অকস্মাৎ কররেখা নিরীক্ষণে তন্ময় হয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। মুখ না তুলেই ধীর শান্ত সুরে থেমে থেমে বললে, দেখুন, আমি যা জিগ্যেস করেছি, তার মধ্যে অস্বচ্ছতা কিছুই নেই। তবুও যদি প্রশ্নটাকে পুনরাবৃত্তি করতে বলেন–
না আমি যাইনি।
দীর্ঘশ্বাস ফেললে ইন্দ্রনাথ। এবার নখের ডগাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললে, মিসেস সরখেল, অনুমতি করেন তো একটা কথা বলি। বলে, অনুমতির অপেক্ষা না করেই ঢিমেতালা স্বরে বলে চলে, আমরা এসেছি সত্যের সন্ধানে, অন্যায়ের উদঘাটনে। সেক্ষেত্রে আমাদের কাছে কিছু গোপন করার প্রচেষ্টা করা মানেই আপনার স্বামীর প্রকৃত হত্যাকারীকে আত্মগোপন করতে সাহায্য করা।
যেন চমকে উঠলেন মিসেস সরখেল, অন্তত আমার তো তাই মনে হল।
হত্যাকারী! কী বলছেন কি?
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি আত্মহত্যা করেননি–নিহত হয়েছেন। আমরা এ-কথাও জানি, তাঁর মৃত্যুর পর আপনি তার ঘরে গিয়েছিলেন।
না!
সে সময়ে আপনার পরনে ছিল লাল শাড়ি।
না!
আপনি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট উল্টে তার ওপর দাঁড়িয়েছিলেন।
না! রীতিমতো সঙ্কিত হয়ে উঠি ভদ্রমহিলার কাগজের মতো সাদা মুখ দেখে।
তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে ইন্দ্রনাথ। বিদ্যুৎবেগে সামনে এগিয়ে গিয়ে মিসেস সরখেলের ডান হাত টেনে নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটা তুলে ধরে ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ওঠে, তবে তাঁর টেবিলের এই কালির দাগ আপনার আঙুলে এল কী করে?
না, না, না! আর্ত চিৎকার করে ভেঙে পড়েন মিসেস সরখেল। ছিন্নমূল লতার মতোই শয্যার ওপর আছড়ে পড়ে কেঁদে ওঠেন অসহায়ভাবে–ফুলে ফুলে উঠতে থাকে তার দেহ।
পরিস্থিতির নাটকীয়তা আর ক্লাইম্যাক্সের ধাক্কায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। ইন্দ্রনাথ কিন্তু অবিচল। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে কণ্ঠে বজ্রের বিষাণ বাজিয়ে পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে পালটে ফেলেও এখনও যে তা তার আয়ত্তের বাইরে যায়নি, তা ওর নির্বিকার মুখ দেখেই বুঝলাম। মিসেস সরখেলের হাত ছেড়ে দিয়ে মন্থর চরণে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও।
আর, আমরা নিশ্চুপ হয়ে দেখতে লাগলাম পতিবিয়োগ বিধুরা এক প্রৌঢ়ার উচ্ছ্বসিত ক্রন্দন।
অনেকক্ষণ পরে শান্ত হল মিসেস সরখেল। কিন্তু মুখ তোলেন না উপাধান থেকে। নির্বিষ্ট মনে বাগানের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ইন্দ্রনাথ–আমাদের অস্তিত্বই যেন ভুলে গিয়েছিল। জীবনে উপর্যুপরি আঘাত আর ব্যর্থতার গ্লানিতে বিষিয়ে উঠেছে যার অন্তর, এ যেন সেই অলস চির-ক্লান্ত ইন্দ্রনাথ রুদ্র নয়। ওর কর্তব্য-নিষ্ঠুর গ্রানাইট পাথরের মতো কঠিন মুখচ্ছবির মধ্যে সন্ধান পেলাম আর এক ইন্দ্রনাথ রুদ্রের।
ফিরে দাঁড়ায় ইন্দ্রনাথ। পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায় পালঙ্কের পাশে। তারপর সহানুভূতি আর সমবেদনায় কোমল-স্নিগ্ধ সুরে বলে, মিসেস সরখেল!
কোনও উত্তর নেই।
মিসেস সরখেল, আপনি আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। বিশ্বাস করুন, আমরা এসেছি আপনার মঙ্গলের জন্যেই। আমাদের উপকারী বন্ধু হিসেবেই গ্রহণ করুন। আপনার গতিবিধির অনেক খবরই আমরা সংগ্রহ করেছি, এক্ষেত্রে কোনও কিছু গোপন করতে গেলেই আইনের রক্তচক্ষু থেকে তো আপনি রেহাই পাবেন না।
এতক্ষণ পরে মাথা তুললেন মিসেস সরখেল। শিশিরে ভেজা পদ্ম-পলাশের মতো দুই চোখ মুছে বললেন, কিন্তু বিশ্বাস করুন, সে ঘটনার সঙ্গে এই দুর্ঘটনার কোনও সংযোগ নেই।
তবুও আমাদের তা জানা দরকার।
কিন্তু সে-কথা যে পাঁচজনকে বলার মতো নয়।
ক্ষণেক নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। তারপর বলল, বিশ্বাস করলাম। আচ্ছা, আমার পরিচয়টা আপনাকে এখনও দেওয়া হয়নি, আমি সরকারি গোয়েন্দা নই–বেসরকারি অর্থাৎ প্রাইভেট ডিটেকভ। কাজেই যে কাহিনিকে সরকারি নথিপত্রে স্থায়ীভাবে রেখে যেতে আপনার দ্বিধা, এত ভয়–তা অসঙ্কোচে আমার কাছে বলতে পারেন। আমি কথা দিচ্ছি, সে-কাহিনির সঙ্গে যদি আপনার স্বামীর হত্যারহস্যের কোনও সংযোগ না থাকে, তবে তা কোনওদিনই লোকসমাজে প্রচারিত হবে না।
আমি বহুবার ভেবেছি, frustrated না হয়ে গিয়ে ইন্দ্রনাথ যদি অভিনয়জগতে আবির্ভূত হত, তাহলে কুশলী শিল্পী হিসেবে যশস্বী হতে ওর বেশিদিন লাগত না। কণ্ঠের উত্থান-পতন, প্রবল ব্যক্তিত্ব আর চোখ-মুখের ভাবপ্রকাশ খুশিমতো নিয়ন্ত্রণ করার ঈশ্বর প্রদত্ত গুণটি থাকার ফলে যে কোনও পরিস্থিতিকে ঢেলে সাজিয়ে, নিজের আয়ত্তে আনা ওর কাছে ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন অনাত্মীয়ও পরম আত্মীয় হয়ে উঠে মনের মণিকোঠার অর্গল খুলে দিত ইন্দ্রনাথের সামনে। স্বয়ং নগর-কোটাল এবং ধর্মাবতার এলেও যা সম্ভব হত কিনা সন্দেহ, তা মুহূর্তের মধ্যে সহজ হয়ে উঠল ওর কণ্ঠের এই জাদুর জন্যে। কণ্ঠে নির্ভরতা ঢেলে মিসেস সরখেল আমাদের পানে তাকিয়ে শুধু বললেন কিন্তু–
আর বলতে হল না; সর্বাগ্রে উঠে দাঁড়াল জয়ন্ত, তার পরেই আমি আর ইন্সপেক্টর শিকদার অনুসরণ করলাম তার দৃষ্টান্ত–একটি কথাও না বলে তিনজনে নেমে এলাম নীচে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, মিনিট পনেরোর মধ্যেই ইন্দ্রনাথ নেমে এল আমাদের পাশে।
ভাবলেশহীন মুখে বললে এবার আর একজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বাকি।
মিস শকুন্তলা সরখেল। উনিও ওপরে আছেন। বললেন ইন্সপেক্টর।
