সন্দেহটা নারায়ণীর মাথায় আসতেই দৌড়ে উঠে এসেছিল ফ্ল্যাটে আমি থাকতে থাকতেই। ক্ল একটাই।
সাহানাকে রেপ করা হয়নি।
নারায়ণী-নৃত্য নেচে এসে গোয়েন্দানী মহারাণী শরীর চাঙা করার জন্যে সিরাজির পেয়ালা বের করেছিল (যদিও একটুও হাঁপায়নি, শাড়িও হাঁটু ছাড়িয়ে ওপরে ওঠেনি)।
আমি বাধা দিইনি। দিলেই তো বলবে, দেবতারা সোমরস খেলে দোষ হয় না, মানুষের হবে কেন?
খাক, খেয়েই তো শরীটাকে অমন টসটসে আঙুর করে রেখেছে। তাই শুধু একটাই প্রশ্ন করেছিলাম, তুই বুঝলি কী করে, আজ রাতেই বিনয় ক্ষুর চালাবে?
নারায়ণীর চোখ তখন টুলটুলু হয়ে এসেছে। আমার চোখেও রং ধরেছে। তাই একজোড়া নারায়ণী দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, রূপ যেন আরও বেড়ে গেছে। গেছো মেয়েরা একটু বেশি রূপসিই হয়, এটা তো ঠিক। আঁটা হাতে মারকুটে হলে তো সোনায় সোহাগা।
মদির চোখে তাকিয়ে নারায়ণী বলেছিল, প্রথমে খটকা লেগেছিল বিনয়ের বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে। যে মিথ্যে বলে, তার অঙ্গভঙ্গি দেখে তা ধরা যায়। মনের মধ্যে ফন্দির তোড়জোড় চললে, চাহনি দেখে তা আঁচ করা যায়। এ বিদ্যে অনেক কষ্টে শিখতে হয়েছে আমাকে। সেইসঙ্গে কাজ করেছে আমার ইনটিউশন–যে জিনিসটা অন্য মেয়েদের চেয়ে আমার একটু বেশিই আছে বলে আমি জানি। এটা একটা সাইকিক ফোর্সও বলতে পারিস। তখন খাটালাম আমরা যুক্তি। এখন হাওয়া গরম। আরও মেয়ে চেরাই হবে–এই আতঙ্ক জেগেছে ঘরে-ঘরে। গরমে-গরমে নিজের ঘরের বউটাকে একই কায়দায় কেটে ফেললেই তো একঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যায়। পুলিশ জানবে, জন্মান্তরিত জ্যাক দ্য রিপার-ই খুন করে গেল হস্তিনী হাসিকে। মরা হাসির আঙুলের ছাপও কেউ নেবে নাসাহানার খুনি কে, তা অজানাই থেকে যাবে। ফঁকতালে হাসির ফ্ল্যাট, বীমার টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা সব পেয়ে যাবে। এন্তার মেয়ে ভোগ করা যাবে। আরও একটা মোটিভ তো নিজের কানেই শুনলি। কী বলছিল বিনয় ধোলাই খাওয়ার সময়ে?
সাহানাকে মেরেছে ক্ষুর চালিয়ে–আমিও মারব ক্ষুর চালিয়ে!
অর্থাৎ প্রতিহিংসা। হাসির অস্বাভাবিক আতঙ্ক দেখে সন্দেহ হয়েছিল বিনয়ের। খটকা লেগেছিল আমার আবির্ভাবে–তাই আর সময় নষ্ট করতে চায়নি। গোয়েন্দানী যখন চর পাঠায়, তখন তার সন্দেহটাকে ঝটপট ঘুরিয়ে দেওয়া দরকার।
প্ল্যান এঁটেই তাহলে তুই আগে আমাকে পাঠিয়ে পরে নিজে গেছিলি?
আজ্ঞে। আমার না গেলেও চলত, কিন্তু মূল সূত্রটা মাথায় ঝলক দিতেই আর দেরি করিনি– দরকার ছিল হাসির ফিংগার প্রিন্ট।
এ তো দেখছি আড়াই প্যাঁচ।
নারায়ণীর আড়াই প্যাঁচ। ছেলে গোয়েন্দাদের মাথায় এসব কুচুটে প্ল্যান গজাবে? নে, ওঠ, আর গিলিসনি!
* নবকল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ৩৩শ বর্ষ)
শিয়রে শমন
গোয়েন্দানী নারায়ণী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। তার নীল রঙের দু ৬।পকেটওলা ডেনিম শার্টের দুটো পকেটই ঠেলে উঠেছে। উদ্ধত বুকের নিচেই কটিদেশ ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়েছে দেড়ইঞ্চি চওড়া বেল্টের বন্ধনে। নিম্নাঙ্গ আবৃত ব্লু-জিনস প্যান্টে। নিতম্ব কামড়ানো জিনস।
গোয়েন্দানী নারায়ণী প্রসাধন পছন্দ করে না। সুর্মাটানা চোখের চাইতে অনেক বেশি বিপজ্জনক ওর পিঙ্গল চক্ষুর চাহনি। বাঘিনী চক্ষু বললেই চলে। নিমেষে হিপনোটাইজ করে ফ্যালে। রসিকা প্রকৃতিদেবী তার অধর আর ওষ্ঠের আধারে এত রস দিয়েছেন যে রঞ্জক পদার্থ দিয়ে তাদের আকর্ষণ বৃদ্ধির দরকার হয় না।
এই মুহূর্তে সে মুক্তোর মতো সুন্দর সাজানো দাঁত দিয়ে কামড়ে রয়েছে নিচের ঠোঁটের বামপ্রান্ত।
সে ভাবছে। খুন করবে, না স্রেফ পিটিয়ে ছেড়ে দেবে।
আয়নার ঠিক ওপরের জোরালো স্পট লাইট ফোকাস করে রয়েছে ওর তিলোত্তমা দেহবল্লরীকে। প্রতিটি লোমকূপে বিধৃত অজস্র রূপের কণা। বিধাতা মাঝেমধ্যে এই রকম এক একটি রমণীকে সৃষ্টি করেন। পুরুষের প্রতাপ ভাঙবার জন্যে। অন্যায়ের কাণ্ডারিদের নিধন করবার জন্যে। তিল-তিল সঞ্চিত রূপরাশিই এদের অমোঘ অস্ত্র। কটাক্ষের দামিনীই এদের দধীচির অস্থি। এরা সুন্দরী অথচ ভয়ঙ্করী। এদের সাবধান।
কলিকালের কুটিল কলকাতায় নারায়ণী তাই মূর্তিমতী বিভীষিকা। যারা ওর রূপের আকর্ষণে কাছে এসেছে–তারাই টের পেয়েছে, নারায়ণীকে বিধাতা শুধু রূপের অস্ত্রই দেননি–দিয়েছেন পেশির শক্তি। নারায়ণী নিয়মিত শরীরচর্চা করে এই পেশিদের বজ্ৰাধিক সর্বনাশা করে তুলেছে। মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ ওর নরম শরীরে এনে দিয়েছে মৃত্যুর হাতছানি। সেই সঙ্গে গ্রহণ করেছে আধুনিক মারণাস্ত্রের সর্ববিধ শিক্ষা।
তাই বলছিলাম, রূপসী নারায়ণীর রণরঙ্গিনী রূপের স্বাদ যারা পেয়েছে, তাদের অধিকাংশই ধরাধাম ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে যাদেরকে শেষ মুহূর্তে কৃপা করেছে রহস্যময়ী এই নিতম্বিনী– তারাই পঙ্গু দেহে আতঙ্কিত কণ্ঠে হুঁশিয়ার করে গেছে জানপহচান ব্যক্তিদের? খবরদার, ল্যাজে পা দিও না নারায়ণীর। নিজেকে সে গোয়েন্দানী বলে ঠিকই কিন্তু আইনের ধরাবাঁধা লাইনে গোয়েন্দাগিরি করে না। যে দেশে বিচারপতিকেও কাঠগড়ায় উঠতে হয়, যেদেশে কুখ্যাত বহু-বিজ্ঞাপিত খলনায়করা নির্বিচারে পার পেয়ে যায়, সে দেশে থানা-পুলিশ-প্রমাণ-আদালতের প্রহসন কীসের?
