ চড়ে দেবতা আরও উত্তরে নেমেছে। পৃথিবীতে রথ চালিয়ে ছুটে এসেছে এই দিকেই। যেখানে সে নেমেছে, অগ্নিকাণ্ডটা ঘটেছে সেইখানেই–এদিকে নয়। আর তাই শুনেই বেশ কিছুক্ষণের জন্য মাথা গুলিয়ে গেল আমার। অগ্নিকাণ্ডের সহজ ব্যাখ্যা শুধু একটাই হওয়া সম্ভব। জ্বলন্ত জঙ্গলে লেলিহান আগুনই দেখেছে এরা দূর থেকে, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে কী, উত্তরে তো কোনও জঙ্গলই নেই। শুধু তুষার আর বরফ। বছরের মধ্যে শুধু মাসখানেকের জন্যে সে বরফ গলে যায় সামান্য যা উদ্ভিদ দেখা যায়, তা নিঃশেষ করে দেয় কটা বল্গা হরিণেই। এস্কিমো-ভাষার ডজন খানেক শব্দ আমার জানা ছিল কাজেই ওই সামান্য পুঁজি নিয়ে আর প্রচুর ইশারা-ইঙ্গিত মিশিয়ে অনেক প্রশ্ন করলাম ওদের। বিশাল একটা অগ্নিকাণ্ড যে বহু উত্তরে দেখা গেছে–সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই শেষ অবধি রইল না আমার।
আর তারপরেই বুঝলাম আসল কারণটা। নিশ্চয় ভোলা একটা কয়লার স্তর ছিল ওদিকে। জুলন্ত উল্কাপিণ্ডটা তার ওপর এসে পড়ায় দপ করে জ্বলে উঠেছে সমস্ত স্তরটা।
পাহাড়টার ধারেকাছে কিন্তু কোনও কয়লার চিহ্নই দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, কয়লার স্তরের ওপর ঠিকরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছিটকে উঠে লাফাতে-লাফাতে উল্কাটা এগিয়ে এসেছে এই দিকেই। আমার এই সিদ্ধান্তই কিন্তু শেষপর্যন্ত সত্য হল। তোমরাও বুঝে দেখো, উল্কাটা তো আর টুপ করে খসে পড়েনি পৃথিবীর বুকে। তার ওপর শুধু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবই ছিল না–তাহলে তো সিধে পথেই আসত সে। কিন্তু তা তো নয়, উল্কার নিজস্ব কক্ষপথ আর নিজস্ব গতিবেগ একটা ছিল? এরই সঙ্গে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এক হওয়ায় ঢালু হয়ে গেল তার গতিপথ। সিধে না এসে তির্যক রেখায় আছড়ে পড়ে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পর খুবই সহজ হয়ে গেল আমার কাজ। উল্কার গতিপথ অনুসরণ করে প্রথম যেখানে সে আছড়ে পড়েছে, সেখানে যাওয়া এরপর আর মোটেই কঠিন কাজ নয়। কঠিন শুধু থিওরি তৈরি করা হাতেনাতে কাজ তো যে কেউ করতে পারে। দেখলাম, বেশ কয়েক জায়গায় পাহাড়টা ধাক্কা মেরেছে ভূস্তরকে–এক মাইল অন্তর-অন্তর সেইসব সংঘর্ষস্থানগুলোয় সৃষ্টি হয়েছে জলশূন্য হ্রদের মতো অগভীর গর্তের। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর ব্যবধান বেড়ে যেতে লাগল–সেইসঙ্গে গম্ভীর হয়ে উঠতে লাগল গর্তগুলো, বেশিরভাগ গর্তেই হ্রদের মতো জল জমেছিল। তুষার খুব তাড়াতাড়ি গলে যাচ্ছিল বলে পাহাড়টার কাছে বক্সা হরিণগুলোকে রেখে আসতে হয়েছিল আমায়। বছরের যে মাসে বরফ গলে যায়, সেই মাসেই শুরু করেছিলাম আমার অভিযান–তাই জমি দেখতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না।
ভালো কথা, ফস করে প্রশ্ন করে একজন, রাশিয়ায় কি হিরে আছে?
রাশিয়ায় কি হিরে আছে? অনুকম্পা মিশিয়ে প্রতিধ্বনি করল জরকেন্স।
কিন্তু হিরের গল্পই তো বলছ, তাই নয় কি?
শুনতেই পাবে তা, শুনতেই পাবে, বলে জরকেন্স। তারপর শুধোয়, হিরে জিনিসটা আদতে কী তা নিশ্চয় জানো আশা করি?
ইয়ে, তা জানি বইকী। দু-একজন আমতা-আমতা করে ওঠে, স্পষ্ট বুঝলাম কেউই জানে না আসল উত্তরটা কী। একজন শুধু জানত। সেই বললে, দানা বেঁধে যাওয়া কার্বন।
আবার গল্প শুরু করল জরকেন্স।
তুষার সমস্তই গলে গেছিল। এইভাবে আগে থেকেই সময় হিসেব করে যাত্রা শুরু করেছিলাম। তিনটে গাধা নিয়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে সঙ্গে রইল শুধু তিনজন এস্কিমো। গাধা তিনটে কিনেছিলাম গ্রামের মতো একটা জায়গা থেকে; অবশ্য কটা কুঁড়েঘরকে তোমরা গ্রাম নিশ্চয় বলবে না। আজ যেখানে দেখবে সেগুলো–পরের বছর এসে তাদের আর কোনও পাত্তাই পাবে না সেখানে। কিটব্যাগগুলো গাধার পিঠে চাপিয়ে হেঁটে চললাম আমরা।
মস্ত একটা গহ্বরের কাছে এসে পৌঁছলাম সবাইজল জমে বরফ হয়ে গেছে সেখানে। বিশাল একটা হ্রদনলখাগড়ার চিহ্ন ছিল না আশেপাশে কোনও বুনোপাখিও সন্ধান পায়নি হ্রদের। নিঃসীম শূন্যতায় ধু-ধু করছিল চারদিক। কনকনে ঠান্ডা আর মরা দীপ্তির ঝিকিমিকিতে সে নির্জনতা যেন আরও অসহ্য হয়ে উঠেছিল। বরফ গলে প্যাঁচপেচে হয়ে এসেছিল চারদিক। এরপর পঁচিশ মাইলের মধ্যে আর কোনও গহুর নেই। এইটাই তাহলে পৃথিবীর সঙ্গে পাহাড়টার শেষ সংঘাত, অথবা প্রথমও হতে পারে, কেননা আমি তো হাঁটছিলাম বিপরীত দিকে। বিশাল হ্রদটার দশ মাইল উত্তরে তাঁবু ফেললাম আমরা। পরের দিন তাঁবুটাবু গুটিয়ে নিয়ে পাড়ি দিলাম আরও পনেরো মাইল। পথের শেষে এসে পৌঁছলাম উল্কা যেখানে সর্বপ্রথম পৃথিবীর বুকে ঠিকরে পড়ে ছিটকে উঠেছিল, সেইখানে। মাধ্যাকর্ষণের টানে নিজের গতিপথ ছেড়ে এইখানেই আছড়ে পড়ে উল্কাটা–তারপর ছিটকে উঠে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে গেছে যেদিক থেকে এসেছি, সেইদিকে।
