রোশনলাল বললে, কিন্তু প্রমাণ?
এই নিন টেপরেকর্ডার। ফিরে যান বন্ধুর কাছে। ছোট্ট ক্যাসেট রেকর্ডার। পকেটেই রাখবেন। কথা বলুন পুরোনো প্রসঙ্গ নিয়ে–সেই সব কথা–যা শুধু প্রাণের বন্ধু হিসেবে রাকেশ বলেছিল আপনাকে। ক্রিস্টিনকে খুন করবার কত রকম ফন্দি এঁটেছিল–।
মোট আটরকম। প্রথমে ঠিক করেছিল, গুলি করাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে ডাকাতির অছিলায়। তারপর ভেবেছিল, গাড়ির ব্রেক বিগড়ে রাখবে। তিন নম্বর প্ল্যানটা ছিল, সুইমিং পুলে ইলেকট্রোফিউশন–
ক্যাসেট ফুরোনোর আগেই সব কথা বলবেন–ওকে দিয়েও সায় দেওয়াবেন। বলবেন, কাজটা ভালো করলে না…
.
পরের দিন সকালে ক্যাসেট রেকর্ডার পৌঁছে গেল ইন্দ্রনাথের বাড়িতে। শেষের দিকে রাকেশ বলছে, তুমিই শুধু জানলে…।
ইন্দ্রনাথের টেপ শেষ হল, হার্লে ডেভিডসন ব্রেক কষলো ওর বাড়ির সামনে। আওয়াজ শুনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল ইন্দ্রনাথ–ঘর থেকে বেরোনোর আগেই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল একটি নারীমূর্তি। তার নাকের পাটা ফুলে-ফুলে উঠছে, দুই চোখে আগুন ঝরছে। চুল তার উসকোখুসকো, পোশাক ছেঁড়াখোঁড়া।
মূর্তিমতী প্রভঞ্জন বললে তীব্রস্বরে, আপনি ইন্দ্রনাথ রুদ্র? আমি গোয়েন্দানী নারায়ণী।
স্থির চোখে তাকিয়ে ইন্দ্র বলল, নাম শুনেছি। কী কাণ্ড করে এলে, বোন?
কর্নেল ফ্লিন্টের আস্তানা উড়িয়ে দিয়ে এলাম। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটা পাপের ডেরা। রাজাবাজার বস্তির আগুন নেভাতে কলকাতার সব দমকল এখন হাজির। নাইট্রোগ্লিসারিন আর আর. ডি, এক্স-এর গুদোম ছিল–উড়িয়ে দিয়েছি রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে। আমার গায়ে হাত। শয়তান। সিনথিয়াকে কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না।
চমকে উঠল ইন্দ্রর শিরদাঁড়া, সিনথিয়া ওখানে?
হ্যাঁ আপনাকেও যেতে হত। রাকেশ ফোনে জানিয়ে দিয়েছে ফ্লিন্টকে। তাই তাড়াতাড়ি বেরোতে গিয়ে লক্কাও খতম হয়ে গেল। যাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে ক্রিস্টিনকে। কিন্তু আপনি আসল জিনিসটা জানেন না–আমিও জানতাম না। জানত লক্কা–সে থাকলে নিজেই কবুল করত।
আসল জিনিস মানে?
লক্কার কাছে অ্যাপ্রোচ করেছিল ক্রিস্টিন-ও। খুন করাতে চেয়েছিল রাকেশকে। স্বামী আর স্ত্রী দুজনেই চেয়েছে একজন আর একজনকে খতম করতে। হরিবল। ইন্দ্রনাথদা, আমি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম–খতম করবই রাকেশকে।
মেহনিবিড় গলায় বললে ইন্দ্রনাথ, দরকার কী? বাঘের শত্রু ষাঁড়ে মারে। রাকেশের বিরুদ্ধে কেস পাকা করে এনেছি। এগোক আইনের পথে।
তাহলে আমি চলি আমার পথে।
নিমেষে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল মূর্তিমতী প্রভঞ্জন। নিরেট গম্ভীর নিনাদে সুভাষ সরোবর কাঁপয়ে উধাও হয়ে গেল মেটাল মন্সটারি।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়। একা নারায়ণী কর্নেল ফ্লিন্টের দুর্ভেদ্য দুর্গ উড়িয়ে দিল কী করে? বেরিয়ে এল কীভাবে?
আজকের ভারতীয় নারীই বিশ্বের প্রথম নারী যারা এভারেস্টের শৃঙ্গ জয় করেছে।
কৌশলে সবই হয়। সূক্ষ্ম বুদ্ধির কাছে চিরকালই পরাজিত হয়েছে মোটা বাহুবল।
মার্শাল আর্টে বলীয়সী নারায়ণী অবশ্য বাহুবলের একটা স্বাক্ষর রেখে গেছে দুর্গ উড়িয়ে দেওয়ার আগে। লক্কার পায়রার শিরদাঁড়া মাঝখান থেকে ভেঙে দিয়েছে। মুচড়ে দিয়েছে গলা– পুরো একপাক।
বাকি কাহিনি দীর্ঘ, বীভৎস এবং লোমহর্ষক। রক্ত জল হয়ে যেতে পারে। সুতরাং…!
* মিনোরমা পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ১৪০০)
শূন্য কলসী
এতটুকু একটা প্লেট। ফিকে গোলাপি প্লাস্টিক পেন্টের ওপর টুকটুকে লাল রঙে লেখা?
ক্যালকাটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি
রং নির্বাচন আর হরফের কায়দা থেকেই বোঝা যায়, এজেন্সির কর্ণধার যতই অভাবী হোক, তার রুচির অভাব নেই।
কবিতাও বলল, ঠাকুরপো নেমপ্লেটটি করেছে বেশ। কিন্তু এই ভাঙা মেসবাড়ি থেকে অফিস না ওঠালে, রেসপেকটেবল ক্লায়েন্টরা আসবে কেন?
কথাটা ঠিক। বিতার যুগপৎ ভ্রূকুটি আর সনির্বন্ধ অনুরোধেই শেষ পর্যন্ত কলকাতার সর্বপ্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি স্থাপিত হল ইন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায়। কিন্তু এই কি অফিস করার উপযুক্ত জায়গা? রংচটা দরজা আর নোনাধরা দেওয়াল দেখেই উদ্যমের অর্ধেক অন্তর্হিত হয়। তারপর দাঁত বার করা সিঁড়ি পেরিয়ে ইন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকে ভাঙা তক্তপোষ আর নড়বড়ে পায়া চেয়ার দেখেই তো বাকিটুকু আস্থাও কঞ্জুরের মতো উবে যায়।
তবে হ্যাঁ, এজেন্সির কর্ণধারকে দেখলে তার অতীত কীর্তিকলাপের কিছু কিছু শুনলে মনে ভরসা আসে বটে। সেদিনও দুজনে ঘরে ঢুকে দেখলাম, তক্তপোষের ওপর আড় হয়ে শুয়ে কঁচি ধ্বংস করছে ইন্দ্রনাথ। দুই চোখে তার শিল্পীর তন্ময়তা, দৃষ্টির অন্দরে অতলান্ত বিষাদ, আর ধারালো চিবুক ঠোঁট নাকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বিচ্ছুরণ।
কবিতার চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজেই চমকে উঠছিল ইন্দ্রনাথ। আমাদের দেখেই দু-হাত সামনে প্রসারিত করে মঞ্চ নটের কায়দায় দরাজ গলায় বলে উঠল, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বীরের বীর্য, কর্মীর কর্মোদ্যম, রূপকারের কলাকৃতিত্ব প্রভৃতি সভ্যতার সমস্ত বড় বড় চেষ্টার পিছনে নারীপ্রকৃতির গূঢ় প্রবর্তন আছে।
ভুরু কুঁচকে কবিতা বললে, তোমার অনেক রকম ঢং দেখেছি। কিন্তু এ-ঘরটার ভেতরে এমনকী intellectual beauty-র সন্ধান পেয়েছ যে–
দমভোর সুখটান দিয়ে গলগল করে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ইন্দ্রনাথ বললে, বসো, বসো, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–
