নারায়ণী তাই নিজেই শিকার ধরে, নিজেই তার বিচার করে, নিজেই তাকে নিকেশ করে। নারায়ণীর বিচারালয়ে আপিল হয় না, পলিটিক্যাল কানেকশন কাজ দেয় না, উৎকোচের স্তূপ তাকে আরও ক্ষমাহীনা করে তোলে।
এই মুহূর্তে তাই ঘটেছে। তার কাছে একটা লকারের চাবি এসেছে। ব্যাঙ্ক লকারের চাবি। বিলিতি ব্যাঙ্ক। এ ব্যাঙ্কে যাদের লকার থাকে, তারা কোটিপতি তো বটেই বিদেশের বহু ব্যাঙ্কেও তাদের বেনামি অ্যাকাউন্ট খুলে রাখতে হয় বিবিধ গোঁজামিল ব্যবসার জন্যে।
চকচকে চাবিটা আয়নার সামনে। সামান্য একটা চাবি। কিন্তু এই চাবি যে লকারের দ্বার উদঘাটন করে দেবে–তার অন্দরে যে আলিবাবার রত্ন আছে নারায়ণী তা জানে।
জানে বলেই কঠিন চোখে নিজেকে দেখছে আয়নার মধ্যে দিয়ে। জিগ্যেস করছে বিবেককে, কী করব? খুন? না, পিটুনি?
খুন, জবাব দিল বিবেক।
.
পরের দিন কাঁটায়-কাঁটায় দশটায় ব্যাঙ্কের সামনে ব্রেক কষল একটা হেভি মোটর বাইক। বাইক যে চালিয়ে নিয়ে এল, তার ওজন বাইকের চাইতে কম। কিন্তু গুরুভার গম্ভীর নিনাদী এই বাইক তার হাতে যেন খেলার পুতুল। পৃথিবীবিখ্যাত এই ব্র্যান্ডের বাইক একসময়ে ছিল ব্রিটিশ আর্মিতে। ১৯৪০-এ তারা বেচে দেয় ভারতের মানুষকে। আজকে সেই বাইক রূপান্তরিত হয়েছে। দিল্লির ফটফটিয়া-য় রেড ফোর্ট থেকে কনট সার্কাস যায় একেবারে আটজন যাত্রী নিয়ে। মাথাপিছু ভাড়া তিনটাকা।
কিংবদন্তীসম এই বাইক পথের রাজা হয়ে রয়েছে ১৯৩০ সাল থেকে–যে সালে রাইট ব্রাদার্স আকাশে উড়িয়েছিলেন তাঁদের প্রথম উড়োজাহাজ।
আজও সে পথের রাজা। হার্লে ডেভিডসন। ব্যাঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াল লেটেস্ট মডেল– আলট্রা ক্লাসিক ইলেকট্রা গ্লাইড। ১৩৪০ সিসি ইঞ্জিন থেকে গম্ভীর গজরানি বেরয় এই কারণেই। ঝকঝক করছে পেছনের টুরিং কম্পার্টমেন্ট–সেখানে রয়েছে দুটি ফুল-ফেস হেলমেট। হেলমেটের মধ্যে রয়েছে স্পিকার যাতে চালক রেডিও ইনটারকম-এর মাধ্যমে কথা বলতে পারে পেছনের রাইডারের সঙ্গে, রয়েছে ইলেকট্রনিক কুইজ কন্ট্রোল, ক্যাসেট স্টিরিও সিসটেম।
ছোট গাড়ির চাইতে অনেক বেশি দাম এই দ্বিচক্রযানের। কিন্তু এ বাহন যাকে সাজে, দামের পরোয়া সে করে না। কারণ, স্পিড তার কর্মযজ্ঞের মূল মন্ত্র, জীবন আর মৃত্যু তার দুই পায়ের দুই ভৃত্য।
নিতান্ত অবহেলায় মেটাল মন্সটারকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে ব্যাঙ্কের প্রবেশ পথের দিকে অগ্রসর হল টেরিফিক বিউটি। পথের লোক হাঁ করে চেয়ে রয়েছে তার দিকে আর তার চোখ ধাঁধানেনা বাহনের দিকে। মাথায় তার হেলমেট নেই কারণ কলকাতায় সার্জেন্টদের সে তোয়াক্কা করে না। হালকা খাটো চুলের শোভা নষ্ট করতে যাবে কেন শিরস্ত্রাণ দিয়ে? কক্ষনও না। অঙ্গে গাঢ় বেগুনি প্যান্টসুট। কঁধ, বুকের ওপর দিক আর বাহু সম্পূর্ণ অনাবৃত। কলমকারি ছাপার একটা হালকা চাদর একটা কাঁধের কিছুটা ঢেকে রেখেছে বাকি চাদর ঝুলছে বামবাহুর ওপর। এইভাবেই সে হার্লে ডেভিডসন চালিয়ে এসেছে রাজপথ দিয়ে–নিশানের মতো পতপত করে উড়ছে তার কলমকারি ফুলকাটা চাদর।
মোহিনী নারায়ণী নেমেছে অভিযানে। পাঠক, এস্ত হোন।
পাথরের চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে বাঁদিকে মোড় নিল নারায়ণী। বিশাল হলঘর পুরোপুরি এয়ারকন্ডিশনড। মোলায়েম শীতলতায় শীতল প্রত্যেকেরই মস্তিষ্ক। তা সত্ত্বেও রুধির স্রোত দ্রুতগতি হল সামনের সুবেশ তরুণের ধমনীতে। পার্সোনাল কমপিউটার নিয়ে বসে আছে সে লকার-হোল্ডারদের পথ দেখিয়ে পাতাল ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। নারায়ণীর পেলব বাহু আর ঝকঝকে পিঙ্গল চোখ উত্তাল করেছে তার হৃৎপিণ্ডকে।
বাক্যব্যয় করল না নারায়ণী। কোড নাম আর নম্বর লেখা কার্ডে বাঁধা চাবিটা রাখল টেবিলে।
নিমেষে ভাবলেশহীন হয়ে গেল সুবেশ তরুণের মুখমণ্ডল।
যেন তৈরি ছিল এই চাবি আর এই কোড নম্বর দেখবার জন্যে। আশা করেনি শুধু নারায়ণীর মতো অপ্সরাকে। অথচ হাঁটছে দেখ! চলমান দামাস্কাস তরবারি বললেই চলে।
তরুণের মুখচ্ছবি পাঠ করে নিয়েছে নারায়ণী। সব মিলে যাচ্ছে। অঢেল পয়সা উড়ছে। ক্রীতদাস বনেছে এই ছোকরাও।
উঠে দাঁড়িয়েছে ছোকরা। ফাইলিং ক্যাবিনেটের সামনে গিয়ে দোসরা চাবি বের করে এসে বসল টেবিলে। এখন একটা ফর্ম সই করতে হবে। নারায়ণী জানে। লকার খোলা হয়েছে তারই নামে। সই নিয়ে যাতে মাথা ঘামানো না হয় তাই তো কেনা হয়েছে ছোকরাকে।
ফর্মে সই টেনে দিল নারায়ণী। বললে, বাকি যা লেখবার লিখে নেবেন। চলুন।
রোবটের মতো উঠে দাঁড়াল ছোকরা। ডানাকাটা পরীর গলা দিয়ে যে এরকম গম্ভীর মেঘের ডাক বেরতে পারে, তা সে জানত না। পট-পট করে নেমে গেল বাঁ দিকের সিঁড়ি বেয়ে। লাল কার্পেট পাতা পাতাল ঘরের সিঁড়ি। নিচের চাতালে নেমেই ডাইনে লকার রুম। সারি-সারি লোহার ক্যাবিনেট। ফাইলিং ক্যাবিনেট বলেই মনে হয়।
নম্বর মিলিয়ে একটা চাবি লাগিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে তরুণ। নারায়ণী লাগাল নিজের চাবি। শুধু চাইল তরুণের দিকে। সরে গেল সে নিঃশব্দে। হাড় হিম হয়ে গেছে তার ওই এক চাহনিতেই। বাঘিনীর কটাক্ষ কি এরই নাম?
চাবি ঘুরিয়ে হাতল ধরে টান দিল নারায়ণী। বেরিয়ে এল একটা ড্রয়ার। লকার। গুপ্তধন রাখার আইনসঙ্গত অধিকার।
