কর্নেল এক দৃষ্টে চেয়ে আছে নারায়ণীর চোখের দিকে–যে চোখে চোখ রাখলেই রোমাঞ্চিত কলেবর হয় না–এমন পুরুষ ধরাধামে নেই।
কর্নেল ফ্লিন্টের ধমনীতে বইছে অর্ধেক ব্রিটিশ রক্ত। বাকি অর্ধেক এসেছে আরবের মরুভূমি থেকে।
ধূসর নির্ভাষ চোখে তার আভাস মেলে যখন সে পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে। এখনও সে চেয়ে আছে সেইভাবে।
শকুনির চোখে পলক পড়ছে না।
নারায়ণী বললে, প্রেমাদ ডিটেকটিভ এজেন্সির রিপোর্ট সব রহস্য ফাঁস করে দিয়েছে। প্রমাণ এনে দিয়েছে ক্রিস্টিনের হাতে। মার্গারেটের সব চিঠি রাকেশ রেখে দিয়েছিল অফিসে। বিজনেস ফাইলে। চিঠির তাড়া চলে এসেছিল ক্রিস্টিনের হাতে। ব্যভিচারিতার কেস মজবুত করার ডকুমেন্টারি এভিডেন্স। রাকেশকে চার্জ করেছিল ক্রিস্টিন। বলেছিল–শেয়ার দাও–ডিভোর্স দেব। প্রচণ্ড চেঁচামেচি হয়ে গেছিল সেদিন। বাড়ির ঝি জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে। যাওয়ার সময়ে বলে গেছে– এ বাড়িতে আর টেকা যাবে না। ঝি-কেও জেরা করে প্রেমাদ ডিটেকটিভ এজেন্সি জেনেছে সেদিন কী কী কথা হয়েছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।
কী যেন জিজ্ঞেস করতে গিয়েও চুপ করে গেল কর্নেল ফ্লিন্ট।
নারায়ণী বললে, ক্রিস্টিন খুন হয়েছে, এ খবর পেয়েই অত রাতে সিনথিয়া ছুটে এসেছিল আমার কাছে। রাকেশের পরনারী গমনের ডকুমেন্টারি এভিডেন্স তুলে দিয়ে গেছে আমার হাতে। তার কিছুক্ষণ পরেই পেলাম একটা খাম। লকারের চাবি আর তোমার চিঠি। টাকা নিয়ে সরে দাঁড়াতে বলেছ। তাই এলাম তোমার কাছে। চিঠির জবাব মুখেই দিয়ে যাই। রাকেশ মরবে–আমার হাতে। এই রইল তোমার লকারের চাবি–ক্ষমতা আছে বটে তোমার। অত রাতে বিলিতি ব্যাঙ্কের লোককে ম্যানেজ করলে কীভাবে?
বুকের খাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে লকারের চাবি টেনে এনে টেবিলে ছুঁড়ে দিল নারায়ণী। সেদিকে তাকাল না কর্নেল।
শুধু বললে রেশম মসৃণ নরম গলায়, দেবী, তুমি কথা বলছ ঠিক ভারতীয় নারীদের মত। অনেকদিন ধরেই তোমার খোঁজ রাখছিলাম। তুমি আমাদের পথের কাঁটা। পঁচিশ লাখেও তোমাকে কেনা গেল না। এরকম পঁচিশ আরও পেতে সুন্দরী যদি আসতে আমার আর্মিতে। চোখা মেয়ের বড় অভাব চলছে। যাক, যখন এলে না–তখন তোমাকেও রাখব না। পায়ের তলাতে ঘাস গজাতে আমি দিই না। ক্রিস্টিন আর সিনথিয়ার যে দশা হয়েছে–তোমারও হবে তাই।
চোখের পাতা একটুও কাঁপল না নারায়ণীর, দুহাত রয়েছে টেবিলের ওপর। চোখের কোণ দিয়ে টের পেল পেছনের দরজা নিশ্চয়ই একটু ফাঁক হয়েছে আলো ঢুকছে সেই কারণে। ফাঁক যখন হয়েছে, ফায়ার আর্মস-এর চোখও নিশ্চয় টিপ করেছে ওর পৃষ্ঠদেশ।
পিঠ সিধে রেখে বললে, ক্রিস্টিনকে খুন করেছে তোমার লোক?
এ বাড়িতেই সে আছে। আগে বসিং লড়ত। এখনও লড়ে দুশমনদের সঙ্গে। বড় বাজে অভ্যেস। হাত ভেঙে দেয় মোচড় দিয়ে। তোমার সঙ্গেও লড়বে। ধৈর্য ধরো, ভারতীয় নারী।
অবিচলিত কণ্ঠে বললে নারায়ণী, সিনথিয়ার কী দশা হয়েছে?
ভারি মিষ্টি হাসল কর্নেল ফ্লিন্ট, সে তো আমার হিট লিস্টেই ছিল। যার নুন খাব, তার কাজ পুরো করে দেব। রাকেশ সাহেবই দিয়েছিল মেয়েটার নাম ঠিকানা। নজরে ছিল বলেই দেখলাম অত রাতে দৌড়েছে তোমার কাছে। মাই গড। তোমার ডেরা থেকে বেরতেই তুলে আনলাম। সারারাত তাকে এনজয় করেছে আমার লোকগুলো। এখন ঘুমোচ্ছে। আজ রাতে তোমার পালা। তার রেস্ট। এইভাবেই চলুক কিছুদিন–তারপর লড়িয়ে দেব বক্সারের সঙ্গে–মেয়ে মর্দানির সঙ্গে কক্ষনও লড়েনি। নতুন টেকনিক দেখাবে মনে হচ্ছে। হাত ভেঙে হয়তো টেনে ছিঁড়ে আনবে–
বলে নারায়ণীর বক্ষশোভার দিকে তাকিয়ে উচ্চহাস্য করে উঠল ফ্লিন্ট।
এইটাই ছিল সঙ্কেত। এই হাসিটা। পুরো খুলে গেল পেছনের দরজা। উঠতে যাওয়াটা ভুল হবে বুঝে বসেই রইল নারায়ণী। পিঠে অনুভব করল শক্ত খোঁচা। ফায়ার আর্মস।
মিঠে হাসে ফ্লিন্ট, আমার অস্ত্রাগারের লেটেস্ট অটোমেটিক এখন তোমার পিঠে লেগেছে, সুন্দরী। দলে এসো, এরকম জিনিস অনেক পাবেনা এলে, ঈষৎ সঙ্কুচিত হল ফ্লিন্টের একটা চোখ।
খুলে গেল পরক্ষণেই, ভালো কথা, মাই বিউটি। এই কেসে অনেক খবরই রেখেছ–একটা খবর পাওনি। জানা দরকার তোমার। জানবার পর হয়তো রাকেশ হত্যার প্ল্যান মাথা থেকে মুছে ফেলবে। মাসুদ, লক্কা পায়রাটাকে পাঠিয়ে দে।
নারায়ণীর পিঠ থেকে নলচে সরে গেল না। মাসুদ নামধারী স্যাঙাৎ নিশ্চয় দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। ফ্লিন্ট চেয়েছিল সেইদিকেই। পায়ের আওয়াজ সরে গেল দুরে।
ফ্লিন্ট বলে গেল সিল্ক-নরম গলায়, তোমার মতো সুন্দরী একজনও যদি থাকত আমার আর্মিতে–ডোজ পড়লেই সুর অবশ্য পালটাবে–খালিস্তানিদের হাতেই তোমাকে ছেড়ে দেব ভাবছি। কলকাতায় ওদের সেলটার দিচ্ছি তো আমিও–মাথা পিছু এক লাখ অ্যাডমিশন ফী–রাতের খরচ আলাদা–তুমি থাকলে রোজগার হবে ভালোই।–এই যে লক্কা, এসো, ভেতরে এসো।
মার্জারের মতো নিঃশব্দ চরণে একব্যক্তি টেবিল ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল ফ্লিন্টের চেয়ারের পাশে। গায়ে গিলে করা কেমব্রিকের পাঞ্জাবি। বোতাম হিরের। ভেতরে গেঞ্জি নেই। ফরসা গা ফুটে বেরচ্ছে। ডুমোডুমো পেশি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঘাড়েগদানে সমান। শুয়োরের মতোন। মুখখানাও সেইরকম। অমানুষিকতা প্রকট হয়েছে প্রতিটি রেখায়। চাহনি ক্ষুধার্ত। চোখ দিয়ে যেন চেটে খাচ্ছে নারায়ণীর সর্বাঙ্গ।
