আগুনের সামনে বসেছিলাম আমরা কজন। লাঞ্চের পর ক্লাবের এই ঘরটাতেই নিয়মিত জমায়েত হই আমরা। সোফাতে কয়েকজন গা এলিয়েছিল, বাকি সবাই বসেছিল এদিকে-ওদিকে ছড়ানো চেয়ারগুলোতে। শীতের ম্যাজমেজে বিকেল, কুয়াশায় ধোঁয়াটে হয়ে এসেছে চারদিক। বিকেল তো নয়–রাত্রিই বলা উচিত। বেলা এগারোটায় যে দিনের শুরু হয়েছিল, তিনটে বাজার আগেই তা মুছে গিয়ে যেন রাতের ঘোমটা টানা শুরু হয়ে গেছে। এহেন অলস অপরাহ্নে না জানি কত মধুর চিন্তাই ভিড় করে আসে মনে, সে বিকেলে কিন্তু কুয়াশায় হাবুডুবু খেয়ে রীতিমতো মুষড়ে পড়েছিলাম আমরা। যতদূর মনে পড়ে এইভাবে শুরু হয়েছিল আমাদের কথাবার্তা।
আশ্চর্য! এ যে মস্ত বড় হে! মস্ত বড়? কোনটা?
এই হিরেটা।
ওঃ। আমি ভাবলাম তুমি বুঝি মাছটার কথা বলছ।
মাছ নয় এটা, হিরে।
কিন্তু শুধু ছবি দেখে ওভাবে তো কিছুই বলা সম্ভব নয় তোমার পক্ষে।
নিশ্চয়ই সম্ভব।
কী করে?
হিরের আসল মাপের ছবি এটা।
বুঝলে কেমন করে?
আরে গেল যা, তা তো লেখাই রয়েছে।
তোমার কি মনে হয় সম্পাদক মশাইও সঠিক মাপ জানেন?
নিশ্চয় জানেন।
কেমন করে?
কী মুশকিল! এরকম একটা দামি পাথরকে পৃথিবীতে চেনে না কে? শুধু কষ্ট করে একে ওকে জিগ্যেস করা, তার বেশি তো নয়।
কিন্তু শুধু একটা ছবি দেখে হিরের আকার বলা যে কী করে সম্ভব, তা তো ভেবে পাচ্ছি না।
পাচ্ছ না?
না।
না পেলেও খুবই বড় হিরেটা।
তবে বড়।
চমৎকার। আমিও তাই বলছিলাম।
বাগ্বিতণ্ডার এই একঘেয়েমি থেকে শুধু একটি জিনিসই আমাকে রেহাই দিলে। তা হল জরকেন্সের মাথা নাড়া। সেদিন ক্লাবেই ছিল জরকেন্স। গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ছিল সে। মস্তবড় হিরেটার প্রসঙ্গ শুরু হওয়ার সময়ে প্রথমে সে মাথা নাড়ে–তারপর আগাগোড়া কথা কাটাকাটির সময়ে আস্তে-আস্তে মাথা নেড়েই চলল সে। প্রথমে ওকে আমি বিশেষ লক্ষ করিনি; হয়তো করতামই না, যদি না মস্তবড় হিরে এই শব্দ দুটো প্রতিবার শোনার সঙ্গে-সঙ্গে প্রবলতর হয়ে উঠত তার মাথা নাড়ার বেগ। শুধু এইটুকু না থাকলে তার মতানৈক্যের একঘেয়েমি হয়ত আমার দৃষ্টিই আকর্ষণ করতে পারত না। নিশ্চয় কিছু বলবে জরকেন্স, এই আশায় কান খাড়া করে রইলাম কিন্তু টু শব্দটি এল না ওর দিক থেকে। অথচ বসে-বসে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে সে মাথা নাড়তে লাগল যে আমার মনে হল হিরে সম্বন্ধে এমন কিছু নিশ্চয় ও জানে যা আজ পর্যন্ত আমরা শুনিনি। কিন্তু এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পাত্র তো সে নয়। শেষপর্যন্ত কৌতূহল চাপতে না পেরে আমিই ওর নীরবতা ভঙ্গ করলাম। নিরেট-মাথা তর্কবাগীশ দুজন কাগজের নক্সা নিয়ে বাগবিতণ্ডা সবে শেষ করেছে। কাগজটার দিকে একঝলক তাকিয়ে নিয়ে সোজা শুধোলাম জরকেন্সকে, হিরেটা সত্য-সত্যিই মস্তবড় হে, তাই না?
না। শান্তভাবে বলল জরকেন্স।
কেন নয়? বললাম আমি। এর চাইতে বড় হিরে কি তুমি দেখেছ?
হ্যাঁ। বললে ও।
কোথায়?
যারা এরকম একটা পাথরকে মস্তবড় বলে মনে করে তারা আমার কাহিনি বিশ্বাসই করবে না। বললে জরকেন্স।
আমার যতদূর স্মরণ হয়, স্কেচটা কোহিনুরের।
বললাম, আমি কিন্তু করব।
আরও দু-একজন, খুব সম্ভব কুয়াশায় তিতিবিরক্ত হয়ে ঝুঁকে পড়ে বলল, আমরাও।
শুনে বেশ খুশি হয়ে উঠল জরকেন্স–উৎসাহ পেয়ে কোনওরকম গৌরচন্দ্রিকা না করে তৎক্ষণাৎ শুরু করে দিলে গল্পটা।
.
অনেক বছর আগে রাশিয়ার অনেক উত্তরে একটা উল্কা পড়েছিল এস্কিমোদের দেশে। বিরাট সে উল্কা। এক বছর কি তারও পরে খবরটা এসে পৌঁছল ইউরোপে–তাও গুজবের ছদ্মবেশে। গুজবটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে একটা জিনিস বুঝলাম যে উল্কাটা পাহাড়ের মতো বিরাট না হয়ে যায় না। গুজব থেকে আদত খবরটা নিংড়ে বার করা খুব কঠিন ব্যাপার নয়–ঠিক পথ ধরলেই হল। এস্কিমোদের নিছক একটা উপকথার ছদ্মবেশে প্রথম এল গুজবটা। ওরা বললে, লকলকে অগ্নি শিখাময় জ্বলন্ত রথে চড়ে আকাশ থেকে এক দেবতা নেমে এসেছে তাদের দেশেরথ হাঁকিয়ে গেছে দক্ষিণের দেশে। সারারাত আকাশ নাকি সিঁদুরের মত লাল হয়েছিল–আর চারদিকের চল্লিশ মাইল পর্যন্ত তুষার নাকি গলে জল হয়ে গেছিল।
বুঝতেই পারছ, এস্কিমোদের এসব গাল-গল্প বিশ্বাস করিনি আর আমি। কিন্তু জানোই তো সাদাসিধে মানুষগুলো সরল কারণেই গল্পের সৃষ্টি করে–ওদের এ কাহিনিরও উৎস একটা আছে নিশ্চয়। খবরটা সবারই চোখ এড়িয়ে গেল। আমার কিন্তু মনে হল, এ কাহিনির পেছনে একটা কারণই শুধু থাকতে পারে। নিশ্চয় এইরকম একটা কিছু ঘটেছে ওদের দেশে। উল্কাপাত হওয়াই সম্ভব। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে যত উল্কা পড়েছে, তাদের চেয়েও অনেক বড় সে উল্কা। শেষপর্যন্ত এই উল্কার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম আমি।
খুঁজে বার করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না আমায়। ভৌগোলিক তথ্যগুলো এস্কিমোরাই দিয়ে দিয়েছিল। বেগ পেতে হয়েছিল আসল কারণটুকু খুঁজে বার করতে। উপকূল থেকে পুরো দেড়দিন যেতে না যেতেই meteoric iron-এর একটা পাহাড় দেখলাম–যার সন্ধানে আসা তারই হদিশ পেলাম বলেই মনে হল। ম্যাপে এ পাহাড়ের কোনও উল্লেখই ছিল না–অবশ্য সে সময়ে ওদিককার ম্যাপে উল্লেখ থাকত না কোনও কিছুরই কাজেই প্রমাণ হল না কিছুই। পাহাড়টার উপাদান কিন্তু ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত, সেইরকম। যেখানে উল্কাটা পড়েছে, তার চল্লিশ-পঞ্চাশ মাইলের মধ্যেই পড়েছিল পাহাড়টা–তবুও আমার খটকা গেল না। তাই চোখ-কান ঝুঁজে আবিষ্কারের উল্লাসে আত্মহারা হলাম না। পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক অভিযানে বেরিয়েছিলাম আমি–আর জানোই তো বেখাপ্পা ব্যাপার তালে-গোলে ধামাচাপা দেওয়ার রেওয়াজ বিজ্ঞানে নেই। সেসব দিনে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে খুব সচেতন থাকতাম আমি। অনেক বৈজ্ঞানিক অভিযান পরিচালনা করেছিলাম। কয়েকটা হয়তো তোমাদের কাছে বলে থাকতে পারি।
