এত নৈঃশব্দ্য ভালো লাগছে না গজাননের। পায়ে-পায়ে নিবিড় বনানী ছাড়িয়ে এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় আসতেই আচম্বিতে সারা দেহে অনুরণন অনুভব করল গ্রেট জি।
প্রতিটি লোমকূপ যেন তরঙ্গায়িত হচ্ছে। গোড়ায়-গোড়ায় যেন বিদ্যুৎ সঞ্চারিত হচ্ছে। বডিটাও বেশ হালকা লাগছে। পা ফেলতে গিয়ে সেটা আরও ভালোভাবে টের পাওয়া গেল। পা খানা মাটিতে পড়ল না।
জোর করে পা দিয়ে মাটি স্পর্শ করতে গিয়ে পেছনের পা-খানাও উঠে এল মাটি ছেড়ে– গজানন না চাইতেই।
পায়েদের এবম্বিধ অবাধ্যতা গজানন অন্তত সইতে পারে না। কোনওমতেই না। হেঁট হয়ে তাই দেখতে গেছিল পা দুখানা আছে কোথায়…
চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ।
দুটো পা-ই মাটি থেকে অনেক ওপরে। তা প্রায় দশফুট তো বটেই। অন্ধকারে সঠিক মালুম হচ্ছে না। তবে হাড়ে-হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
গজানন শূন্যে ভেসে উঠেছে। এবং আরও উঠছে। দেখতে-দেখতে গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে দেহমন্দির উঠে এল বেশ উঁচুতে।
আর তারপরেই দেহময় বিদ্যুৎপ্রবাহ এমনই প্রবল হয়ে উঠল অকস্মাৎ যে জ্ঞান লোপ পেল গজাননের।
.
গজানন জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে। মাথার ওপর জ্বলছে চৌকো টালির মতো একটা সাদা আলো। নরম আভায় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে না।
চোখের মণি ঘুরিয়ে (দেহ না নাড়িয়ে) আশপাশ দেখে নিল গজানন। জ্ঞান ফিরে পেলেই তথাকথিত নায়কদের মতো আমি কোথায়? বলার ট্রেনিং সে পায়নি। ব্যাপারটা গুরুতর, তা আঁচ করেছে চৈতন্য ফিরে আসতেই। তার আগে জানা দরকার, বেলুনের মতো শূন্যে ভাসিয়ে তাকে আনা হয়েছে কোথায়।
বিশাল গহ্বর মনে হচ্ছে না? আশেপাশে অনেকদূর পর্যন্ত ফাঁকা তারপর পাহাড়ের দেওয়াল বলেই তো মনে হচ্ছে। সে দেওয়াল আঁধারের মাঝে উঠে গেছে অনেক ওপরে–অনেকটা গম্বুজঘরের মতো গোল হয়ে জড়ো হয়েছে মাথার ওপর।
চৌকো আলোক-টালির ফাঁক দিয়ে বহু উঁচুতে দেখা যাচ্ছে রন্ধ্রপথ। পর্বতচূড়া নিঃসন্দেহে। আকাশ আর তারা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সুস্পষ্ট।
জয় মা কালী! এ কোথায় এনে ফেললে মা আমাকে! এ যে ফোঁপরা পাহাড়। প্রকৃতিতে এরকম বিস্ময় বিরল নয়, তা জানে গজানন। নেচার বহুত মিস্টিরিয়াস। কি কিন্তু শত্রু ঘাঁটি এহেন স্থানে।
জুলজুল করে চেয়েই রইল গজানন। একটা আঙুল আগে নাড়াল। নড়ছে। তারপর টের পেল সারা দেহটাই নাড়ানো যাচ্ছে। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ তাকে না বেঁধেই ফেলে রেখে গেছে। তোবা! তোবা! কিন্তু কেন? লম্ফ দিয়ে চম্পট দেবে নাকি?
কিন্তু তা হল না। ওই একটু আঙুল নাড়ানোতেই সজাগ হয়ে উঠেছিল পাশের একটা যন্ত্র। দেখতে অবিকল স্টার ওয়ার্স সিনেমার পিপে রোবটের মতো। যন্ত্রচক্ষু এতক্ষণ সজাগ নজর রেখেছিল তার ওপর। এবার সরব হল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর।
গজানন মহাশয়, আপনি অযথা নড়িবেন না। প্রাণ যাইতে পারে।
ওরেব্বাস! এ যে সাধু ভাষায় কথা বলে। গলার আওয়াজটা যদিও খাসা স্টিরিও বাজনার মতো।
যথাসম্ভব মধুর কণ্ঠে গজানন বললে, বৎস রোবট, আমাকে এই স্থানে লইয়া আসিয়াছ কেন?
আপনার মস্তিষ্ক কাটিয়া ক্লোনিং কপি রোবট বানাইব বলিয়া।
ভেতরে-ভেতরে আঁতকে উঠলেও গজানন অকস্মাৎ অট্টহাস্য করে উঠল। যন্ত্ররা বিরক্ত হতে জানে না। তাই অবিচল কণ্ঠে বললে, হাস্যের কারণ জানিতে পারি কি?
নিশ্চয়, নিশ্চয়। বৎস রোবট—
আমার নাম সি-কে-টু-ফোর।
ওকে! ওকে! মাই ডিয়ার সি-কে-টু-ফোর, আমি যে অলরেডি রোবট।
প্রাঞ্জল করিয়া বলুন।
আমি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলাম। মানসিক ডাক্তার আমার ব্রেনটাকে বদলাইয়া দিয়া সুস্থ করিয়াছে।
ব্রেন স্ক্যান করিয়া সেরূপ কোনও লক্ষণ দেখা যায় নাই।
তোমাদের যন্ত্রে দেখা যাইবে না। ইহা এক প্রকার কেমিক্যাল হরমোন-ধাতু নয় যে দেখা যাইবে।
কেমিক্যাল হরমোন?
ইয়েস মাই ডিয়ার সি-কে-টু-ফোর, ইতিপূর্বে ক্লোনিং কপি রোবট বানাইয়াছ এবং আমাকে খতম করিবার জন্য পাঠাইয়াছ, তাহাদের আমি খতম করিয়াছি এই কারণেই।
যন্ত্র চুপ। আর এক দফা অট্টহাসি হাসল গজানন।
বলল, শূন্যপথে আনিলে কীভাবে আমাকে?
হাইপার ফোর্স দ্বারা।
সে বস্তুটা কী?
অ্যান্টিগ্র্যাভিটি।
সে তো কল্পবিজ্ঞানে হয় শুনিয়াছি।
বিজ্ঞান তাহার হদিশ জানিয়াছে। এই পৃথিবীতেই ছশো ফুট ওপর পর্যন্ত হাইপার ফোর্সের অস্তিত্ব রহিয়াছে। আমরা কেবল তাহাকে জোরদার করিয়াছি।
উত্তম করিয়াছ। এবার আমাকে ছাড়িয়া দাও।
তৎপূর্বে আপনার ব্রেনের কেমিক্যাল টেস্ট হইবে।
তোমার মুণ্ডু হইবে, বলেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছে গজানন, এমন সময়ে থ হয়ে গেল পুঁতিবালাকে দেখে।
বহু উঁচু থেকে পাহাড়চুড়োর ছিদ্রপথ দিয়ে লম্বভাবে সটান শূন্যপথে নেমে এল একটা নারীমূর্তি। দাঁড়াল তার সামনে।
পুঁতিবালা। কটমট করে তাকিয়ে আছে সি-কে-টু-ফোরের দিকে। সি-কে-টু-ফোর যেন সন্ত্রস্ত হল সেই মূর্তি দেখে। কয়েক ইঞ্চি পেছনে সরেও গেল। কিন্তু তার আগেই ধেয়ে গেল পুঁতিবালা। খোঁপা থেকে একটা চুলের কাটা বের করে ঢুকিয়ে দিলে রোবটের অনেকগুলো ফুটোর একটায়।
সবকটা আলো নিভে গেল সি-কে-টু-ফোরের গায়ে, গোঙানির মতো একটা যান্ত্রিক আওয়াজ কেবল নির্গত হল স্পিকার থেকে।
ঘুরে দাঁড়াল পুঁতিবালা। বললে খুব সহজ গলায়–ফিউজ করে দিলাম।
