পাতাল ঘরে আর কেউ নেই।
ড্রয়ারে রয়েছে তাড়াতাড়া নোট। একশো টাকার নোট। পঁচিশটা থাক। প্রতিটা থাকে দশটা বান্ডিল।
এক-এক বান্ডিলে দশ হাজার। মোট পঁচিশ লাখ।
অনিমেষে সেকেন্ড কয়েক চেয়ে রইল নারায়ণী। স্পর্শ করল না। শুধু তেউড়ে গেল রসালো অধর। শ্বাপদ ভঙ্গিমায়।
.
ঠিক এই সময়ে বেলেঘাটার সুভাষ সরোবরের পাড়ে ইন্দ্রনাথ রুদ্রর বৈঠকখানা ঘরে জমে উঠেছে আর এক নাটক।
অনেকদিন পর পাইপের তাম্রকুট সেবন করছে ইন্দ্রনাথ। ব্রায়ার নয়, স্ট্রেট পাইপ। ডানহিল পাইপ, শুধু পাইপটারই দাম পাঁচ হাজার টাকা। এইমাত্র উপহার দিলেন অ্যাডভোকেট রতিকান্ত সমাদ্দার।
উনি বসে আছেন ইন্দ্রনাথের সামনের সোফায়। বয়স প্রায় পঞ্চান্ন। অতিশয় রোমশ। তার কানে চুল। ভুরুর চুল বাড়ির কার্নিশের মতো ঠেলে রয়েছে। মাথাভরতি কঁচাপাকা চুল গালপাট্টা হয়ে নেমে এসেছে চোয়াল পর্যন্ত। বলিষ্ঠ আকৃতি। গায়ে খদ্দরের হাফহাতা বুশশার্ট। ট্রাউজার্স এতই ঢলঢলে যে পাজামা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। বড় গম্ভীর। কাজ ছাড়া কিছু বোঝেন না।
আসন গ্রহণ করেই তিনি বলেছিলেন, ইন্দ্ৰনাথবাবু, শুনেছি আপনি রহস্যভেদ করেন তাতে আনন্দ পান বলে। ব্রেনওয়ার্ক না থাকলে কেস টেকআপ করেন না। আমি এইরকম একটা কেস আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। যার কেস, মানে আমার যে মক্কেল, সে খুন হয়েছে গতকাল রাতে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ অ্যাপয়েন্ট করার ভার সে আমাকে দেয়নি। টাকা পয়সার ব্যবস্থাও করে যায়নি। আমি নিজেই এসেছি। পারিশ্রমিক দিতে পারব না। তবে একটা স্মোকিং পাইপ উপহার দেব। যা আপনি একসময়ে খুব ভালোবাসতেন।
ভূমিকা শেষ করে ডানহিল পাইপটা আর টোব্যাকো ইন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন
রতিকান্ত সমাদ্দার।
মৌজ করে সেই পাইপ থেকেই এখন অনর্গল ধূম বিতরণ করছে ইন্দ্রনাথ। আধবোজা চোখে চেয়ে আছে সমাদ্দার মশায়ের দিকে।
রতিকান্তবাবু বলছেন :
আমার সমস্ত মক্কেল অবাঙালি। গুড পে-মাস্টার। পয়সাকড়ি নিয়ে কখনও ভোগায় না। রাকেশ মালহোত্রা এদের একজন।
জন্ম তার পাঞ্জাবে। ডাকাতদের গুলিতে খতম হয়েছিল বাবা আর দাদা। তখন তার বয়স বারো। মাকে নিয়ে লড়তে হয়েছে তখন থেকেই। লেখাপড়া করবার সুযোগ পায়নি। পয়সা তো ছিল না। মায়ে-পোয়ে রাস্তাও ঝেটিয়েছে, নর্দমা সাফ করেছে, তাতেও দুবেলা খাবার জোটেনি।
একটু বড় হয়ে ট্রাক ড্রাইভারি আরম্ভ করেছিল। বছর তিনেক সেই কাজ করে হাতে একটু পয়সা জমতেই চলে আসে কলকাতায়। হাওড়া স্টেশনে যখন পা দিয়েছিল, তখন তার পকেটে ছিল মাত্র চোদ্দো টাকা।
নতুন জায়গা। নতুন মানুষ। বাংলাও জানে না। কিন্তু উদ্যোগী পুরুষের ভাগ্য সহায় হয়। কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল একটা গ্যারেজে। লরির যন্ত্রপাতিতে গ্রিজ লাগানোর বাঁদুরে কাজ, মজবুত চেহারার দৌলতে পরে একটা কারখানায় দারোয়ানি করেছে। রাস্তায় হেঁকে তালা বিক্রিও করেছে।
কিছু টাকা জমতেই চলে গেছে অমৃতসর। মা ছিল ওইখানেই। নিয়ে এসেছে কলকাতায়। তারপর শুরু করেছে জমি কেনাবেচার কাজ।
ভাগ্য খুলেছে তখন থেকেই। ফুলে উঠেছে ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স। পরের কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ঘুরে এসেছে অমৃতসরে। একা। কারণ অমৃতসরে ছিল ওর গার্লফ্রেন্ড। মার্গারেট। জন্ম তার গোয়ায়। খ্রিস্টান। বাবার চাকরি ছিল অমৃতসরে। বন্ধুত্ব জমেছিল রাকেশের সঙ্গে।
কিন্তু ওই পর্যন্তই। বছরের পর বছর, সেধেছে রাকেশ। কলকাতায় আসেনি মার্গারেট। বিয়ে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার চলে না।
ফলে, শীতল হয়ে আসে দুজনের সম্পর্ক।
এদিকে ফুলে ফেঁপে উঠছিল রাকেশের বিজনেস। জমি কেনাবেচা ছাড়াও ফ্ল্যাট বানিয়ে বেচে দেওয়ার আইডিয়াটা তখনই মাথায় আসে ওর। এখন যাকে প্রোমোটার বলি, তাই। কোম্পানির নাম দিয়েছিল ইডেন গার্ডেন্স লিমিটেড।
চড়চড় করে ব্যবসা বেড়ে যেতেই যাতায়াত শুরু হয়েছিল বোম্বাইতে। টাকা তো ওখানেই। কৌশলও ওখানে।
এই সময়ে ক্রিস্টিন-এর সঙ্গে আলাপ হয় রাকেশের। গোয়ানিজ খ্রিস্টান। লাভলি মেয়ে। রিয়াল বিউটি। পেশায় ছিল মডেল। রাকেশের সঙ্গে আলাপ একটা ফিল্ম প্রোডিউসারের অফিসে। এই অফিসেই মডেলিং করছিল ক্রিস্টিন। রাকেশ গেছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্বন্ধে জানতে। কঁচা টাকা হাতে এলে সবাই যা করতে চায়।
শেষ পর্যন্ত ফিল্ম লাইনে যায়নি রাকেশ। তবে ওই লাইন থেকেই তুলে এনেছিল ক্রিস্টিনকে। যে প্রোডিউসারের অফিসে আলাপ, তাকেই বিয়ে করবে ঠিক করেছিল ক্রিস্টিন। কিন্তু সে প্ল্যান ভেস্তে দিয়েছিল রাকেশ। টাকা মানুষকে পালটে দেয়। কথায় সে চৌকস। চেহারায় রাজপুত্র। টাকার কুমির। প্লেনে চাপিয়ে ক্রিস্টিনকে নিয়ে এল কলকাতায়। বিয়ে করল পরের মাসেই।
বিয়ের পরও মডেলিংয়ের কাজ ছাড়েনি ক্রিস্টিন। এ এক নেশার কাজ। আনন্দ ছাড়া বাঁচবে কী করে মেয়েটা। তাই পার্ক স্ট্রিটের একটা মডেলিং এজেন্সিতে নাম লিখিয়ে রেখেছিল। তখন ওর বয়স সাতাশ। সূচনা থেকে বোঝা গেছে উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে বিলক্ষণ। বম্বের মেয়ে, গোয়ানিজ কালচার। ফ্রী, ফ্র্যাঙ্ক, স্মার্ট, ইজি। বিজ্ঞাপনের একটা সিরিজে ওই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে পাওয়াই গেল না কলকাতায়। গাড়ি কোম্পানির বিজ্ঞাপন। বেরিয়েছিল খবরের কাগজে। চিতাবাঘের চামড়া দিয়ে তৈরি অদ্ভুত ড্রেস পরে বাগিয়ে রয়েছে একটা বর্শা বিঁধিয়ে দিতে যাচ্ছে সামনের চকচকে সাদা গাড়িটার গায়ে। আইডিয়ার বলিহারি যাই! কাগজে দেখেছেন? গুড। সেই মেয়েই হল ক্রিস্টিন– আমার মার্ডাড ক্লায়েন্ট। ক্লিক করেছিল সিরিজটা। কপাল খুলে গেছিল ক্রিস্টিনের।
