গলা-খাঁকারি দিয়ে জয়ন্ত বললে, নমস্কার স্যার, এ সময়ে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। আমি ডি-ডিতে হোমিসাইড সেকশনের ইনচার্জ।
আমিও তাই অনুমান করেছিলাম,সিগার না নামিয়েই এই প্রথম গুরুগম্ভীর স্বরে কথা বললেন কার্তিক লাহিড়ী।
কোনওরকম গৌরচন্দ্রিকা না করে কথোপকথনকে একেবারে সংক্ষিপ্ত করে আনলে জয়ন্ত। কর্তব্যকঠিন নীরস স্বরে বলে উঠল, নিশ্চয় শুনেছেন গাইনিকোলোজিস্ট তারিণী সরখেল আত্মহত্যা করেছেন?
আত্মহত্যা করেনি; খুন হয়েছে।
আপনি জানলেন কী করে?
খুনটা আমিই করেছি।
স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম আমি। আমার সুহৃদযুগলের অবস্থাও যে তথৈবচ, তা পাশে না তাকিয়ে বুঝলাম আমি।
ক্ষণেকের জন্যে কনসার্ট স্তব্ধ হতেই থমথমে নৈঃশব্দ্য নেমে এল চার দেওয়ালের মধ্যে।
ইন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম ফিসফিস করে বলে উঠল, আপনি বিষ খেলেন?
হ্যাঁ, খেলাম, ঘরে ঢুকেই শকুন্তলাকে দেখেছিলাম আমি। তাছাড়া, বিজ্ঞাপন পড়েই বুঝেছিলাম আমার লীলাখেলা ফুরিয়েছে। আশা করি, আমার আঙুলের ছাপও পেয়েছ তোমরা। তাছাড়া, কাজটা করার পর আমার অনুতাপের অন্ত নেই। কিন্তু সব ব্ল্যাকমেলিংয়েরই তো এই একই পরিণতি।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মন্ত্রীকার্তিক লাহিড়ী। নির্মীলিত চোখে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সময় খুব সংক্ষিপ্ত–কাজেই তোমাদের রিপোর্টের খোরাক এখুনি দিয়ে যাচ্ছি। অরিণী সরখেল আমার বাল্যবন্ধু। তার মতো শয়তান, সমাজশত্রু আর নিষ্ঠুর মানুষ আর দুটি দেখিনি। ছাত্রজীবনেও তার কীর্তিকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম আমরা। কিন্তু সে মেধাবী। তাই স্ত্রীরোগ বিদ্যায় বিলেত থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে এল সে। আর এই বিদ্যেই হল তার পাপাচারের প্রধান হাতিয়ার। সব কথা বলার সময় নেই, শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, তার মৃত্যুতে সমাজের ক্ষতি হয়নি এতটুকু, বরং উপকার হয়েছে প্রচুর। সম্ভ্রান্ত ঘরের কত নিরীহ মহিলা আর পুরুষ নিস্তার পেয়ে গেল তার বিরাট ব্যাপক শোষক যন্ত্রের নিষ্পেষণ থেকে।
জীবনে আমি একবারই ভালোবেসেছিলাম–এবং তা যৌবনে, যখন ভোমরার গুঞ্জনকে মনে হত মোজার্টের সঙ্গীত। জীবনে তখনও আমি প্রতিষ্ঠা পাইনি–কিন্তু মেয়েটি ছিল বাংলার এক বিখ্যাত ধনীর একমাত্র কন্যা। কাজেই যা হবার তাই হল। এই মুহূর্তে সে এখন এই কলকাতারই নাইট খেতাব-ধন্য এক সুবিখ্যাত ধনকুবেরের ঘরনী। পূর্বরাগকালীন উচ্ছ্বাস মুহূর্তে আমাকে কয়েকটা চিঠি লিখেছিল সে। তার কয়েকটিতে দুর্বার প্রণয়াবেগের এমন নিদর্শন ছিল, এবং এমন কয়েকটি নিষিদ্ধ কথা ছিল, যার প্রতিলিপি কাগজে কাগজে ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টি-টি পড়ে যাবে বাংলাদেশে, এবং মেয়েটির তৎক্ষণাৎ আত্মহত্যা করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
জীবনীশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসার জন্যেই বুঝি একনাগাড়ে এতগুলি কথা বলে বেদম হয়ে পড়েছিলেন কার্তিক লাহিড়ী। দম নেওয়ার জন্যে থামতেই ইন্দ্ৰনাথ শুধোলে, সেই চিঠিগুলো ডক্টর সরখেলের হস্তগত হয়েছে?
হ্যাঁ। এবং এই চিঠি কাগজে ছাপিয়ে দেওয়ার হুমকি দেখিয়ে সে এত বছর ধরে সমানে আমাকে আর সেই মেয়েটিকে শোষণ করে এসেছে। শেষ পর্যন্ত আমি মরিয়া হয়ে গেলাম; ভেবে দেখলাম, এভাবে সারাজীবন নিদারুণ উদ্বেগের মধ্যে থাকার চাইতে এরকম একটা ক্লেদাক্ত জোঁককে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে দেওয়াই ভালো।
তাই সেদিন রাতে মায়াগড়ে গিয়েছিলাম সাইলেন্সার ফিট করা রিভলভার নিয়ে। গাড়ি রেখেছিলাম, প্রধান তোরঙ্গ থেকে অনেকদূর। তারিণী টেবিলেই বসেছিল। অত রাতে আমাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল ও। আমি অনেক করে ওকে বোঝালাম, কাকুতি মিনতি করলাম চিঠিগুলো নষ্ট করে ফেলে আমাদের চিরতরে রেহাই দেওয়ার জন্যে। শেষে একটা রফা হল। চিঠি আমি ফেরত পাব না; কেননা, নিরস্ত্র হয়ে রাজ্যের মন্ত্রীর হাতে নাজেহাল হওয়ার মতো উজবুক নাকি সে নয়, তাই চিঠিগুলো সে নিজের কাছেই রেখে দেবে। তবে এই শেষ; একটা মোটা টাকা পেলেই আর সে আমাদের বিরক্ত করবে না।
আমিও তাই চাইছিলাম। বললাম, কথাটা লিখে দিতে। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হল সে। কেননা, এ-লেখার কোনও মূল্যই তো নেই। কাগজ টেনে নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখে কলমে কালি নেই। দোয়াত খুলে কালি ভরে নিলে সে। তারপর লিখলে?
এই শেষ। আর আমি তোমাকে জ্বালাবো না।
তারিণী সরখেল।
সইটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুচক্রী তারিণী নিশ্চয় আমার মতলবটা আঁচ করতে পেরেছিল। কিন্তু আমি আর সময় দিলাম না, ও লাফিয়ে ওঠার আগেই টেবিলের সামনে থেকে এক গুলিতে ফুটো করে দিলাম ওর হৃদ্যন্ত্র। টেবিলের ওপরেই মাথা রেখে চিরকালের মতো ঘুমিয়ে পড়ল সমাজের জঘন্যতম অপরাধী তারিণী সরখেল। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে দু-একবার হাত ছুঁড়েছিল– তাইতেই দোয়াতটা গেল উল্টো। স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা পড়ল মেজেতে। লোহার আলমারির কোন কে চিঠিগুলো আছে, তা জানতাম। ওরই পকেট থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে চিঠির তাড়াটা পকেটস্থ করলাম। তারপর ওর স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে নিয়ে বাঁ-হাতের মুঠিতে গুঁজে দিলাম রিভলভারটা। সাইলেন্সারটা শুধু খুলে নিয়ে রাখলাম পকেটে।
কিন্তু অনভ্যস্ত খুনি হিসেবে আমি চারটি ভুল করেছিলাম, মাথা ঠান্ডা হলে পর ভুলগুলো আপনা হতেই ধরা পড়েছিল আমার কাছে।
