পুলিশের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে যা হওয়ার তাই হয়েছে; কেস আত্মহত্যার নয়নরহত্যা। চুরি ডাকাতিও হয়নি। রাকেশ সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত। কোনও জিনিসই খোয়া যায়নি। খুন হয়েছে চকিতে আর নিঃশব্দে। এত চুপিসারে যে নির্জন বাড়ির দোতলায় বসে টিভি দেখে গেছে তিনবছরের মেয়েটা টের পায়নি কিছু। রাকেশরা ফিরে আসার একটু আগেই হয়েছে মার্ডার। কেননা, ডেডবডির চারপাশে পড়ে থাকা রক্ত তখনও ছিল টকটকে লাল–পুরোপুরি অক্সিজেন বোঝাই। ফুলবাগান আর গাছপালা দিয়ে ঘেরা বলে বাড়িটা পাড়াপড়শিদের উঁকিঝুঁকির বাইরে। খুনি সহজেই চম্পট দিয়েছে।
ইন্দ্রনাথবাবু, এই পর্যন্ত সব পরিষ্কার। এ কেস নিয়ে পুলিশ আর মাথা ঘামাবে না–তাদের অনেক বড় কাজ রয়েছে। স্ত্রী যখনই খুন হচ্ছে, রাকেশ তখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রায় বিশ মাইল দুরে কলকাতার নিউমার্কেটে সুতরাং স্ত্রী হত্যার দায়ে তাকে ফেলা যায় না।
কিন্তু আমার সন্দেহ তাকেই। কারণ? মাস তিনেক আগে ক্রিস্টিন আমার কাছে গেছিল। গোয়া থেকে তার বাবা আর মা বলেছিল অ্যাডভোকেটকে সব কথা জানিয়ে রাখতে। সব কথার সার একটাই কথা। রাকেশকে ডিভোর্স করতে চায় ক্রিস্টিন। বাবা-মাকে যা লিখে জানিয়েছে আমাকেও বলে গেল সেই কথা।
বাইরে সুখের চালচিত্র আঁকলেও ভেতরে-ভেতরে জ্বলছিল অশান্তির আগুন। সুখের হয়নি এ বিয়ে। আগেই বলেছি আপনাকে, অমৃতসরের বান্ধবী মার্গারেটকে কলকাতায় এনে বিয়ে করতে চেয়েছিল রাকেশ। মার্গারেট আসতে চায়নি কারণ, তখন রাকেশের পকেট ছিল গড়ের মাঠ– ছুঁচোয় ডন মারছিল সেখানে। ঘোড়েল মেয়ে মার্গারেট তাই ছিল তফাতে।
বোম্বাই গিয়ে আর এক গোয়ানিজ মেয়ে পেয়ে তাই বর্তে গেছিল রাকেশ। মার্গারেটকে টাইট মারার মোক্ষম সুযোগ। টাইট খেয়ে গেছিল মার্গারেট।
গোয়ায় ক্রিস্টিনকে নিয়ে গিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের ঐশ্বর্যের কথা জাহির করেছিল রাকেশ ভয়ানক ঘুঘু বলেই খবর চলে যাক মার্গারেটের কাছে। জ্বলে মরুক ঈর্ষায়।
হয়েও ছিল তাই। ধূর্ত মার্গারেট যখন দেখলে, পাখি প্রায় উড়ে গেছে, তখন ফঁদ পেতেছিল মেয়েদের চিরকালের ছলাকলা দিয়ে।
সে ফঁদে ধরা পড়েছিল রাকেশ।
চিঠিপত্র চলছিল সমানে–প্রথম-প্রথম ক্রিস্টিন কিসসু জানতে পারেনি।
পারল সেইদিনই, যেদিন মার্গারেট এল কলকাতায়। লর্ড সিনহা রোডের একটা গোয়ানিজ ফ্যামিলির বাড়িতে উঠল পেয়িং গেস্ট হয়ে। গোপনে দেখাসাক্ষাৎ চালিয়ে গেল রাকেশের সঙ্গে।
ক্রিস্টিনের তা অজানা রইল না। প্রথম সন্দেহটা হয়েছিল রাকেশের হাবভাব দেখে। মেয়েরা সব বোঝে। ওদের কাছে কিছুই লুকোনো যায় না। প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়ে–
এই পর্যন্ত শুনে ইন্দ্রনাথ ডানহিল নামালো দাঁহের ফঁক থেকে।
বললে, জানি।
আশ্চর্য হলেন রতিকান্ত সমাদ্দার, কীভাবে?
প্রথমে এসেছিল আমার কাছে। এসব পেটি কেস আমি হ্যান্ডল করি না শুনে রেগেমেগে বেরিয়ে গেছিল। তবে কোথায় গেছিল, সেটা জানি। ঠিকানাটা আমিই দিয়েছিলাম।
জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইলেন রতিকান্ত সমাদ্দার।
ইন্দ্রনাথ বললে, প্রেমচাঁদ প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে–আমার বন্ধুর অফিসে। তারপর?
.
রতিকান্ত সমাদ্দার বলে চললেন তার বাকি কথা। প্রায় একই কথা।
ঠিক সেই সময়ে শোনা যাচ্ছিল গোয়েন্দানী নারায়ণীর কণ্ঠ–অন্য জায়গায়।
সে এখন বসে রয়েছে রাজাবাজারের বস্তি পাড়ায়। দিনের আলোয় এখানে হাজারো বিজনেসের জলুস। রাতের অন্ধকারে গলিখুঁজিতে চোখ জ্বলে আদিম কামনায়, চলে হরেক পাপের অগুন্তি ব্যবসা। গেরস্থরা সেসবের খবর রাখে না।
রাখে কিন্তু গোয়েন্দানী নারায়ণী। সে যে এই লাইনের লোক। বিচরণ করে অবশ্য রাজহংসীর মতো। কাদা আর পাঁক গায়ে লেগে থাকে না।
রাতের নগরী কলকাতায় যে-যে অঞ্চল কুৎসিত আর ভয়াবহ হয়ে ওঠে–এই পাড়া সেগুলোর একটা।
বড় রাস্তায় ট্রামলাইন ঘেঁষে সারি-সারি ঝকমকে দোকান। তিনতলা একটা বাড়ির একতলাতেও তাই। দোতলা আর তিনতলায় অন্য অফিস। বৈধ উপায়ে অবৈধ কাজের অফিস।
নারায়ণী বসে রয়েছে এমনি একটা অফিসে। ওর সামনে একটা চৌকোনো টেবিল। অদ্ভুত ডিজাইন। ঘরটাও চৌকোনা। সিলিং খুব নিচু। সাদা প্লাস্টারের ফুল লতাপাতা। দেওয়ালে ডুমোডুমো ফোম রবারের গদি। সাউন্ড-প্রুফ ঘর। একটি মাত্র দেড় টন এয়ারকন্ডিশনার চলছে ফুরফুর করে।
টেবিলের ওদিকে বসে কর্নেল ফ্লিন্ট। সেল্ফ-স্টাইলড কর্নেল। আর্মিতে জীবনে নাম লেখায়নি। তার আর্মি সে নিজে গড়ে নিয়েছে। বেকারের অভাব নেই। তার কাজের লোকের অভাব নেই। নিজে জন্মেছিল পতিতার গর্ভে। ব্যবসা জমিয়েছে পতিতাপল্লীতেই। জমজমাট ব্যবসা। তার শেকড় সর্বত্র। বটগাছ বললেই চলে।
বয়স বেশি নয় কর্নেল ফ্লিন্টের। মাত্র পঁয়ত্রিশ। নিপাট ভালো মানুষের মতো চেহারা। রোগা। বেঁটে। শুকনো। এরকম অ্যাংলো গণ্ডায়-গণ্ডায় দেখা যায় ইলিয়ট রোডে।
নারায়ণী তার চোখে-চোখে চেয়ে বলে যাচ্ছে, কর্নেল, প্রেমাদ ডিটেকটিভ এজেন্সিতে ক্রিস্টিন দরবার করার আগে ওর প্রাণের সখী সিনথিয়াকে জানিয়ে রেখেছিল রাকেশের সঙ্গে বিয়েতে ঘুণ ধরেছে। এজেন্সি থেকে সিক্রেট রিপোর্ট পাওয়ার পর বলেছিল সিনথিয়াকে, ওরা আমাকে সরিয়ে দেবেই। ঘর করছি একটা পিশাচের সঙ্গে। ডিভোর্স দেবে না। দিলেই তো খোরপোষ চাইব। প্রপাটির শেয়ার চাইব। বিজনেস দারুণ চলছে। বছর পনেরো নিশ্চিন্ত টাকার হিসেব থাকবে না। ডিভোর্স দেবে না ওই জন্যেই। কিন্তু আমাকেও বাঁচতে দেবে না। সিনথিয়ার বিশ্বাস, রাকেশই খতম করেছে। ক্রিস্টিনকে। কাল এসে বলে গেল সব কথা। পুলিশ কিছু করবে না। কিনে রেখেছে রাকেশ। সিনথিয়াকে বলে দিয়েছি, রাকেশকে দিয়েই কবুল করাববিশ মাইল দূরে থেকেও ভাড়াটে লোক দিয়ে সে-ই খুন করিয়েছে ওয়াইফকে।
