আজকের স্টেটসম্যান দেখেছিস?
দেখেছি।
পার্সোনাল কলম?
না। কেন?
কাল রাত্রেই জয়ন্ত গিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসেছিল ওদের অফিসে। কাগজটা দয়া করে খোলোই না কলমবাগীশ।
খুললাম। রিসিভার রেখে দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেলাম মজাদার বিজ্ঞাপনগুলোর ওপর দিয়ে। এক জায়গায় এসে থমকে থেমে গেলাম।
K. L. TODAY NIGHT TEN
MOULIN ROUGE T. S.
রিসিভার তুলে নিয়ে বললাম, দেখেছি।
কী বুঝলি?
পণ্ডশ্রম।
বটে! কেন শুনি?
খুন যে অথবা যারা করেছেন, তাঁরা ওই মায়াগড়েই রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
হাসির শব্দ ভেসে এল তারের মধ্যে দিয়ে।
এ সম্বন্ধে দীর্ঘ বিতর্কের প্রয়োজন। আপাতত টেলিফোনের মধ্যে সেটা সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বলি, এটা একটা চান্স। পোপার কাটিংয়ের K. L. নামধারী ব্যক্তিই যে হত্যাকারী, তা আমি বলছি না। তবে সে যদি হত্যাকারী হয়, তবে সে আজ রাত্রে মূল রুজে আসবে না। এলে বুঝব, সে নির্দোষ। অবশ্য তাকে চিনতে পারব কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে, তাই মিস শকুন্তলা সরখেলও
আমাদের সঙ্গে থাকছেন যদি সনাক্ত করতে পারেন, এই আশায়।
বুঝেছি।
কী বুঝেছ?
তুমি মরেছ।
তাড়াতাড়ি বলে ওঠে ইন্দ্রনাথ, আরে না, না, তা নয়। তোমরা, এই বিয়ে করা লোকগুলো, সব সময়ে ব্যাচেলরদের এমন সব সন্দেহ করে বসো, যে–
আমার কাছে ওসব সাফাইয়ের দরকার নেই ভাই, আমি কবিতাকে দিচ্ছি।
কবিতা পাশেই ছিল। রিসিভারটা আমার হাত থেকে নিয়েই তো প্রথমে বেশ করে দু-কথা শুনিয়ে দিলে। তারপর লাইন কেটে দিয়ে আমার পানে ফিরে বললে, ঠাকুরপো কি বলছে জানো?
কী?
বলছে, তুমি তো বোম্বাই নগরীর ধনীর দুলালী, তবুও তোমাকে ৩৬০০০ টাকা খরচ করে তৈরি একটা মেয়েদের বাথরুম দেখাব, যদি আজ ঠিক রাত দশটার সময়ে মূলা রুজে আসো। তাছাড়া, বর্তমান কেসের কৌতূহলোদ্দীপক উপসংহার দেখারও আশা করতে পারি। তোমাকে বলেছে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, কই আর বলল। বউদিঅন্ত প্রাণ তার।
ঝঙ্কার দিয়ে উঠল গিন্নি, মরণ! ও আবার কি কথা!
.
পার্ক স্ট্রিটের মূলা রুজ রেস্তোরাঁ।
ঘূর্ণায়মান আলোক উইন্ডমিলের সামনে এসে যখন দাঁড়ালাম, তখন দশটা বাজতে দশ মিনিট।
ঢুকেই বাঁদিকে কোণের কেদারাগুলো রিজার্ভ করে রেখেছিল আমার আই.ডি.ডি. বন্ধু জয়ন্তকুমার। আসর জমিয়ে বসেছিল সে, ইন্দ্রনাথ আর শকুন্তলা সরখেল।
কবিতার সঙ্গে শকুন্তলার পরিচয়পর্ব সাঙ্গ হলে পর শুধোলাম, শুধু কি আমরাই আছি, না জয়ন্ত অন্যান্য সাঙ্গ-পাঙ্গও এনেছ?
প্রয়োজন আছে কি? বলল জয়ন্ত।
লক্ষ্য করলাম, দু-বন্ধুরই সজাগ চাহনি প্রবেশ পথের ওপর নিবদ্ধ। যতবার দরজা খুলে যাচ্ছে, ততবারই চকিত হয়ে উঠেছে দুজনে, এবং শকুন্তলা সরখেলও দৃষ্টি বুলিয়ে নিচ্ছে প্রতিজনের ওপর।
কব্জি ঘড়িতে দেখলাম, ছোট কাটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে বড় কঁটা; রাত দশটা।
অনেকেই টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। এল নতুন যুগলমূর্তি। নতুন তান ধরল ক্যাবারে মিউজিক পার্টি। গমগমে জ্যাজ সঙ্গীত।
রাত দশটা পনেরো মিনিট।
হতাশ হয়ে তাকালাম বন্ধুদের পানে। একমাত্র শকুন্তলা সরখেলই দেখলাম অবদমিত উত্তেজনায় অস্থির হয়ে উঠেছে, হাতে ধরা কফির পেয়ালাও নিষ্কম্প নয়।
চুক চুক করে চুমুক দিতে দিতে ইন্দ্রনাথ বললে কবিতাকে বউদি, ছত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে তৈরি জুলিয়েটদের বাথরুমটা দেখে এসো এইবেলা–মাথা ঘুরে যাবে-খন।
কিন্তু তার আগেই আবার খুলে গেল স্প্রিংডোর–টকটকে লাল রঙের পুরু গালিচার ওপর পা দিলেন খদ্দর পরিহিত এক প্রৌঢ়মূর্তি। চোখে পুরুলেন্সের মোটা চশমা। মুখভাব অত্যন্ত গম্ভীর।
মুখটা যেন কোথায় দেখেছি দেখেছি বলে মনে হল–বড় পরিচিত মুখ। কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল জয়ন্ত, কার্তিক লাহিড়ী।
কার্তিক লাহিড়ী! পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জাঁদরেল মন্ত্রী কার্তিক লাহিড়ী। কেন্দ্রীয় দপ্তরে যাঁর অসীম প্রভাব, বাংলার জনগন-মানসে যিনি বর্তমানে ধ্রুবতারার মতো প্রোজ্জ্বল–সেই কার্তিক লাহিড়ী এত রাতে মূলা রুজে?
পরক্ষণেই দারুণ চমকে উঠলাম আমি। হয়তো চেঁচিয়েই উঠতাম যদি না ইন্দ্রনাথ পাশ থেকে মোক্ষম চিমটি কেটে স্তব্ধ করে দিত আমায়।
কার্তিক লাহিড়ী! K. L.! ইনিই কি তাহলে স্টেটম্যানে বিজ্ঞাপিত সেই K. L.?
অদূরেই একা শূন্য টেবিল অধিকার করেছিলেন স্বনামধন্য মন্ত্রী কার্তিক লাহিড়ী। চারপাশের বিলাতি পরিচ্ছদ আর ফরাসি পরিবেশের মাঝে তার খাঁটি গান্ধী পোশাক বেশি করে প্রত্যেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হল না। স্টুয়ার্ড এসে অর্ডার নিয়ে যাওয়ার পর ইয়া মোটা একটা সিগার বার করে অগ্নিসংযোগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কফির সরঞ্জাম এসে পৌঁছল। অন্যমনস্কভাবে ধুমোদগীরণ করতে করতে কফি তৈরি করলেন। তারপর পকেট থেকে একটা শিশি বার করে খানিকটা তরল পদার্থ ঢাললেন পেয়ালার কফিতে–সম্ভবত কৃত্রিম শর্করা–চিনি খাওয়া নিষেধ স্বাস্থ্যের জন্যে।
আরও মিনিট কয়েক পরে জয়ন্ত চোখের ইঙ্গিত করল ইন্দ্রনাথকে। উঠে দাঁড়াল দুজনে।
–আমিও কলের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে–তিনজনেই লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলাম মন্ত্রীমহাশয়ের টেবিল অভিমুখে।
টেবিলের সামনে পৌঁছলাম। আসন গ্রহণ করলাম। কিন্তু ভাবগতিক দেখে মনে হল, পৃথিবীতে ওই টর্পেডোর মতো চুরুট ছাড়া আর কোনও বস্তু আছে বলে মন্ত্রীমহোদয়ের জানা নেই। কিন্তু আমার সন্দেহ হল আমাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে উনি অনেক আগে থেকেই সচেতন–বোধ করি আমাদের জোড়া জোড়া শিকারি কুকুরের মতো একাগ্র দৃষ্টির জন্যেই।
