ডক্টর সরখেল, মিসেস এবং মিস সরখেল, আর পুরোনো চাকর রামহরি।
ব্যস? এত বড় বাড়িতে মাত্র একজন চাকর?
ডাকব স্যার? এখনই জেরা করুন না?
শুধু রামহরিকে ডাকুন।
কনস্টেবলকে নির্দেশ দিলেন ইন্সপেক্টর সরখেল। তারপর নিহত ব্যক্তির সান্নিধ্য ত্যাগ করে সবাই বেরিয়ে এলাম বাইরে। আসতেই মুখোমুখি হয়ে গেলাম পঞ্চাশোত্তীর্ণ এক প্রৌঢ়ের সঙ্গে।
ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন, এই যে রামহরি, তোমাকেই খুঁজতে পাঠাচ্ছিলাম, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
এজ্ঞে, উই পাশটিতে দাঁড়িয়ে ছেলেম।
বিচিত্র চেহারা প্রৌঢ়ের। বৃদ্ধের মতোই পলিতকেশ মাথা। এতটুকু কালো আঁচড়ও দেখা যায় রুপোর মতো ঝকঝকে একরাশ চুলে। চোখেমুখে নিবিড় প্রশান্তির অভিব্যক্তি। ঋষির মতোই স্নিগ্ধ সে মুখ; কোনও অভাব নেই, দুঃখ নেই, বাসনা নেই। অথচ তাপসিক কঠোরতার লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না তার ললাটের ভাঁজে, চোখের বহির্বিন্দুর দু-ধারের প্রজ্ঞারেখায়।
নরম সুরে ইন্দ্রনাথ কথা শুরু করলে, তোমারই নাম রামহরি? তোমার সঙ্গে আমাদের বিশেষ দরকার।
এজ্ঞে ।
আচ্ছা রামহরি, এ-বাড়িতে তুমি কতদিন আছ?
তা অনেক দিন হল; এটুকু বয়স থেকেই এ-বাড়িতে এসেছিলেম।
তুমি ছাড়া আর কোনও… কথাটা অসমাপ্ত রাখে ইন্দ্রনাথ।
কিন্তু রামহরি বুঝে নেয়। বলে, এজ্ঞে, আর কেউ নেই। দরকার কি বলুন? বাবু, মামণি আর দিদিমণি বই তো আর কেউ নেই সংসারে? বাড়িটা বড় হলে কি হবে, সংসারটি তো ছোট!
তুমিই তাহলে সব কাজ করো?
এজ্ঞে, সব। বাজার-হাট, রান্নাবান্না, ঘরদোর সাফ–সব।
বাবুর গাড়ি আছে তো?
এজ্ঞে আছে; দুটো গাড়ি।
ড্রাইভার নেই?
এজ্ঞে, না। দরকার হয় না। দিদিমণি, মামণি, বাবু–প্রত্যেকেই যে গাড়ি চালাতে জানেন।
এত বড় বাড়িতে শুধু কটি প্রাণী থাকে, তোমাদের ভয় করে না?
এজ্ঞে, ভয় কীসের? এটুকু বয়স থেকেই তো রয়েছি এখানে।
আচ্ছা রামহরি, তোমার বাবু আত্মহত্যা করলেন কেন? মানে, তুমি তো পুরোনো লোক, কাজেই কোনও কারণ-টারণ থাকলে নিশ্চয় তা তোমার অজানা নয়।
মাথা নীচু করে রইল রামহরি। তারপর মৃদুস্বরে বললে, এজ্ঞে, এ-বড় কঠিন প্রশ্ন।
কেন?
আত্মহত্যা তো অনেকেই অনেক কারণে করে!
যেমন আর্থিক অভাব?
এজ্ঞে, বাবুর টাকার অভাব নেই।
সাংসারিক অশান্তি?
এজ্ঞে, সেরকম খিটিমিটি সব সংসারেই আছে।
আর কিছু? অর্থব্যঞ্জক চোখে তাকালো ইন্দ্রনাথ।
বুদ্ধিমান রামহরি ইঙ্গিতটুকু বুঝে নিয়ে বললে, এজ্ঞে, সেরকম কিছু তো আমি জানি না। দিনের বেশির ভাগ সময় শহরেই কাটাতেন বাবু, বাড়ি ফিরতেন অনেক রাত্রে।
সেকি? এরকম নির্জন বাড়িতে!
এজ্ঞে, সেইটেই তো তাজ্জব কাণ্ড! আমরা কেউই কোনও শব্দ শুনিনি। বাবুর শোবার ঘর নীচেই। রাত্রে তাকে বিরক্ত করা বারণ। তাই সকালবেলা চা নিয়ে গিয়ে দেখি এই দৃশ্য।
পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করল ইন্দ্রনাথ ও জয়ন্ত।
জয়ন্ত শুধোলে, আচ্ছা, বাবুর কোনও শত্রু আছে বলে জানো কি?
এজ্ঞে, তা তো বলা মুশকিল।
বন্ধু?
এজ্ঞে, তা আছে নিশ্চয়। তবে এ-বাড়ি শহর থেকে এত দূরে যে, কাউকে বড় একটা আসতে দেখি না। পার্ক স্ট্রিটে বাবুর চেম্বারেই তেনারা যান।
চুপ করল জয়ন্ত।
তারপর শুধোলে, তোমার মা-মণি কোথায়?
ওপরে। বড় কাদাকাটা করছেন। ডাকব?
না, না, ডাকতে হবে না। তুমি নীচে থাকো, আমরাই যাচ্ছি।
মিসেস সরখেল তাঁর ঘরেই ছিলেন। কাশ্মীরি জাজিম বিছানা শয্যায় মখমলের উপাধানে মুখ লুকিয়ে শুয়েছিলেন তিনি। দোরগোড়ায় আমাদের পদশব্দ শুনেই এস্তে উঠে বসলেন।
মৃদু গম্ভীর স্বরে জয়ন্ত বললে, মাপ করবেন, এ সময়ে আপনাকে বিরক্ত করা যে কতখানি হৃদয়হীনতা, তা আমি বুঝি। কিন্তু কর্তব্য বড় নিষ্ঠুর, কি করি বলুন।
ভিজে গলায় বললেন মিসেস সরখেল, ভেতরে আসুন।
দেওয়ালের ধার ঘেঁষে পাতা আরামকেদারায় বসলাম আমরা। বিষণ্ণ চোখ মেলে তাকালেন মিসেস সরখেল। আমি কবিতা লিখি, তাই বুঝি তার এমন দুঃসময়েও ভারি ভালো লাগল তাঁর চাহনি। বয়স তার চল্লিশের কাছাকাছি। যৌবনকে এখনও তিনি সযত্নে বন্দি করে রেখেছেন ঢলঢলে মুখের মিষ্টি লাবণ্যের পিঞ্জরে। সজল দুই চোখে দেখলাম শ্যামল ঘাসের কান্না। সারা মুখের বিষাদাভা যেন এইমাত্র শুক্লপক্ষের চাঁদকে অস্তাচলে পাঠিয়েছে। আজন্ম আভিজাত্যের মধ্যে লালিতা হলে যে গরিমা মাখানো সৌন্দর্য নিয়ে বঙ্গললনা প্রাণতরাঙ্গিনীর কুলে কুলে নৃত্য করে, তাই সম্বল করেই আজ বিধবা হয়েছেন মিসেস সরখেল।
আচমকা অত্যন্ত বেরসিকের মতো একটা প্রশ্ন করে বসল ইন্দ্রনাথ, মিসেস সরখেল, আপনার স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর ঘরে কী জন্যে গিয়েছিলেন তা বলবেন কি?
দারুণ চমকে উঠলেন মিসেস সরখেল। আমার চোখে মনে হয় যেন বীণার তার ছিঁড়ে গেল, সঙ্গীতের তাল কেটে গেল, কবিতার ছন্দ-পতন ঘটলো। ভীষণ রাগ হয়ে গেল ইন্দ্রনাথের ওপর।
আমি? ক্ষীণস্বরে বললেন মিসেস সরখেল।
হ্যাঁ, আপনি। রামহরির মুখে শুনলাম, আপনারা কেউই ফায়ারিং-এর শব্দ শোনেননি, অথচ তার মৃত্যুর ঠিক পরেই তাঁর টেবিল হাতড়ে ছিলেন কেন, তা জানতে পারি কি?
অসাধারণ সংযম বলে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করেছিলেন মিসেস সরখেল। গোলাপের ভীরু পাপড়ির মতো থরথর করে কেঁপে উঠছিল তাঁর অধরোষ্ঠ–গোপন শঙ্কার কৃষ্ণছায়া এসে পড়েছিল দুই মণিকায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রশ্নবাণের আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠলেন উনি। আরক্ত থমথমে মুখে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনি কি বলতে চান?
