তু-তুই এখানে কীভাবে এলি? গজানন হতবাক।
সে অনেক কথা। পরে শুনবে, হারামজাদারা অনেক আগেই এনেছিল আমাকে। এদের বস ব্যাটাচ্ছেলের নিজের বউ আছে কিন্তু পরকীয়া লোভী কিনা–তাই… নিগুঢ় হাসল পুঁতিবালা।
গা পিত্তি জ্বলে গেল গজাননের।
এখানেও ওই সব করছিস।
ডিউটি ফাস্ট, উৎকট গম্ভীর মুখে বললে পুঁতিবালা, বাকি সব নেক্সট। পুরো তল্লাটটার খবর নেওয়া হয়ে গেছে। ওরা মোট নজন আছে। ওদিকের স্টিল চেম্বারে একজনকে ক্লোনিং কপি রোবট বানাচ্ছে–আমাকেও করত। পরকীয়ার জোরে ফিক করে হেসে ফেলে পুঁতিবালা।
কী করবি এখন? রাগ চেপে বলে গজানন।
এসো আমার সঙ্গে, এগিয়ে যায় পুঁতিবালা হরিণীর মতো ক্ষিপ্র গতিতে। গজাননও চলে পেছন-পেছন।
সাদা হেলিকপ্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বললে পুঁতিবালা, চালাতে জানো?
সব জানি।
তবে উঠে বোসো।
তারপর? পাহাড়ের ওই ফুটো দিয়ে হেলিকপ্টার তো বেরোবে না।
ফুটো দিয়ে নয়, এই বোতামটা টিপলেই– পাহাড়ের গায়ে একটা বোতাম টিপল পুঁতিবালা–চিচিং ফাঁক করে।
হলও তাই। পাথুরে দেওয়াল সরে গেল একপাশে। স্টিল ডোর। পাথরের মতো নকশা করা বলে পাথুরে দেওয়াল বলে মনে হয়েছিল এতক্ষণ।
সামনে খোলা চত্বর। তারপর…
পুঁতিবালাকে ফেলেই ভেতরে উঠে গেল গজানন। রামভেটকির দাপটে তাকে অনেক কিছুই শিখতে হয়েছে। এবার তা কাজে লাগাল।
কিন্তু পুঁতিবালা আসছে না কেন?
হেঁকে ডাকা তো যাচ্ছে না। মুখ বাড়িয়ে চক্ষু স্থির হয়ে গেল গজাননের।
লাল রঙের একটা পেল্লায় ঘড়ির কাঁটা ঘুরোচ্ছে পুঁতিবালা। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে এক জায়গায় রেখেই দৌড়ে এসে উঠে পড়ল হেলিকপ্টারে।
বললে রুদ্ধশ্বাসে, ঝটপট চলল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সরে যেতে হবে। আওয়াজ পেয়ে ওরা ছুটে এলেই–
আর বলতে হল না গজাননকে। ইঞ্জিন স্টার্ট করে হেলিকপ্টার চালু করল চক্ষের নিমেষে। পর্বতকন্দর থরথর করে কেঁপে উঠল ভীষণ আওয়াজে। হইহই আওয়াজ শোনা গেল দূরে। ঘাড় কাত করে দেখল গজানন নটা মূর্তি ছুটে আসছে এদিকে। দুমদাম শব্দে তপ্ত বুলেট ঠিকরে আসছে ওদের দিকে।
আর তাকায়নি গজানন। ঈষৎ কাত হয়ে হেলিকপ্টার চক্ষের নিমেষে বেরিয়ে এল পাহাড়ের বাইরে এবং সেইভাবেই ছিটকে গেল আকাশের দিকে।
পাঁচমিনিট পূর্ণ হতেই পুঁতিবালার হাতে সেট করা টাইম বোমা বিস্ফোরিত হল।
বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। আন্দামানের সেই দ্বীপটি আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন বললেই চলে।
গুপ্তচর বাহিনীর বাকি ঘাঁটিগুলোও নির্মূল হয়েছে এরপরে পুঁতিবালার সংগৃহীত তথ্যের বলে।
অতএব অতীব রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য এই কাহিনিরও সমাপ্তি এইখানে।
* দ্বীপবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা।)
আমার মনের মরীচিকা
অনেক দূরে চলে এসেছি মৃগাঙ্ক, কিছুদিন আমার কোনও খবর পাবে না। বন্ধুভাগ্য আমার ভালো বলেই তোমার মতো বন্ধু পেয়েছি, কবিতাবৌদির মতো বন্ধু স্ত্রী পেয়েছি। আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনটাকে তোমরা দুজনে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলেছ। ভালোবাসো বলেই আমার এত দিনের আনন্দ এই পেশাবদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে কত গল্পই না লিখেছ। সেদিন ভবিষ্যৎ বঙ্গ সাহিত্য সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের মন্তব্য পড়ছিলাম। যেদিন আনন্দের ভেতর দিয়ে লিখতে পারা যাবে, সেই দিন আবার সাহিত্য সৃষ্টির দিন ফিরে আসবে। ওঁর মনে হয়েছিল, বড় সাহিত্যিক আমাদের দেশে এখন আর জন্মাবে না। মৃগাঙ্গ, তুমি বড় সাহিত্যিক নও। নিজেকে সাহিত্যিক বলে কখনো দাবিও করোনি। কিন্তু তুমি যা লিখেছ, তা আনন্দের ভেতর দিয়েই লিখেছ। সে আনন্দ আমার ক্ষুদ্র কীর্তিকে পাঁচজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে থেকেই পেয়েছ। আনন্দ আমিও পেয়েছি। নইলে আর পাঁচটা বঙ্গসন্তানের মতো চাকরিবাকরি না করে অপরাধী-শিকারে মত্ত হলাম কেন। বহু বছর ধরে এই মৃগয়ায় আনন্দ পেয়েছি মৃগাঙ্ক, এখন আমি ক্লান্ত। বিষাদ কাটিয়ে ওঠার জন্যে বিষয়ান্তরে মনোনিবেশ করার প্রেসক্রিপশন করেন ডাক্তাররা–আমি বোধ হয় নিজে থেকেই তাই এই সৃষ্টিছাড়া পেশায় তন্ময় হয়েছিলাম এতগুলি বছর। মৃগয়া-মত্ত হয়েছিলাম ইচ্ছে করেই। ভুলে থাকার জন্যে। মনের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা বেদনাকে এড়িয়ে থাকার জন্যে। কিন্তু মনের সঙ্গে ছলনা দীর্ঘদিন করা যায় না। মরীচিৎকার স্বরূপ একদিন না একদিন ধরা পড়েই। আমার এই আত্মবঞ্চনা আজ আমাকে পীড়া দিচ্ছে। আনন্দের অন্বেষণে এই পেশায় এসে আমার মনে হচ্ছে, অনেকের নিরানন্দের কারণ আমি হয়েছি। এতদিন আত্মশ্লাঘা অনুভব করেছিলাম দেশ আর দশের মঙ্গল করছি। ভুল, ভুল, এই অহঙ্কারই আমাকে অন্ধ করে রেখেছিল এতদিন। দেশ আর দশের সেবা করতে হয় কী করে, তা আটপৌরে মানুষদের কাছেই জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সরাসরি তাদের মুখের মধ্যিখানে তাকিয়ে তাদের মনের মানদণ্ডে বুঝে নেওয়া উচিত ছিল তারা কী চায়। তাদের জীবনধারার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়ে তাদের ছোট ছোট মঙ্গলের পথগুলিকেই আবিষ্কার করতে পারলেই শ্রীবাস্তব কল্পস্বর্গ এই মর্তেই হয়তো রচনা করা যায়। কিন্তু আমরা কেউ তা করি না। তাই চুরাশিতে অরওয়েলের বিভীষিকাবর্ষের মতো আমিও আমার বিভীষিকাবর্ষ যাপন করেছি। মরীচিৎকার পেছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পালিয়ে এসেছি অনেক দূরে…নিরালায় নির্জনে আত্মসমীক্ষা করে চলেছি। কি পেয়েছি বলতে পারো, এতগুলো বছর ধরে এত অপরাধী শিকার করে? কটা মানুষের প্রাণে আনন্দ দিতে পেরেছি? কজনকে সুখী করতে পেরেছি? কটা জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালতে পেরেছি? কটা সংসারে শান্তিসমীরণ বওয়াতে পেরেছি? বরং ঠিক তার উল্টোটাই ঘটিয়েছি। আমার মনের এই মরীচিকা আর অস্পষ্ট নয় আমার কাছে।
