ইন্দ্রনাথ জয়ন্তর পানে তাকালে। জয়ন্ত বললে, চলো, সেরে আসা যাক।
দোতলাতেই করিডরের আর এক প্রান্তে দক্ষিণ ভোলা একটি ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। দরজা খোলা। পুরু হ্যান্ডলুমের পর্দা ঝুলছিল সামনে। তারই ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম, জানলার সামনে আমাদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একজন তন্বী তরুণী। জাফরানী রঙের চোলী আর আশমানী রঙের শাড়ির ওপর ফণিনীর মতো এলিয়ে রয়েছে একটি দীর্ঘ বেণী। দুই হাতে জানলার গরাদ ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি।
এ অবস্থায় সাড়া না দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। কাজেই জয়ন্ত হাত তুলেছে দরজায় টোকা দেওয়ার জন্যে, এমন সময়ে একটা কাণ্ড ঘটল।
তীক্ষ্ণ শিস দেওয়ার একটা স্পষ্ট শব্দ শুনলাম। শব্দটা এলো বাগানের দিক থেকেই।
শব্দটা মিলোনোর আগেই চনমনে হয়ে উঠল তন্বী মূর্তি। উদগ্র উত্তেজনায় দুই গাল চেপে ধরল গরাদের ওপর। তার পরেই একটা হাত বারবার আন্দোলিত হল শূন্যে। একটি মাত্র অর্থই সুস্পষ্ট হল এই হাত নাড়ার মধ্যে এবং তা না-বাচক।
অল্পক্ষণ পরেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে জানলার সামনে থেকে সরে এল রহস্যময়ী নারী মূর্তি এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গলা খাঁকারি দিয়ে ভারী গলায় জয়ন্ত বলে উঠল, ভেতরে আসতে পারি?
দারুণ চমকে উঠল তরুণী মেয়েটি। সামনে ভূত দেখলেও বুঝি মানুষ এতটা চমকে ওঠে না। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে কাষ্ঠহেসে হেসে কোনও মতে বলে উঠল, ও, আপনারা–মানে–পুলিশ–
ধন্য নারী, ধন্য তোমার চির-অতলান্ত রহস্য আর ছলনার অপরিসীম ক্ষমতা! চমকিত না হয়ে উপায় ছিল না।
এবারেও নাটক শুরু করল ইন্দ্রনাথ স্বয়ং। জয়ন্তকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠল, চলে গেছে তো?
থমকে গেল সামনের পক্ক বিম্বাধরের ঋজু দেহবল্লরী। চকিতে স্ফুরিত হয়ে উঠল পাতলা নাসারন্ধ্র। কৃষ্ণশিলায় খোদিত আননের প্রসাধনকলায়, নয়নের রুচিসুন্দর কজ্জ্বললেখায়, পরনের উজ্জ্বল, আশমানী রঙা অঞ্চলের বঙ্কিম রেখায় আর চারু-ললাটের কুমকুমবিন্দুর রাঙা আভায় নিমেষে স্পষ্ট হয়ে উঠল দৃপ্ত ঔদ্ধত্য। সিংহীর মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বেঁকা সুরে পাল্টা প্রশ্ন করে বসল কৃষ্ণ সুন্দরী, তার মানে?
হাসি মুখে হালকা সুরে জবাব দিলে ইন্দ্রনাথ, অত্যন্ত মামুলী প্রশ্ন। আপনার মতো বিদূষী প্রগতিশীলা বুদ্ধিমতী মহিলার কাছেও কি এর বিশদ ব্যাখ্যা করতে হবে? তাছাড়া, অনেকক্ষণ ধরে ও-জানলা থেকে তাকে দেখলাম তো!
তোষামোদের জন্যেই হোক বা ইন্দ্রনাথের আমি-সব-জানি ভাবের জন্যেই হোক, ধীরে ধীরে স্তিমিত প্রদীপশিখার মতোই নরম হয়ে আসে তন্বীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
এরপর যা ঘটল, তা সংক্ষেপে পূর্ব ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ ইন্দ্রনাথ একাই ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে নাটক জমিয়ে তুলে ক্লাইম্যাক্স এনে ফেলে এবং আগের মতোই আমাদের বিদায় করে অশ্রুনয়না শকুন্তলা সরখেলের কাছে শুনতে বসল তার গোপন কাহিনি।
এর পরের একঘেয়ে পুলিশী তৎপরতার বিবরণ দিয়ে কাহিনিকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। মোটের ওপর, রাত নটার আগে শহরতলীর এই রহস্যময় উপবন মায়াগড় থেকে বেরোতে পারলাম না আমরা তিন বন্ধু।
পথে পড়েই রহস্যতরল কণ্ঠে বললাম, কি হে ইন্দ্রনাথ, শ্যামা শিখরদশনা পীন পয়োধরার সঙ্গে কী কী গোপন কথা বলে এলে জানতে পারি কি, না কবিতাকে এজন্যে নিয়োগ করতে হবে?
কাঁচির আগুনের আভায় দেখলাম, গোঁফের একপ্রান্ত বেঁকিয়ে ফিক করে হাসল ইন্দ্রনাথ। বলল, সেটুকু না হয় সাসপেন্সই থাকুক।
দেখো বন্ধু, শার্লক হোমকে নকল করো না। মা আর মেয়ের মুখে কী কী গোপন কথা শুনেছ, তা না শোনা পর্যন্ত আমি ঘুমোতেই পারব না।
উঁহু, এখন এত কথা বললেই কাহিনির রসটুকুই নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া, তোমাকে দারুণ সাসপেন্সের মধ্যে রাখতে পারলে পাঠকসমাজেরই লাভ। নিজে সাসপেন্সে ছটফট না করলে লেখার মধ্যে সে সাসপেন্স আসবে কেন?
অগত্যা মৌন হলাম।
পাঠিকাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। গৃহিণীর সঙ্গে মতবিরোধ এবং ঘোরতর কলহের সম্ভাবনা আছে জেনেও, একটি কথা এই কাহিনিপ্রসঙ্গে নিবেদন করার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না। রুপোর টাকা উপন্যাস পড়ার দুর্ভাগ্য যাঁদের হয়েছে, তারা জানেন পূর্বরাগের পরেই এই হতভাগাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়েছিল। এত কাণ্ডের পরেও কিন্তু নারীজাতির মনের অন্দরমহলের বিস্তর অলি-গলি সম্বন্ধে এখনও আমি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল হতে পারিনি এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিধাতার সৃষ্ট এই ফুরফুরে জীবগুলি প্রয়োজনমতো দেবী ও দানবী উভয় রূপই ধারণ করতে পারে।
প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তারিণী সরভেলের হত্যা-রহস্যের গ্রন্থি মোচন করতে গিয়েও আমি সন্দেহ করে বসলাম পূর্ববর্ণিত দুই স্ত্রী-চরিত্রকে। বিশেষত প্রথম সাক্ষাতেই তাঁদের সন্দেহনজনক কার্যকলাপের যেসব নির্দেশন শুনলাম এবং দেখলাম এরপর আর কোনও প্রমাণ ব্যতিরেকেই তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চলে।
পরের দিন দুপুরে এ সম্পর্কে অনেক ভেবে-চিন্তে আরও তদন্তসাপেক্ষ দুটি সিদ্ধান্ত আমি মনে মনে খাড়া করে ফেললাম। সরকারি আর বেসরকারি গোয়েন্দা বন্ধু দুজনের ক্ষুরধার বুদ্ধি যাতে আমার এই সিদ্ধান্ত পক্ষীর পক্ষ যুক্তিশরে ছিন্নভিন্ন করতে না পারে, সেই জন্যে বসে বসে যথোপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছি, এমন সময়ে টেলিফোন এল ইন্দ্রনাথের কাছ থেকে।
