আমি বকবকানি শুনছি আর টুকটাক প্রশ্ন চালিয়ে যাচ্ছি। হাসি যেই রান্নাঘরে আমার তেষ্টা মেটাতে গেলাসভর্তি কোল্ড ড্রিঙ্ক আনতে গেল, অমনি আমি জিজ্ঞেস করে নিলাম বিনয় মালাকারকে, সাহানা দেবীর বাকি তিনজন পরপুরুষ বন্ধুর নামধাম কি বলবেন? বিনয় চমকে উঠেছিল। আমি গজাল দাঁতের হাসি হেসে দেখিয়ে বলেছিলাম, সবাই সব জানে মশাই। আপনারই কোনও রাইভ্যাল তো এ কাজ করতে পারে? বিনয় যেন কীরকম হয়ে গেল। গলার কণ্ঠা ওঠানামা করছে দেখে হাসিরাশি দেবীকে বললাম আর এক গ্লাস ঠান্ডা পানি তাকে এনে দিতে এবং তা আনতে চোঁ-চোঁ করে শেষ করে দিল মানব-দানব। মুখ তার ফ্যাকাশে। আমি বললাম, আপনার এত ভয় কীসের? আমি তো আছি। কাগজের লোককে মশাই পুলিশেও ভয় পায়খুন যে করেছে, সে আর এ তল্লাটে ভিড়বে না–আপনি শুধু আমাকে হেল্প করুন।
আমি ধানাই-পানাই করে যাচ্ছি আর ভাবছি কোন ফাঁকতালে বিনয়ের আঙুলের ছাপ লাগা গেলাসটা সরানো যায়। দেবা আর দেবী দুজনেই যে উপস্থিত, আগে তো জানতাম না। আমাকে এই সংকট থেকে মুক্তি দিল স্বয়ং নারায়ণী।
ইলেকট্রনিক মিউজিক বেজে উঠল দরজার পাশে। মানব-দানব উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ভুবনমোহন হাসি হেসে ঘরে ঢুকল নারায়ণী–এ হাসি যে হাসতে পারে দুনিয়ায় তার অপ্রাপ্য কিছু থাকে না। কাঁধে ঝুলছে জরিদার কাঁচ-চুমকি-পুঁতি বসানো রাজস্থানী ঝোলা। ঘরভরতি বিষাদ-মেঘকে চকিতে উড়িয়ে দিল প্রাণবন্ত কথাবার্তায়। প্রতিবেশিনী হিসেবে তার দায়িত্ব রয়েছে এই ফ্ল্যাটবাড়ির সব মেয়ের দেখভাল করার। কথা বলতে বলতে উঠে গেল ব্যালকনিতে। ঝোলা থেকে বাইনোকুলার বের করে দেবা আর দেবীর হাতে গছিয়ে দিয়ে ফিরে এল ঘরে। শরবতের গেলাস তিনটে (একটা গেলাসে হাসিও শরবত খেয়েছিল) তুলে নিয়ে গিয়ে রেখে দিল রান্নাঘরে। ফিরে গেল ব্যালকনিতে। আরও কিছুক্ষণ বকরবকর করে আমাকে নিয়ে চলে এল নিচের তলায় নিজের ফ্ল্যাটে। ঝোলা থেকে গেলাস তিনটে বের করে রাখল টেবিলে।
বললে, চুরি করে আনলাম। শরবতের গেলাস সবসময়ে দরকার হয় না। চুরি গেছে জানতে পারার আগেই কাজ উদ্ধার হয়ে যাবে।
আমি বললাম, তুই নিজেই যদি যাবি তো আমাকে পাঠালি কেন?
কারণ আছে, কারণ আছে, বলতে-বলতে ফোনের রিসিভার তুলে নিল নারায়ণী। ডেকে পাঠাল পুলিশেরই এক ফিংগার প্রিন্ট এক্সপার্টকে।
সন্ধের সময়ে বিনয় বেরিয়ে গেছিল গঙ্গার হাওয়া খেতে। তখন ঘড়িতে বাজে ছটা। আধঘণ্টা পরেই ইলেকট্রনিক মিউজিক শুনে ম্যাজিক আই দিয়ে তাকিয়ে হাসি দেখল বিনয় ফিরে এসেছে। দরজা খুলে দিল। বিনয় ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। মুখ পাথরের মতো শক্ত। হাসিও বসল ওর গা-ঘেঁষে। মুখের পরতে-পরতে অশান্ত স্নায়ুর নৃত্য চলছে। বিনয় উঠে গেল টয়লেটে। ফিরে এসে দাঁড়াল সোফায় পেছনে হাসির ঠিক পেছনে। বাঁ হাতে বউয়ের থুতনি চেপে ধরে পেছনে হেলিয়ে চুমু দিল কপালে। ডান হাতে পকেট থেকে বের করে আনল ক্ষুর। আঙুলের কায়দায় খুলে গেল ফলা। এর পর একটানে দু-টুকরো হবে হাসির গলা।
কিন্তু তা হয়নি। পর্দার আড়ালে আমি আর নারায়ণী দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। বিনয় বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে দুজনে ঢুকেছিলাম ফ্ল্যাটে। হাসিকে বলেছিলাম–খোদ পতিদেবতাও যদি ফিরে আসে আমাদের অস্তিত্ব যেন না জানায়। জানান দেব আমরা নিজেরাই।
ক্ষুর যখন খেলে গেল বাতাসে, নারায়ণীর হিলহিলে বডিও খেলে গেল বাতাসে। পর্দার আড়াল থেকে বিনয় পর্যন্ত দূরত্বটা যেন বিদ্যুতের পিঠে চেপে পৌঁছে গেল ক্যারাট মারে উড়িয়ে দিল ক্ষুর।
তারপরেই পরের পর মার। তছনছ হয়ে গেল লিভিংরুম, ঠিকরে গেল হাতির দাঁতের স্ট্যান্ড ল্যাম্প। দানবদেহী বিনয় মালাকারকে নিয়ে কিছুক্ষণ যেন লোফালুফি খেলে গেল নারায়ণী। তারপর তার হাত-পা পাঁজরা ভাঙা শরীটাকে এক লাথি মেরে ঘরের কোণে গড়িয়ে দিয়ে তুলে নিল ফোনের রিসিভার। ডেকে পাঠাল পুলিশের লোকদের।
তারা এল। গদগদ গলায় নারায়ণীকে বললে, সাধু! সাধু! এত সহজে সাহানার হত্যাকারী ধরা পড়বে ভাবতেই পারিনি।
চোখ পাকিয়ে গলা রণরণিয়ে নারায়ণী বললে, এইজন্যেই রসাতলে যাচ্ছে কলকাতার পুলিশ। আপনারা যাকে ধরলেন, সে তার নিজের বউয়ের গলায় ক্ষুর চালাতে যাচ্ছিল বউয়ের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স আর ইনসিওরেন্সের টাকার জন্য। আপনারা ভাবতেন সাহানার হত্যাকারী হাসিরাশি দেবীকেও খুন করে গেছে। কোনওদিনও জানতে পারতেন না কে খুন করেছে সাহানাকে।
চোখ ছানাবড়া করে (নারায়ণীর দশবাই চণ্ডীরূপের জন্যেও বটে) পুলিশ অফিসার বলেছিল, আপনিও জানেন মনে হচ্ছে?
না জানলে কি ন্যাকামি করছি?
নামটা জানতে পারি?
হাসিরাশি মালাকার। আপনার সামনেই বসে রয়েছে।
হাসি তক্ষুনি চোখ উলটে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। নারায়ণী ফাঁস করে দিয়েছিল হাসির কুকীর্তি। লম্পট স্বামীর জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করেছে। অথচ লাম্পট্য চলছে অবাধে। চোখের সামনে। ১২৩ নম্বর ফ্ল্যাটে। স্বামীকে রোখা দরকার। ব্যাভিচারিণীকে মারা দরকার। তাই ক্ষুর চালিয়েছিল কাল রাতে। তাই এত ভয়।
প্রমাণ? ক্ষুরের বাঁটে আঙুলের যে ছাপ পাওয়া গেছে, সেই একই ছাপ রয়েছে শরবতের গেলাসে–হাসি শরবত খেয়েছিল যে গেলাসে।
