যেখানে ছিল, সেইখানেই রেখেছি, স্যার। ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে। জবাব দিলেন লোক্যাল ইন্সপেক্টর শিকদার।
ঘরের মধ্যে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট ছিল শুধু একটিই, আর তা মৃত ব্যক্তির শূন্যে বেরিয়ে থাকা ডান হাতের শিথিল আঙুলের ঠিক নীচেই।
এক মুখ ধোয়া ছেড়ে ঝুঁকে পড়ল ইন্দ্রনাথ। দোমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের স্তূপের ঠিক ওপর থেকেই তুলে আনল একটা কাগজ। গোটা গোটা অক্ষরে কাগজটির ওপরে লেখা শুধু কয়েকটি পংক্তি:
এই শেষ। আর আমি তোমাকে জ্বালাবো না। তারিণী সরখেল।
অর্থাৎ আত্মহত্যার স্বীকারোক্তি। এরপরেও তারিণী সরখেল আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন বলতে গেলে একটু দ্বিধা হয় বইকি। জয়ন্তকে মৃদু স্বরে এই কথাই বললাম আমি।
জয়ন্ত ঠাট্টা করল না। গম্ভীর মুখে বললে, বেশ, আরো প্রমাণ তোমায় দেখাচ্ছি। ইন্সপেক্টর শিকদার, ডাক্তারের রিপোর্ট কি?
গড়গড় করে মুখস্থ বলে গেলেন ইন্সপেক্টর–
এক, গুলিটা হৃদপিণ্ড ছুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। দুই, খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। তিন, গুলিটা একটু ওপরের অ্যাঙ্গেল থেকে করা হয়েছে। চার, গতকাল রাত্রে মারা গেছেন ডক্টর সরখেল।
জয়ন্ত বললে, এছাড়াও উনি তদন্ত করে জেনেছেন, ডক্টর সরখেল ল্যাটা ছিলেন না। অর্থাৎ ডান হাত মুক্ত থাকা সত্ত্বেও বাঁ-হাতে রিভলভার ধরার কোনও দরকারই ছিল না তার। কাজে কাজেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ডক্টর সরখেল আত্মহত্যা করেননি এবং আততায়ী টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ফায়ার করেছিল।
ইন্দ্রনাথ বলে উঠল, আরও আছে। আততায়ী ডক্টর সরখেলের পরিচিতও বটে। কেননা, ঘরের মধ্যে ধস্তাধস্তির কোনও চিহই নেই। টেবিলের কাগজপত্রও সুবিন্যস্ত। আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও ডক্টর কিছু বুঝতে পারেননি–পারলে নিশ্চয় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠতেন। তাছাড়া, ওঁর মুখ-চোখেও সেরকম কোনও ভাব দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া আরাম কেদারার ওপর একটা বিলিতি ম্যাগাজিনও পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ আততায়ী নিশ্চয় আরাম কেদারায় বসেছিল, সামনের স্তূপীকৃত ম্যাগাজিনের একটি টেনে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিল, হয়তো ডক্টর সরখেলের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজবও হয়েছিল! কেননা, আরাম কেদারার সামনে রক্ষিত ছাইদানে সিগারেটের ছাইয়ের সঙ্গে চুরুটের ছাইও আছে। কিন্তু টেবিলের ওপর রাখা ছাইদানে যেখানে হামেশাই ডক্টর সরখেল বসতেন, সেখানে সিগারেটের ছাই ছাড়া আর কিছু নেই।
অবাক চোখে ইন্দ্রনাথের বক্তিমে শুনছিলেন লোক্যাল ইন্সপেক্টর শিকদার। মুখের ভাবখানা তুমি কোন্ তালেবড় হে! ইন্দ্রনাথ স্তব্ধ হতেই জয়ন্ত তাই হাসি গোপন করে ভারিক্কি চালে বলে উঠল, ইন্সপেক্টর, এঁর নাম নিশ্চয় আপনি শুনেছেন। আমার বিশেষ বন্ধু ইনি–সত্যসন্ধানী ইন্দ্রনাথ রুদ্র। আর ইনি মৃগাঙ্ক চৌধুরী–লেখক, কবি, এবং ইন্দ্রনাথের কাহিনীকার।
যথারীতি লাফিয়ে উঠলেন ইন্সপেক্টর। উচ্ছ্বাসে একটু স্তিমিত হয়ে আসার পর ইন্দ্রনাথ শুধোলে–আপনি ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেটটা ভালো করে দেখেছেন?
আজ্ঞে না। আপনারা আসবেন বলে–
আচ্ছা, আমিই দেখছি, বলে উবু হয়ে বসে পড়ে ইন্দ্রনাথ। উপুড় করে দেয় বাস্কেটটা। ভেতর থেকে খুব বেশি কাগজপত্র অবশ্য পাওয়া গেল না। কতকগুলো পরিত্যক্ত ভেষজ সম্পর্কিত লিটারেচার, একটা পুরোনো প্রেসক্রিপশন রেফারেন্স-বুক, আর এটা খবরের কাগজের কাটিং।
ইংরাজি দৈনিকের পাতা থেকে সযত্নে কাঁচি দিয়ে কেটে নেওয়া অংশটা হাতে নিয়ে সিধে হয়ে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। উল্টেপাল্টে দেখে নিয়ে ছিন্ন পত্রটা তুলে দিলে আমার হাতে।
ভাবলাম, শার্লক হোমসের মতো না জানি আবর্জনা স্তূপ থেকে অতি মূল্যবান সূত্রই আবিষ্কার করে ফেলেছে বন্ধুবর ইন্দ্রনাথ। কাগজটার একদিকে দেখলাম জুতোর পালিশের বিজ্ঞাপন। আর একদিকে শুধু দুটি লাইন:
T. S. FRIDAY NIGHT TEN
MOULIN ROUGE. K. L.
এক নজরেই বুঝলাম, অংশটি পার্সোনাল কলমে বিজ্ঞাপিত হয়েছিল।
নীরবে কাটিংটা তুলে দিলাম জয়ন্তর হাতে। একে একে সবার পর্যবেক্ষণ শেষ হলে পর জয়ন্ত তা নোটবইয়ের ফাঁকে রাখতে রাখতে বললে, ইন্দ্রনাথ, ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেটটা লক্ষ্য করেছ?
করেছি। বেতের বাস্কেট। নিউ মার্কেটে এ জিনিস এন্তার কিনতে পাওয়া যায়।
আর কিছু?
সম্প্রতি বাস্কেটটা উল্টো করে তার ওপর কেউ দাঁড়িয়েছিল। কয়েক জায়গায় সামান্য মচকে গিয়েছে। যেই দাঁড়াক, ওজন তার খুব বেশি নয়। কেননা, গুরুভার ব্যক্তি হলে অমজবুত বাস্কেটকে আর বাস্কেট বলে চেনা যেত না।
ব্যস?
স্যার, আচমকা লাফিয়ে উঠলেন ইন্সপেক্টর শিকদার, স্যার, আমি একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছি এখান থেকেই।
এক সঙ্গে তিন জোড়া দৃষ্টি এসে পড়ে শিকদারের উত্তেজিত মুখের ওপর।
কী?
একটা লাল সুতো।
কোথায়?
বাস্কেটের কোণে; খাঁজে আটকে রয়েছে। অর্থাৎ ইন্দ্রনাথবাবু যা বললেন, তা সত্যি। বাস্কেটের ওপর যে দাঁড়িয়েছিল, তার পরিধেয়র একটা অংশ বাস্কেটের বেতের খোঁচায় আটকে গিয়েছিল। টান মেরে তা ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সুতোটা থেকে গিয়েছে।
বটে, ভুরু কুঁচকোয় জয়ন্ত, তাহলে এর মধ্যেই আততায়ীর চেহারার একটা মোটামুটি বর্ণনা আমরা পাচ্ছি। সে কৃশকায়, অঙ্গে লাল পোশাক, এবং সে ডাক্তার সরখেলের বিশেষ পরিচিত। ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোতে আমি খবর দিয়ে এসেছি, তারা এল বলে। ম্যাগাজিন, অ্যাস্ট্রে, আর এই আত্মহত্যার স্বীকৃতিপত্রে কার কার আঙুলের ছাপ আছে, তা আমাকে জানতেই হবে। তবে আপাতত এ-ঘরে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। গতকাল রাত্রে এ-বাড়িতে কে কে ছিল?
