সেই সঙ্গে ওর স্বামীরও। কথায় বলে স্ত্রীভাগ্যে ধন। টাকায় টাকা বাড়ে। রাকেশের টাকা বস্তায় বেঁধে রাখবার সময় এসে গেছিল। দুদিনেই একটা আনকোরা নতুন মারসিডিজ বেঞ্জ কিনে দিয়েছিল ক্রিস্টিনকে। বিয়ের উপহার। ওই গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছিল দেশ বেড়াতে আপনারা যাকে বলেন হানিমুন–তাই আর কি–গেছিল গোয়ায়। টাকা উড়িয়ে ছিল জলের মতো। শ্বশুরবাড়ির লোকের চক্ষুস্থির করে ছেড়েছিল ঐশ্বর্য দেখিয়ে। হইহই পড়ে গেছিল গোটা গোয়ায়।
থাক সে কথা। কলকাতায় ফিরেই নিজের নতুন বাড়ি বানিয়েছিল রাকেশ। এতদিন পরকে জায়গাজমি বাড়ি জুটিয়ে দিয়েছে–এবার বউয়ের চাঁদমুখে আরও হাসি ফুটোনোর জন্যে তৈরি করে নিল নিজের থাকবার জায়গা। ছোটখাট একটা প্রাসাদ। শহর থেকে অবশ্য দূরে। ডায়মন্ডহারবার যাওয়ার পথে। ছ-বিঘে ফুলের বাগানের ওপর ছিমছাম বাড়ি। অথচ তার মধ্যে আছে রাজসিক রুচি। বিলাস কাকে বলে, এ বাড়িতে ঢুকলে হাড়ে-হাড়ে টের পাওয়া যায়। এমনকি গাড়ি রাখার গ্যারেজেও রেখেছে চোখ ট্যারা করে দেওয়ার ব্যবস্থা। গ্যারেজের সামনে এসে দাঁড়ায় গাড়ি। ড্রাইভার গাড়িতে বসেই রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে রোলিং শাটার ঘুরিয়ে তুলে দেয় ওপরে। শুনেছেন? তাহলে দেখেই আসুন। রাকেশের সঙ্গে আপনার কথা বলা দরকার।
সুখেই ছিল দুজনে। এ যুগের লায়লা মজনু। দেখে ঈর্ষা হত মশাই। চোখ টাটাত পাঁচজনের। হিন্দি সিনেমাতেই এমনি রূপকথা দেখা যায়। রূপকথা যে সত্যি হয়, তা এই কলকাতায় এসে দেখিয়ে দিল রাকেশ। ছেঁড়া কাঁথা থেকে সোনার খাটে গা রূপোর খাটে পা। বুক ফেটে যাবে না?
পরশ্রীকাতরদের কথা বাদ দিচ্ছি। কথায় বলে নজরে বিষ থাকে। সেই বিষেই বুঝি ধ্বংস হয়ে গেল সুখের ফ্যামিলিটা। এবার আসি সেই কথায়।
কয়েক হপ্তা ধরেই ডায়মন্ডহারবার অঞ্চলের খুনখারাপির কথা কাগজে বেরচ্ছে বটে কিন্তু দায়সারাভাবে। গোটা দেশজুড়ে চলছে নারকীয় নৃত্য। ডায়মন্ডহারবারের দু-চারটে মানুষের প্রাণ গেলে কারও গদি কাঁপে না।
কয়েক সপ্তাহের আগের ঘটনা বলছি। স্কুলের একটি মেয়েকে রেপ করে মেরে ফেলা হয়। রাকেশ-ভিলা থেকে মাত্র মাইলখানেক দূরে। আর একটা মেয়েকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।
তারপরেই ঘটল কাল রাতের ঘটনা।
বাড়িতে লোকজন এসেছিল। রাকেশেরই বন্ধুবান্ধব। হইহুল্লোড় চলেছে সকাল থেকেই। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, সাঁতার…
বলতে ভুলে গেছি। ছবিঘে বাগানবাড়ির মধ্যে সুইমিং পুলও রেখেছে রাকেশ। ভারি সুন্দর ডিজাইন। ঠিক যেন নীল রঙের একটা ঝিনুকের খোলা।
একদম তলায় কাঁচটাকা আলো। সে আলো জ্বললে মনে হয় বুঝি মুক্তো ঝিলিক মারছে শুক্তির বুকে।
দুপুর নাগাদ খানাপিনা শেষ করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে কলকাতায় শপিং করতে গেছিল রাকেশ। নিয়ে গেছিল ক্রিস্টিনের মার্সিডিজ ৩০০ সেল গাড়িখানা। নিজের ক্যাডিলাক গাড়ি রেখে গেছিল গ্যারেজে। টাকার তো মা-বাপ নেই। প্রোমোটার হলে যা হয়–যেভাবে পারে টাকা উড়িয়েছে।
ফটকে দাঁড়িয়ে বিদায় জানিয়েছিল ক্রিস্টিন। সঙ্গে যায়নি। বাড়িতে তার অনেক কাজ। ঘরদোর পরিষ্কার করতে হবে। রাতের খানাপিনা রেডি করতে হবে। তিন বছরের মেয়েটাকে সঙ্গ দিতে হবে।
কত বয়স ক্রিস্টিনের।
তেত্রিশ। রাকেশের চল্লিশ। দেখলে অবশ্য বুঝবেন না। সুখ মানুষের বয়স কমিয়ে দেয়।
গেস্টদের নিয়ে রাত পৌনে নটায় বাড়ি ফিরেছিল রাকেশ। গাড়িতে বসে বলেছিল বন্ধুদের, কাঁটায় কাঁটায় পৌনে নটা। এক রাউন্ড কফি হয়ে যাক। তারপর চলবে হুইস্কি। জনি ওয়াকার।
এই বলেই রিমোট কন্ট্রোলে খুলে দিয়েছিল গ্যারেজের রোলিং শাটার, মার্সিডিজের জোরালো হেডলাইট গিয়ে পড়েছে শাটারে। মেঝে ছেড়ে একটু-একটু করে উঠছে ওপর দিকে। তলার ফাঁকে দেখা গেছিল চকচক করছে রক্তের ধারা–গড়িয়ে বেরিয়ে আসছে গ্যারেজের ভেতর থেকে।
শাটার তখনও উঠছে ওপর দিকে। স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে থ হয়ে বসে রয়েছে রাকেশ। চোখ ঠিকরে আসছে গেস্টদের। তারপরেই শুধু একটা নাম আর্তনাদের আকারে বেরিয়ে এল রাকেশের ভাঙা গলা দিয়ে–ক্রিস্টিন।
শাটার পুরো উঠে গেছে ওপরে। মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে ক্রিস্টিন। রক্তের নদীর মধ্যে। রক্ত ছিটকে লেগেছে পাশের ক্যাডিলাক গাড়িতে। ভোতা ভারি হাতিয়ার দিয়ে পিটিয়ে ছাতু করা হয়েছে মাথা। পাশবিক জিঘাংসা না থাকলে এমনভাবে খুন করা যায় না।
গ্যারেজে যখন নরপশু পিটছে মা-কে, মেয়ে তখন কোথায় জানেন? ওপরতলায়। মুগ্ধ চোখে দেখছে টেলিভিশন। রোলিং শাটার যখন উঠে গেল–তখন সে বসে টিভির সামনে। মা কখন আসবে, গল্প বলবে, ঘুম পাড়াবে–এই প্রতীক্ষায় একদম নড়েনি বিছানা ছেড়ে। পুলিশ এসেছিল কাল রাতেই। পাড়াপড়শি বলেছে, এ সেই প্রফেশনাল কিলার-এর কাজ। হপ্তা কয়েক আগেই যে লোকটা স্কুলের মেয়েকে রেপ করে পিটিয়ে মেরেছে–একই ভাবে মাথা গুঁড়িয়েছে ডান্ডা মেরে–আর একটা মেয়েকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।
ক্রিস্টিনের সুন্দর শরীরটাকেও কি ভোগ করেছিল নরপশু?
টাকায় সব হয়। কনট্যাক্ট থাকলে সবাই নড়ে বসে। আজ সকালেই স্পেশাল অটোন্সি রিপোর্ট পাওয়া গেছে। রেপ করা হয়নি ক্রিস্টিনকে। খুবলোয়নি শরীরের কোনও জায়গা। শুধু সাতবার ডান্ডা মেরেছে মাথায়।
