প্রথম ভুল, বাঁ-হাতে রিভলভার দেওয়া। আমি নিজে ল্যাটা। উত্তেজনার মুহূর্তে আমি তাই তারিণীর বাঁ-হাতটাই তুলে নিয়েছিলাম।
দ্বিতীয় ভুল, খবরের কাগজের কাটিংটা ফেলে আসা।
তৃতীয় ভুল, বিস্তর আঙুলের ছাপ ফেলে আসা।
চতুর্থ ভুল, তারিণী স্থির হয়ে যাবার পর দোয়াতের কালি ওর মাথা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আমার উচিত ছিল ওর মাথার নীচেও খানিকটা কালি গড়িয়ে দেওয়া।
বুক ভরে কয়েকবার শ্বাস নিলেন কার্তিক লাহিড়ী। তারপর স্খলিত স্বরে বললেন, কিন্তু এত ভুল সত্ত্বেও আমি সন্দেহের বাইরে থাকতাম। কিন্তু মরেও তারিণী আমায় মেরে গেল। বাড়ি গিয়ে চিঠির বান্ডিল খুলতেই তারিণীরই লেখা একটা চিরকুট পেলাম। তাতে লেখা, আমার অনিচ্ছায় এই তাড়া যদি তোমার হাতে যায়, তাহলে জেনো তুমি ফেঁসে গেলে। কেননা, এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ চিঠিটা যাতে যথাসময়ে প্রেসে যায়, সে ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি।
আবার থামলেন কার্তিকবাবু। শেষবারের মতো ফুসফুঁসে খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে বললেন, কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা কি জানো? তোমরা একালের ছেলে, শুনে হাসবে। কিন্তু আমি এসব খুব মানি। সেই রাত্রে তারিণীকে খুন করার জন্যে বাড়ি থেকে বেরনোর আগে দরজার পাশেই, একটা শূন্য কলসি গড়াগড়ি খেতে দেখেছিলাম। জানি না, জানো কিনা, খনার বচনেই আছে :
শূন্য কলসি শুকনা না।
শুকনা ডালে ডাকে কা।।
যদি দেখ মাকুন্দ ধোপা।
এক পা যেও না বাপা।।
খনা বলে এ-ও ঠেলি।
যদি সামনে না দেখি তেলি।।
বলে, পাণ্ডুর মুখে হাসবার চেষ্টা করলেন কার্তিক লাহিড়ী। কিন্তু সে হাসির পরিবর্তে কান্নাই মূর্ত হয়ে উঠল তাঁর পুরু লেন্সের ওপারে ঘোলাটে চোখে।
আর দেরি করা সঙ্গত নয়। উঠে দাঁড়ালাম আমরা তিন বন্ধু। ধরাধরি করে প্রৌঢ় কার্তিক লাহিড়ীকে নিয়ে এলাম বাইরে।
গাড়ির মধ্যেই চির-শান্তির দেশে রওনা হলেন তিনি।
.
ভাঙা তক্তপোষের ওপর পদ্মাসনে বসে মৌজ করে গঞ্জিকা সেবনের মতো কাঁচিতে দমভোর এক টান দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, তারিণী সরখেলের যে একদিন এই রকম শোচনীয় মৃত্যু হবে, তা আমি জানতাম। সেই জন্যেই জয়ন্তর মুখে ভদ্রলোকের আত্মহত্যার খবর শুনে লাফিয়ে উঠেছিলাম আমি। এরকম একটা জঘন্য শোষক কখনো আত্মহত্যা করে না করতে পারে না।
কবিতা বললে, খামোকা তুমি আবার মরা লোকটাকে গালাগাল দিচ্ছ কেন?
খামোকা নয় বউদি, তারিণী সরখেলের কীর্তিকাহিনি অনেক আগেই আমার কানে এসেছে। মক্কেলের হয়ে তার সঙ্গে আমাকেও মোলাকাত করতে হয়েছে। লোকটার নৃশংসতা দেখে আমার গা রী রী করে উঠলেও কিছু করতে পারিনি। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে তিনি যে কত অভিজাত মহিলার সর্বনাশ করেছেন, তারপর ব্ল্যাকমেল করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
অসহিষ্ণু স্বরে বললাম, পাস্ট ইস পাস্ট। আমি এখুনি শুনতে চাই মা আর মেয়ে যে খুন করেননি, এটা তুমি জানলে কখন?
তাঁদের মুখেই শুনলাম। হত্যার রাতে ঘুম না আসায় জানলায় দাঁড়িয়েছিলেন মিসেস সরখেল। হঠাৎ অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তিকে বেরিয়ে যেতে দেখেই সন্দেহ হয় ওঁর। নীচে নেমে এসেই নিহত স্বামীকে দেখে উনি মুচ্ছা যান। জ্ঞান ফিরে পান অনেক রাত্রে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি না হারিয়ে চটপট টেবিলের ড্রয়ার থেকে কতকগুলো কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেন। আঙুলে কালি লেগে যায় তখনই। ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট উল্টে তার ওপর দাঁড়িয়ে আলমারির তাকেও এই কাগজ খুঁজতে হয়েছে। আঁকে। সেই সময় দোমড়ানো বাস্কেটে একটা লাল সুতো লেগে গিয়েছিল।
কবিতা শুধোলে কাগজগুলো কি সম্পর্কিত?
ইন্দ্রনাথ বললে, সেটা গোপনীয়। আমি কথা দিয়েছি।
চোখ পাকিয়ে কবিতা বললে, বটে, আমার কাছে আবার গোপনীয়তা!
আঃ জ্বালিয়ে মারলে। তবে শোনো, কিন্তু দয়া করে মেয়েমহলে আলোচনা কোরো না। তারিণী সরখেল তাঁর স্ত্রীকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিলেন।
কী করে?
বিয়ের আগেই শকুন্তলা ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। চিকিৎসার অছিলায় এই কাণ্ড করেন তারিণী সরখেল। তারপর বিবাহ এবং মায়াগড়ের মতো বিশাল সম্পত্তি লাভ। মায়াগড়ের পুরোনো পরিচারক রামহরির মুখেও একাহিনি শুনতে পারো তুমি।
কিন্তু কাগজগুলো কীসের?
এই কেলেঙ্কারির প্রমাণ ছিল এই সব কাগজপত্রে। মেয়ে বড় হয়েছে, তাই যাতে স্বামীর মৃত্যুর পর একথা আর কেউ না জানতে পারে, বিশেষ করে নিজের মেয়ের কানেও যাতে না ওঠে, তাই অমন দুঃসাহসী হয়েছিলেন মিসেস সরখেল।
শুধোলাম, এতদূর পর্যন্ত বোঝা গেল। কিন্তু বোঝা গেল না শকুন্তলা সরখেলের জানলার সামনে হাত নাড়া আর সেই শিসের অর্থ।
মুচকি হেসে বললে ইন্দ্রনাথ, উঠতি বয়েসে সব জুলিয়েটদেরই ওরকম দু-একটা রোমিও জোটে।
ও। কিন্তু শিসটা?
ন্যাকামো করো না। বিয়ের আগে প্রেম করার সময়ে শিস টি দিয়ে বউদিকে কোনওদিন ডাকোনি বলতে চাও?
মুখে আগুন তোমার! বলল কবিতা।* * রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত (মে-জুন, ১৯৬৪)
সবচেয়ে বড় হিরে
লর্ড ডানসানী শুধু লেখক হিসেবে নয়, সৈনিক, ক্রিকেট-খেলোয়াড় আর শিকারি হিসেবেও ওদেশে সুপরিচিত। হালকা রসিকতা মিশিয়ে আষাঢ়ে গল্প পরিবেশনায় তার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। বিলিয়ার্ডস্ ক্লাবের সভ্য জরকেন্স হল তার অননুকরণীয় সৃষ্টি। তারই Travel Tales থেকে A Large Diamond অনুবাদ করা হল। আজ পর্যন্ত জরকেন্সের গল্পের সত্যতা নিয়ে কেউই চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধা দেখায়নি–তবুও শ্রোতাদের অস্বস্তি কমেনি এক বিন্দুও।
