সিল্ক-সফট গলায় ফ্লিন্ট বললে, এই আমাদের লক্কা বাহিনীর বক্সার হাত ভেঙে দেয় হারিয়ে দিয়ে। তোমার কী করবে, সেটা পরে টের পাবে। লক্কা, তুই খুন করেছিস ক্রিস্টিনকে? উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতলবে হপ্তাকয়েক আগে স্কুলের মেয়েটাকে রেপ করে খতম করেছিলিস? আর একটা মেয়েকে লোপাট করে চালান দিয়েছিস?
ঘাড় নেড়ে সায় দিল লক্কা। চোখ কিন্তু নারায়ণীর দিকে। ঠোঁট চাটছে জিভ দিয়ে।
ক্রিস্টিনকে তুই আগে থেকে চিনতিস? আবার ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে গেল লক্কা নামধারী লম্পট।
সেই জন্যেই নির্জন বাড়ির গ্যারেজ ঘরে দেখা করেছিল তোর সঙ্গে?
হ্যাঁ, এতক্ষণে একটি অক্ষরে জবাব দিল লক্কা। চেঁচিয়ে গলা ভেঙে ফেললে কণ্ঠস্বর যেরকম দাঁড়ায়-লক্কার গলার সুর সেইরকম।
তার আগে ক্রিস্টিনের সঙ্গে তোর আলাপ হয়েছিল কেন?
দাঁত বেরিয়ে পড়ল লক্কার। লালচে-হলুদ দাঁত। হাসছে। হেসে-হেসে যা বলে গেল, শুনে থ হয়ে গেল গোয়েন্দানী নারায়ণী।
.
বকে-বকে ক্লান্ত হয়েছেন রতিকান্ত সমাদ্দার। এখন তিনি স্তব্ধ।
ইন্দ্রনাথ ডানহিল নামিয়ে রেখেছে। দুই চোখে দূরবিস্তৃত চাহনি। চিন্তাচ্ছন্ন চোখে তাকিয়ে আছে ঘরের ওপর কোণে।
একটু পরে দৃষ্টি ফিরে এল টেলিফোনের দিকে। তুলল রিসিভার। কথা হয়ে গেল প্রেমাদ ডিটেকটিভ এজেন্সির ক্যালকাটা ব্রাঞ্চে। ছোট্ট রিপোর্ট শুনে নিল টেলিফোনেই।
বললে, ডকুমেন্টারি এভিডেন্স সবই কি ক্রিস্টিনের কাছে?
না, জবাব এল তারের মধ্যে দিয়ে, উনিই আমাদের জানিয়েছিলেন বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয় বলে গচ্ছিত রেখেছেন বান্ধবীর কাছে।
বান্ধবীর নাম?
সিনথিয়া ডিয়েট্রিক।
তার ঠিকানা জানেন? জানেন। দেখুন তাকে পান কিনা।
আস্তে রিসিভার নামিয়ে রাখল ইন্দ্রনাথ। চিন্তাকুটিল চোখে কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বললে রতিকান্ত সমাদ্দারকে, রাকেশের ঠিকানা দিয়ে যান। হ্যাঁ, আপনি যান– আপনার কার্ডও রেখে যান। এর মধ্যে ব্রেনওয়ার্কটা কোথায়, তাই তো বুঝছি না। রাকেশ মার্ডার করিয়েছে কাউকে দিয়ে–তাকে চাই?
আজ্ঞে। তাহলেই রাকেশকে কোর্টে ফাসানো যাবে।
দেখি।
.
একঘণ্টা পরে বাজল রিঙ। ঘর এখন ফাঁকা। আর এক ছিলিম টানা হয়ে গেছে ডানহিলে। ঘণ্টা বাজতেই ছোঁ মেরে রিসিভার তুলে নিল ইন্দ্রনাথ। কানপেতে শুনল পিক পিক রিপোর্ট। নামিয়ে রাখল যন্ত্র।
সিনথিয়া কাল রাত থেকে নিরুদ্দেশ।
.
বাড়ি বটে একখানা। ছবিঘে ফুলবাগানে মাত্র দোতলা বাড়ি। প্রাসাদের খুদে সংস্করণ।
একতলার ঘরে পরিচয় হল রাকেশ মালহোত্রার সঙ্গে। অতিশয় সুদর্শন, অতিশয় মিষ্টভাষী, অতিশয় সফিসটিকেটেড এক যুবক। হিন্দি সিনেমার পরদা থেকে নেমে আসা হিরো বললেই চলে। এখন তার মুখ জুড়ে থইথই করছে বিষাদ-সমুদ্র। ঘরে সে একা ছিল না। সমবয়েসি প্রায় সমান সুদর্শন এক যুবক বসেছিল গম্ভীর মুখে। রাকেশই আলাপ করিয়ে দিল তার সঙ্গে। যুবকের নাম রোশনলাল। বাড়ি চণ্ডীগড়ে। অফিসও সেখানে। সল্টলেকে এসেছিল অফিসের কাজে। সকালে ইংরেজি কাগজ খুলে খবরটা পড়েই দৌড়ে এসেছে। রাকেশ তার অনেকদিনের বন্ধু। বিয়ের আগে থেকে।
পরিচয়-পর্ব সাঙ্গ হওয়ার পর রাকেশ চতুরভাবে চট করে চলে এল কাজের কথায়, মিঃ রুদ্র, আপনি ডিটেকটিভ। এ কেসে কে আপনাকে লাগিয়েছে?
কেউ না। নিজের ইন্টারেস্টেই এলাম।
সরু চোখে চেয়ে রইল রাকেশ। এখন তার মুখের বিষাদের মেঘ অনেকটা ফিকে।
কী জানতে চান বলুন?
আপনার স্ত্রীর এক বান্ধবীর নাম সিনথিয়া? সিনথিয়া ডিয়েট্রিক?
ঘাড় নেড়ে নীরবে সায় দিয়ে গেল রাকেশ। অনিমেষ চক্ষু নিবদ্ধ ইন্দ্রনাথের হীরক চক্ষুর ওপর।
গলায় শান দিয়ে নিল ইন্দ্রনাথ, তিনি এখন কোথায়?
অসাধারণ অভিনেতা বটে রাকেশ। অবিচল রইল মুখভাব। কিন্তু চোখের তারায় যেন লাগল ছোট্ট ধাক্কা। ক্ষীণ কঁপুনি চোখ এড়াল না ইন্দ্রনাথের।
রাকেশ বলল, এ প্রশ্ন আমাকে কেন?
কারণ তাকে পাওয়া যাচ্ছে না কাল রাত থেকে।
সিনথিয়া? কাল রাতেই তো ফোন করেছিল–যাকে চাইছিল, সে তখন ছিল না। এর বেশি তো জানা নেই।
উঠে দাঁড়িয়েছে রোশনলাল। হাওয়া যেরকম ভারি হয়ে উঠেছে, তার আর থাকা সমীচীন নয়। রাকেশের অনুরোধ এড়িয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একটু পরেই শোনা গেল তার গাড়ির আওয়াজ। জানলা দিয়ে নম্বর প্লেটটা দেখে নিল ইন্দ্রনাথ।
শক্ত গলায় বললে রাকেশ, মিঃ রুদ্র, কেউ যখন আপনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়নি–তখন আমি দিচ্ছি আপনাকে। পুলিশকে দিয়ে হবে না। ক্রিস্টিন-এর মার্ডারারকে বের করুন। আপনার পারিশ্রমিক কত?
একটু থেমে ইন্দ্রনাথ বললে, টোয়েন্টি থাউজান্ড। ফিফটি পারসেন্ট ইন অ্যাডভান্স।
পাঁচ মিনিট পরে ট্যাকসিতে উঠে বসল ইন্দ্রনাথ। ওর পকেটে ফুটছে দশহাজার টাকার একখানা চেক।
ঘুষ!
.
রাকেশ ভিলা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এসে তেমাথা। বাঁদিকে মোড় নিতে গিয়ে দাঁড় করাতে হল ট্যাক্সি।
রোশনলাল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে রুখেছে ট্যাক্সি। বললে, ট্যাক্সি ছেড়ে দিন, ইন্দ্রনাথবাবু, চলে আসুন আমার গাড়িতে।
.
সুভাষ সরোবর। ইন্দ্রনাথের বাড়ি। বৈঠকখানা ঘর।
ইন্দ্র বলছে, প্রথম পরিচয়েই আপনার পরিষ্কার বাংলা শুনে আঁচ করেছিলাম আপনি আদতে কলকাতার মানুষ। গাড়ির নাম্বার নোট করে নিয়েছিলাম–খুঁজে বের করতামই। কিন্তু আপনি এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। যা বললেন তা থ্রিলিং।
