আরে গেল যা! কি কুক্ষণেই রবীন্দ্র-রচনাবলী তোমাকে দিয়েছিলাম। ওঠো, উঠে পড়ো।
কোথায়?
বাইরের অক্সিজেনে।
কিন্তু জয়ন্ত যে এখনি আসছে!
জয়ন্ত! এখন!
হ্যাঁ, খবর পাঠিয়েছে সে। একটা নতুন ঝামেলায় ডাক পড়েছে তার, তাই আমাকেও জ্বালাতে চায়। ওই তো এসে গেছে ও।
সিঁড়িতে ভারী জুতোর আওয়াজ শুনলাম। পরক্ষণেই মসমস শব্দে পুরো পুলিশী ইউনিফর্ম পরে ঘরে ঢুকল জয়ন্ত। ঢুকেই এক চিৎকার, আরে, কপোত-কপোতী যে–কী ব্যাপার? এখানে তো নন্দন নিকুঞ্জবন নেই শ্বেতশিলাসনও নেই–তবে কেন বৃথা কালক্ষেপ এই দারিদ্রের কুটিরে?
কবিতা বলল, আমার খুশি। কী জন্যে তুমি এসেছ, তাই আগে শুনি।
অরিণী সরখেল আত্মহত্যা করেছেন।
চট করে উঠে বসল ইন্দ্রনাথ।
ডক্টর তারিণী সরখেল?
হ্যাঁ।
আলনা থেকে পাঞ্জাবিটায় টান দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, চল, বেরিয়ে পড়া যাক। বউদি ভাই, মৃগাঙ্ক, আজকের মতো বিদেয় হও তোমরা।
কপাল কুঁচকে কবিতা বললে, কেন, আমরাও তো তোমার সঙ্গে আসতে পারি?
চোখ কপালে তুলে জয়ন্ত বললে, কী সর্বনাশ, পুলিশী তদন্তে নারীর উপস্থিতি–
ইন্দ্রনাথ বোতাম আঁটতে আঁটতে বললে, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, স্ত্রীলোকের বুদ্ধি পুরুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অল্প।
ঝঙ্কার দিয়ে উঠল কবিতা, থাক, থাক, আর রবীন্দ্রনাথ কপচাতে হবে না, আমরা যেতে চাই না তোমাদের সঙ্গে।
.
আকাশ-পথে নিউইয়র্ক শহরে অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার সময়ে গগনচুম্বী হৰ্য্যনগরী দেখে টার্জেন মন্তব্য করেছিল–পাথরের জঙ্গল। আধুনিক কলকাতা শহর দেখলেও বোধ করি প্রকৃতিলালিত টার্জেন সেই একই ভুল করত। কিন্তু এই ইট কাঠ পাথরের জঙ্গলও এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, শুরু হয়েছে ঝিকমিকে ঝিল আর সবুজসুন্দর পত্রপুষ্পের চোখজুড়ানো শোভা। এই কলকাতারই শহরতলীতে যে এমন রমণীয় উপবন থাকতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
জায়গাটার একটু ইতিহাস আছে। আসবার পথে জয়ন্তর মুখে তা শুনেছিলাম। ইন্দ্রনাথের টিটকিরির পর অভিমানিনী কবিতা আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছিল, অগত্যা আমি একাই এসেছিলাম। তখনই শুনেছিলাম মায়াগড়ের ইতিবৃত্ত।
বড়ি গ্রামের সাবর্ণ চৌধুরীর বংশের মনোহর, রামাদ, রামভদ্র প্রভৃতির কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতা কিনে নেওয়ারও আগে পত্তন হয় এই মায়াগড়ের। প্রাচীন গৌড়ের এক শক্তিশালী নরপতি বর্গীদের অত্যাচার থেকে রাজপ্রাসাদ সুরক্ষিত রাখার জন্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বৃত্তাকারের পরিখা খনন করেছিলেন। পরিখার সঙ্গে ভাগীরথীর সংযোগ ছিল। মারাঠা দস্যুদের প্রবেশ রোধ করার জন্যে ইচ্ছেমতো পরিখার ওপর পা পাটাতন টেনে তুলে ফেলা হত। এখন অবশ্য মোটা মোটা মরচে ধরা লোহার শেকল ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। পরিখার পরেই মাটি আর ইটের তৈরি তোরণ। বট-অশ্বথের প্রপে তা পড়ো-পড়ো হয়েও সমুন্নত। এককালে যা বাগান ছিল, এখন তা অরণ্য। দূরে গাছপালার ফাঁকে ঝিলের ঝিকিমিকি। অন্তঃপুরবাসিনীরা অবগাহন করতেন এইখানেই। উঁচু-নীচু পথ বেয়ে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়ার পর জিপ এসে থামল মূল প্রাসাদের সামনে।
এক নজরেই বোঝা যায় এ সৌধের সৃষ্টি ইংরেজ আগমনের অনেক পরে। সামনের দিকটা ইংরেজি কাসল-এর অনুকরণে তৈরি। সংস্কারের অভাবে কিছুটা জীর্ণ স্থানে স্থানে আগাছার দৌরাত্ম্যও চোখে পড়ে। এর ঠিক পেছনেই পরবর্তী যুগের তৈরি একটি বিশাল ইমারত। গাড়ি বারান্দার নীচেই পুলিশের ট্রাক আর একটি জিপ দাঁড়িয়েছিল। দুজন কনস্টেবলকেও দেখলাম সঙীন বাগিয়ে চোখ পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।
জয়ন্ত অন ডিউটি আর এক মানুষ। স্বল্প কথায় স্থানীয় ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে মোটামুটি বিবরণ শুনে নিয়ে, সরাসরি সে এগিয়ে গেল মৃতদেহ যে ঘরে আছে–সেই ঘরে। নীরবে অনুসরণ করলাম আমরা।
একটা মাঝারি প্রকোষ্ঠ। একদিকে লেখবার টেবিল। অপর দিকে কারুকাজকরা সেকেলে কাঠের আলমারিতে সাজানো বিস্তর কেতাব। আর একদিকে দেওয়ালের গা ঘেঁষে সাজানো আরাম কেদারা আর কিউরিও।
টেবিলের ওপরেই মাথা রেখে স্থির হয়ে বসেছিল একটি নিষ্প্রাণ দেহ। কানের ওপর ন্যস্ত মাথার দু-দিকে ছড়িয়ে রয়েছে দুটি হাত। ডান হাতের শিথিল আঙুলগুলো টেবিলের বাছরে ঝুলছে। আর বাঁ-হাতের মুঠিতে ধরা একটি রিভলভার।
মৃতদেহ ছাড়া যে জিনিসটি সবার আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হল কালির স্রোত। দোয়াতের কালি। আধারটি উল্টেছে টেবিলের ঠিক মাঝখানে। বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার স্রোতের আকারে তা বয়ে গেছে চারদিকে। একটি ধারা এসে পৌঁছেছে মৃতদেহের মাথার ঠিক নীচেই।
জয়ন্ত নীচু হয়ে মাথাটা কাত করলে। তারপর সিধে হয়ে তাকালে ইন্দ্রনাথের পানে।
ইন্দ্রনাথও দেখেছিল। ঠোঁটের ডগায় একটা কঁচি লাগাতে-লাগাতে বললে, এই জন্যেই আত্মহত্যার কেসে তলব পড়েছে তোর?
ঠিক তাই। এটা আত্মহত্যাই নয়, খুন।
কী করে? ফস করে বলে ফেলি আমি।
ওহহ, তুই বুঝি দেখিসনি?
কী দেখব?
কেন মাথার নীচে?
দেখেছি, কিছু নেই ওখানে।
কিছু না থাকাটাই তো সমস্যা। তুই কি বলতে চাস, আত্মহত্যা করার পর মৃত ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে দোয়াতটি উল্টে দিয়েছিলেন?
অপ্রস্তুত হয়ে যাই আমি।
তাই কি সম্ভব নাকি?
তা না হলে কালির ধারা মাথার নীচেও থাকত, মাথা ঘিরে চলে যেতো না। আচ্ছা ইন্সপেক্টর শিকদার, চিঠিটা কোথায়?
